প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী সড়কের স্থায়িত্ব কমাচ্ছে

ডেস্ক রিপোর্ট : সড়ক নির্মাণে ৬০-৭০ গ্রেডের বিটুমিন ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যদিও তা মানা হচ্ছে না। দেশের অধিকাংশ সড়কেই ব্যবহার হচ্ছে ৮০-১০০ গ্রেডের নিম্নমানের বিটুমিন। পাথর, পিকেট বা গ্রেড-১ ইটের খোয়ার পরিবর্তে সড়ক নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে নিম্নমানের ইট। নির্মাণ উপকরণ হিসেবে যে বালি ব্যবহার করা হচ্ছে, মানসম্মত নয় তাও। নিম্নমানের এসব উপকরণের কারণে সড়কের স্থায়িত্ব কমছে বলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। খবর বণিক বার্তার।

প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি দমনের অংশ হিসেবে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরসংক্রান্ত একটি টিম গঠন করে দুদক। গত বছরের শুরুতে গঠিত এ টিম বিভিন্ন ধরনের সুপারিশসংবলিত একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। দুর্নীতির ধরন ও তার প্রভাব সম্পর্কেও আলোকপাত করা হয়েছে এতে।

সড়কের স্থায়িত্বের জন্য সঠিক মানের বিটুমিন ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যে সরকার এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মহাসড়কে ৬০-৭০ গ্রেডের বিটুমিন ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে। কিন্তু দুদকের পর্যবেক্ষণ বলছে, দেশের অধিকাংশ সড়কেই এর পরিবর্তে ব্যবহার হচ্ছে নিম্নমানের বিটুমিন। শুধু তা-ই নয়, সড়ক নির্মাণ বা মেরামতে প্রয়োজনের তুলনায় কম বিটুমিন ব্যবহারের ঘটনাও ঘটছে।

সড়ক নির্মাণে আরেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান খোয়া। এ খোয়া তৈরির জন্য ব্যবহার করার কথা পাথর, পিকেট (ঝামা ইট) অথবা গ্রেড-১ মানের ইট। এখানেও অনিয়ম-দুর্নীতি খুঁজে পেয়েছে দুদকের সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরসংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক টিম। তাদের অনুসন্ধান বলছে, প্রভাবশালী ঠিকাদারদের চাপে কিংবা প্রকৌশলীদের দায়িত্বে অবহেলার কারণে অথবা উভয়ের যোগসাজশে খোয়া তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে নিম্নমানের ইট। সড়ক নির্মাণে গ্রেড-১ ইট ব্যবহারের কথা থাকলেও ব্যবহার করা হচ্ছে গ্রেড-২ ও গ্রেড-৩ মানের। পাশাপাশি টেন্ডারের শর্তানুসারে উন্নত মানের বালির পরিবর্তে বেছে নেয়া হচ্ছে নিম্নমানের বালি।

দুদক বলছে, নিম্নমানের এসব নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কারণে কমছে সড়কের স্থায়িত্ব। মূলত ঠিকাদারের অসহযোগিতা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও প্রশাসনের প্রভাবশালীদের (তৃতীয় পক্ষ) চাপে অথবা পরস্পরের যোগসাজশে একশ্রেণীর প্রকৌশলী/কর্মকর্তা অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাত্ করছেন।

জানতে চাইলে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরসংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক টিমের দলনেতা ও দুদকের পরিচালক কাজী শফিকুল আলম বলেন, পর্যবেক্ষণে আমরা দেখেছি, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কারণে সড়কের দীর্ঘস্থায়িত্বে প্রভাব পড়ে। সড়কের স্থায়িত্ব হ্রাসের অন্যান্য কারণও আছে। অতিরিক্ত পণ্যবোঝাই ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল, সনাতনী টেন্ডার প্রক্রিয়াসহ বিভিন্ন কারণও সড়কের স্থায়িত্ব হ্রাসের জন্য দায়ী।

সড়কে নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহারের তথ্য উঠে এসেছে কেন্দ্রীয় সড়ক গবেষণাগারের প্রতিবেদনেও। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীন পাবনা-রাজশাহী জাতীয় মহাসড়কের নাটোরের বনপাড়া অংশে ফাটল ও গর্ত দেখা দেয় গত বছরের শুরুর দিকে। নাটোর সড়ক বিভাগ থেকে বিষয়টি সওজের প্রধান প্রকৌশলীকে জানানো হলে গত বছরের মে মাসে সড়কটি পরিদর্শন করে কেন্দ্রীয় সড়ক গবেষণাগারের একটি প্রতিনিধি দল। পরিদর্শনে তারা দেখতে পান, সড়কের বিভিন্ন অংশ থেকে বিটুমিন গলে যাচ্ছে। আর এটিকে সড়কটির ভাঙাচোরা দশার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতিবেদন দেয় গবেষক দল।

