প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ঘুরে দাঁড়িয়েছে দুদক
বাচ্চুকে তদন্তের আওতায় আনা বড় সাফল্য

ডেস্ক রিপোট : ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুকে তদন্তের আওতায় এনে গেল বছরের শেষ ভাগে আলোচনায় আসে দুদক। বাচ্চুসহ ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি জানান দেয়, যত প্রভাবশালীই হোক, দুর্নীতি করলে কারও রেহাই নেই।

মামলার সংখ্যা কম হলেও দুর্নীতি দমনে পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার প্রথম বছরটি (২০১৭) ছিল আলোচনা করার মতো। শক্তি ও সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে পৌঁছাতে সদ্যবিদায়ী বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নানা কৌশল অবলম্বন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুর্নীতিবাজদের পেছনে গোপনে নজরদারি করতে গঠন করা হয় গোয়েন্দা ইউনিট। একজন পরিচালকের নেতৃত্বে গঠিত ১৯ সদস্যের এ ইউনিটের সদস্যরা এরই মধ্যে গোপনে বেশকিছু সরকারি কর্মকর্তার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে। দুর্নীতিবাজদের বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পর কোনো কোনো অভিযোগ অনুসন্ধানও করা হচ্ছে। এ ছাড়া বছরের মাঝামাঝি দুর্নীতির অভিযোগ জানাতে ‘হটলাইন-১০৬’ গঠনের বিষয়টিও সবার আলোচনায় স্থান পায়।

দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ গত বছরের শুরুতে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ২০১৭ সাল হবে দুর্নীতিবাজদের জন্য আতঙ্কের বছর। তিনি তার সেই ঘোষণায় অটল থেকে বছরজুড়েই দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইটা অব্যাহত রাখেন। জানতে চাইলে ইকবাল মাহমুদ বলেন, কথায় নয়, আমি কাজে বিশ্বাসী। দুর্নীতি করলে কাউকে ছাড়া হবে না- এক বছরে আমি অন্তত সে বার্তাটি সবাইকে দিতে পেরেছি। তিনি বলেন, সব খাতের বড় দুর্নীতিবাজদের তালিকা করে নতুন বছর থেকে পুরোদমে অভিযান চলবে। দুর্নীতিবাজদের ছাড় না দেয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুর্নীতিবাজরা ঔদ্ধত্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। লুটপাট, ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ, সরকারি সেবা পেতে ঘুষ, প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ সব খাতে দুর্নীতি। আমরা দুর্নীতিবাজদের টাকা আর ক্ষমতার নেশা বন্ধ করতে চাই। সেভাইে পুরো এক বছর দুদকের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করেছি। এখন পরিকল্পনা মতো আমাদের টিম মাঠে নামবে। এফবিআই ও সিবিআইয়ের আদলে দুদককে পরিচালিত করেবেন বলেও দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

ইকবাল মাহমুদ গত বছরে দুদকের কিছু ব্যর্থতা ছিল উল্লেখ করে বলেন, যাদের ধরা উচিত ছিল, তাদের সবাইকে ধরতে পারিনি। তবে শুরুটা হয়েছে। আমরা থেমে থাকিনি। বাচ্চুসহ বেসিক ব্যাংকের পর্ষদকে আইনের আওতায় আনার প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, অনেক গুরুত্বপূর্ণ লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। কথা দিয়েছিলাম ২০১৭ সাল দুর্নীতিবাজ-ঘুষখোরদের জন্য হবে আতঙ্কের বছর। আমি সেই কথা রাখার চেষ্টা করেছি। অনেক বড় বড় সরকারি কর্মকর্তাকেও ঘুষসহ হাতেনাতে ধরা হয়েছে। দুদকের গৃহীত হটলাইন ১০৬-এর কার্যক্রম শুরুর কারণে দুর্নীতি অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। ব্যাংকগুলো যাতে সঠিকভাবে ব্যাংকিং কার্যক্রম করে সেদিকে আমরা নজর দিয়েছি। কিছু সুপারিশ করেছি। ব্যাংক থেকে যাকে ঋণ দেয়া হচ্ছে, সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যে কথা বলে ঋণ নিয়েছে, সেই খাতে ঋণের টাকা বিনিয়োগ হচ্ছে কিনা, আমরা সেদিকেও নজর দেব। পুরো ব্যাংকিং কার্যক্রম আমরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখব।

