প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সেনা মদদে ইয়াবা চক্রে রোহিঙ্গারা

ডেস্ক রিপোর্ট : গণহত্যা, বিতাড়ন, নির্যাতন চালালেও ইয়াবা চোরাচালান চক্রে জড়িত কিছু রোহিঙ্গাকে সুরক্ষা দিচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। মিয়ানমার থেকে কক্সবাজারের টেকনাফে এখনো ঘাতক বড়ি সরবরাহ করছে সেনা-মগ মদদপুষ্ট সেসব রোহিঙ্গা। যে কারণে রাখাইন রাজ্য প্রায় রোহিঙ্গাশূন্য হওয়ার পরও প্রতিনিয়ত দেদার ইয়াবা আসছে। চোরাচালানের বৃহৎ রুট কক্সবাজারের পথেঘাটে ধরা পড়ছে ইয়াবার চালান। ধরা পড়ছে এ দেশে আশ্রয় নেওয়া ইয়াবা সরবরাহকারী রোহিঙ্গারা।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২৫ আগস্ট থেকে রাখাইনে রোহিঙ্গা গণহত্যার পর হঠাৎ করে ইয়াবার চোরাচালান কমে আসে। তখন মনে করা হচ্ছিল রাখাইনকে রোহিঙ্গাশূন্য করায় বাংলাদেশে ইয়াবা চোরাচালান বন্ধ হয়ে আসবে। কিন্তু দমন-পীড়নের তীব্রতা শেষে ইয়াবা সরবরাহ আরও বেড়েছে। এ সময়ে কক্সবাজার, চট্টগ্রামে হাতেনাতে ১৫টি ইয়াবার চোরাচালান ধরা পড়ে। গ্রেপ্তার হয় ২৬ জন। পরে রাজধানী ঢাকায় একজন রোহিঙ্গাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এতে ইয়াবার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৫৭ হাজার ৩০০ পিস। এসব ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত রোহিঙ্গারা কক্সবাজারের কুতুপালং-উখিয়ার অস্থায়ী ক্যাম্পে আশ্রিত।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এসব রোহিঙ্গাকে জিজ্ঞাসাবাদে এনে জানতে পেরেছেন, মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সহায়তায় সে দেশে থাকা কিছু রোহিঙ্গা সীমান্তে এসে ইয়াবার চালান দিয়ে যায়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের হাতে ইয়াবার চালান ধরিয়ে দেওয়া হয়। বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে এসব চালান কক্সবাজারে ঘাপটি মেরে থাকা সিন্ডিকেটের হাতে পৌঁছে দেয় রোহিঙ্গারা।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) মো. নজরুল ইসলাম সিকদার বলেন, রোহিঙ্গারা আগেও মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান আনত, এখনো আনছে। শুধু ধরন বদলেছে। গণহত্যার আগে পেশাদার চক্রকে এ কাজে ব্যবহার করা হতো। এখন প্রাণের ভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে সব ক্ষেত্রেই মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় ইন্ধন রয়েছে।

তিনি বলেন, ইয়াবা চোরাচালান ঠেকাতে ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে ৩টি ‘স্ট্র্যাটেজিক কোর কমিটি’ গঠন করা হয়। সব কটি সংস্থা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে এ কমিটি মাদক চোরাচালান নির্মূলে একযোগে কাজ করে যাচ্ছে। এতে মাদক চোরাচালানের পথ রুদ্ধ হবেই।

মাদকদ্রব্য বিভাগ ও পুলিশ সূত্র জানায়, চীন সীমান্তের মিয়ানমারের শান রাজ্য, থাইল্যান্ডঘেঁষা এলাকা ও রাখাইনে ইয়াবা তৈরির কারখানাগুলো এখনো সচল রয়েছে। সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত এসব ইয়াবা কারখানা থেকে এখনো ট্যাবলেট উৎপাদন হচ্ছে। আগের মতো এসব বড়ি আনা হচ্ছে বাংলাদেশে। স্থলপথে রোহিঙ্গাদের বাহক হিসেবে ব্যবহার ছাড়াও সমুদ্রপথে ইয়াবার বড় বড় চালান ঢুকছে চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকায়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, কোস্টগার্ডসহ বিভিন্ন সংস্থা মিলে ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে সারা দেশে ৩ কোটি ৮০ লাখ ৯১ হাজার ৮৬৫ পিস ইয়াবা আটক করে। ২০১১ সালে ইয়াবা আটকের সংখ্যা ছিল ১০ লাখ ৭৬ হাজার ১২৫ পিস। সে হিসাবে ৭ বছরে দেশে ইয়াবা সেবনকারীর সংখ্যা বেড়েছে ৩৫ গুণেরও বেশি। ২০১৬ সালে দেশে ইয়াবা আটক-উদ্ধারের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৯৪ লাখ ৫০ হাজার ১৭৮ পিস।

সংশ্লিষ্টরা বলছে, দেশে কী পরিমাণ ইয়াবা ট্যাবলেট বা অন্য মাদকদ্রব্যের চোরাচালান প্রবেশ করে বা সেবন করে সে হিসাব নেই কারও কাছে। তবে যে পরিমাণ মাদক আটক-উদ্ধার হয় তার ১০ গুণ চোরাচালানের ক্ষেত্রে মনে করা হচ্ছে। সে হিসাবে গত বছর দেশে ৩৮ কোটি পিস ইয়াবা বিকিকিনি হয়েছে।

পুলিশ ও মাদকদ্রব্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, সহজে বহনযোগ্য হওয়ায় দেশে আগেকার বহুল প্রচলিত মাদক হিসেবে পরিচিত ফেনসিডিলের স্থান দখল করে ইয়াবা ট্যাবলেট। ২০১৫ সাল পর্যন্ত ইয়াবার কারণে ফেনসিডিলের চালানও কম আসে। ২০১৫ সালে ফেনসিডিল আটকের পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৭০ হাজার ২১০ বোতল। ২০১৬ সালে তা আরও কমে ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৫২৫ বোতল ধরা পড়ে। কিন্তু হঠাৎ করে গত বছর এই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৭ বোতল।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (গোয়েন্দা ও অপারেশন) সৈয়দ তৌফিক উদ্দিন আহমেদ বলেন, চাহিদা থাকলে সরবরাহ বাড়বে। কিন্তু মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ সব সংস্থা মিলে মাদকের রুটগুলোয় সতর্ক রয়েছে। যে কারণে ধরাও পড়ছে। তবে মাদক নির্মূলে পারিবারিক সচেতনতা ও প্রচারের ওপর জোর দেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ইয়াবার চেয়েও আগামীতে ভয়ঙ্কর হয়ে দাঁড়াবে কয়েকটি কেমিক্যালের সংশ্লেষণে গড়ে তোলা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মাদক ‘এনপিএস’। উন্নত দেশে যা বহুল প্রচলিত। তাই সরকারের উচিত এ নিয়ে এখনই আইন করা। তবে আশার বাণী হলোÑ মাদকদ্রব্য অধিদপ্তর পরিচালিত রাজধানীর তেজগাঁও চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রকে ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হচ্ছে। রাজশাহী, খুলনা ও চট্টগ্রাম কেন্দ্র ৫ শয্যা থেকে ২৫ শয্যায় বাড়ানো হচ্ছে। সেগুনবাগিচায় নির্মাণাধীন রয়েছে বহুতল প্রধান কার্যালয়। তদন্ত সুবিধা পেয়েছে। দৈনিক আমাদেরসময়

সর্বাধিক পঠিত