সড়ক গবেষণাগারের কর্মকর্তারা জানান, সড়কে নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহারের কারণে গরমের সময় তা গলতে শুরু করে। এ কারণে সড়কে গর্ত ও ফাটল দেখা দেয়, পেভমেন্টও উঠে যায়।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় সড়ক গবেষণাগারের পরিচালক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, গরমের সময় বিভিন্ন সড়কের বিটুমিন গলে চুইয়ে পড়তে দেখা যায়। এটি ৮০-১০০ গ্রেডের বিটুমিনের ক্ষেত্রে বেশি হয়। দীর্ঘদিন ধরে দেশে এ মানের বিটুমিন ব্যবহার হয়ে এসেছে।

শুধু নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী নয়, দরপত্র অনুযায়ী সড়কের বেজমেন্টও সঠিকভাবে করছেন না ঠিকাদার। কুষ্টিয়া-ভেড়ামারা বেহাল মহাসড়কের কারণ হিসেবে এমন কথাই বলেছেন জেলা সড়ক বিভাগের প্রকৌশলীরা। ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়কের মূল বেজমেন্ট হওয়ার কথা ঠিক ১ মিটার পুরুত্বের। কিন্তু বাস্তবে সড়কটির প্রায় ৫০টি স্থানে পরীক্ষা করে বেজমেন্টের পুরুত্ব কোথাও ৭০০ মিলিমিটারের বেশি পাননি সড়ক বিভাগের প্রকৌশলীরা।

সড়কে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার সম্পর্কে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল হক বলেন, সড়কে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগটি আজকের নয়, অনেক পুরনো। দরপত্রে যে স্পেসিফিকেশন থাকে, তা অনেক সময় ঠিকাদাররা মানেন না। স্থানীয় চাঁদাবাজ বা প্রভাবশালীরাও সড়ক নির্মাণের সময় অনৈতিক আর্থিক সুবিধা নিয়ে থাকে। নীতিনির্ধারকরা কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারেন না।

সড়ক নির্মাণে এসব দুর্নীতি বন্ধে বেশকিছু সুপারিশ করেছে দুদক। তারা বলছে, সড়কে ব্যবহৃত ইট বা খোয়ার এগ্রিগেট ক্রাশিং ভ্যালু (এসিভি) সঠিকভাবে নির্ণয় করে সওজ অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীকে প্রত্যয়ন করতে হবে। পরবর্তীতে ল্যাবরেটরিতে নিরূপিত এসিভির কোনো তারতম্য ঘটলে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করে ফৌজদারি মামলা করলেই নিম্নমানের ইট বা খোয়া ব্যবহারের প্রবণতা কমে আসবে।

এছাড়া সওজ অধিদপ্তরের নিজস্ব মনিটরিং ইউনিট গঠনেরও সুপারিশ করেছে দুদক। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, সুনির্দিষ্ট কার্যপরিধির আলোকে মনিটরিং ইউনিট কাজের পরিমাণগত ও গুণগত প্রতিবেদন প্রদান করবে। মনিটরিং ইউনিটের চূড়ান্ত প্রতিবেদন ছাড়া ঠিকাদারদের চূড়ান্ত বিল দেয়া যাবে না।

বিটুমিনের মান নিশ্চিতের বিষয়ে দুদকের সুপারিশ-সংশ্লিষ্ট মাঠ প্রকৌশলীরা ঠিকাদার কর্তৃক ব্যবহারের জন্য নির্মাণ সাইটে মুজদকৃত বিটুমিনের মান পরীক্ষা করবেন। মান পরীক্ষার ফলাফল সংরক্ষণ ও দৈবচয়ন ভিত্তিতে পুনঃপরীক্ষা করতে হবে। এক্ষেত্রে মানের তারতম্য হলে ঠিকাদার, প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অপরাধজনক বিশ্বাস ভঙ্গ ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদক আইনে মামলা করা যেতে পারে।

জানা গেছে, সারা দেশে সওজ অধিদপ্তরের আওতাধীন সড়কের পরিমাণ প্রায় ২২ হাজার কিলোমিটার। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন এ বিভাগের সড়কগুলোর বড় অংশই রয়েছে ভাঙাচোরা দশায়। এসব সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারে প্রতি বছর হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ ব্যয় করেও কোনো ফল মিলছে না। সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারে নানামুখী দুর্নীতির কারণে এমন বেহাল থেকে বের হতে পারছে না দেশের সড়কগুলো।

সর্বাধিক পঠিত