২০১৭ সালে দুদক প্রথমবারের মতো পাঁচ বছর মেয়াদি নিজস্ব কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে এবং তার অনুমোদন দেয়। এ কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে কমিশন থেকে এক বছর মেয়াদি ‘কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা ২০১৭’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় । এ পরিকল্পনার মধ্যে প্রথম ধাপে ৮টি কৌশল নিয়ে কাজ শুরু করে দুদক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরি, কার্যকর অনুসন্ধান ও তদন্ত, কার্যকর দুর্নীতি প্রতিরোধ কৌশল, দক্ষ তদন্ত কর্মকর্তা তৈরিতে দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণ, কার্যকর শিক্ষা কৌশল এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ। এ কর্মকৌশলের অংশ হিসেবে এ বছরই দুদকের নিজস্ব হাজতখানা প্রতিষ্ঠা, গোয়েন্দা ইউনিট ও সশস্ত্র পুলিশ ইউনিট এবং অভিযোগ কেন্দ্র (হটলাইন ১০৬) গঠন, দুর্নীতির ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য জিজ্ঞাসাবাদ সেল ও রেকর্ড রুম স্থাপন এবং সম্পদ পুনরুদ্ধার ইউনিট গঠনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে তা বাস্তবায়ন করা হয়। দুদককে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আরও শক্তিশালী করার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানের অর্গানোগ্রামে পরিবর্তন এবং দুদক বিধিমালা সংশোধনের পদক্ষেপ নেয়া হয়। বিধিমালায় সংশোধনী এনে দুদক কার্যালয়ে মামলা দায়েরের ক্ষমতা চেয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কাছে সুপারিশ পাঠানো হয়। জানা গেছে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে এ নিয়ে এক দফা সভাও হয়েছে। পরে দুদকের প্রস্তাবিত বিধিমালায় সংশোধনীর বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

দুর্নীতির অনুসন্ধান ও তদন্ত কাজে আরও গতি আনতে গেল বছর মহাপরিচালকদেরও তদন্তের ক্ষমতা দেয়া হয়। গুরুত্ব দেয়া হয় প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্তে। এর মধ্যে বেসিক ব্যাংকের সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা অনিয়মের ঘটনায় দুদকের তদন্তাধীন ৫৬ মামলায় ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে তদন্তে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দুদক মহাপরিচালক (বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত) মো. আসাদুজ্জামান। সরকার দলীয় চার ও বিরোধী দলীয় তিন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানেও নেতৃত্বে দিচ্ছেন তিনি। তার মতো অন্য মহাপরিচালকদেরও নানাভাবে অনুসন্ধান ও তদন্তের কাজে সম্পৃক্ত করেছে কমিশন।

দুদক গত বছর কারও বিরুদ্ধে মামলা করার আগে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দুদক চেয়ারম্যানের ভাষায়, ‘আমরা গড়পড়তা মামলা করতে চাই না। যেসব মামলা করব, সে মামলায় আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট হবে এবং আদালতে বিচার হবে। সে কারণে মামলার সংখ্যা এ বছর কম হতে পারে।’ প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে দুদক মামলা করে ২২২টি। আর চার্জশিট দেয়া হয় ৩৫৪টি মামলার। এ সময়ের মধ্যে দুদকের দায়ের করা ২১৭টি মামলার রায় দিয়েছেন আদালত। এর মধ্যে ১৪১ মামলার আসামির সাজা হয়েছে। খালাস পেয়েছে ৭৬ মামলার আসামি। দুদকের নিজস্ব মামলার সাজার হার ছিল শতকরা ৬৫ শতাংশ। অন্যদিকে বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরোর সময়ে দায়ের হওয়া ৭১টি মামলার রায় হয়েছে গেল বছর। এর মধ্যে সাজা হয়েছে ২৮ মামলায়। সাজার হার শতকরা ৩৯ শতাংশ। দুদক চাইছে তাদের (কমিশন) মামলায় আসামির সাজা শতভাগে উন্নীত করতে। ২০১৭ সালে তাদের মামলায় সাজার হার বেড়ে ৬৫ ভাগে উন্নীত করার পাশাপাশি শতভাগ মামলার সাজার বিষয়ে প্রসিকিউটিং এজেন্সি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে দুুদকের আইন ও প্রসিকিউশন বিভাগ।

দুদক গত বছর দুর্নীতি মামলার আসামিদের গ্রেফতারে বেশ তৎপর ছিল। বেসিক ব্যাংক দুর্নীতির মামলা, সুনামগঞ্জের হাওররক্ষা দুর্নীতি মামলা, ২৬টি ফাঁদ মামলাসহ ২৪৮টি মামলায় জড়িত ৬০৫ আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। দুদকের নিজস্ব সশস্ত্র পুলিশ ইউনিট নিয়ে পলাতক আসামি গ্রেফতারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। দুদক বলছে, তাদের মামলার কোনো আসামি (জামিন না নিয়ে থাকলে) জেলের বাইরে থাকবে না।

এদিকে দুদক অভিযোগ কেন্দ্র হটলাইন-১০৬ দুর্নীতিবিরোধী মানুষের অভিযোগ জানানোর প্লাটফর্মে পরিণত হয়েছে। ২০১৭ সালের ২৭ জুলাই এ হটলাইনের কার্যক্রম শুরু হয়। দুদকের উপপরিচালক (গণসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য জানান, সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, আড়াই লাখের মতো কল এসেছে দুদক অভিযোগ কেন্দ্রের হটলাইনে। এর মধ্যে কল রিসিভ করা সম্ভব হয়েছে ৩০ হাজারের মতো। আবার এ ৩০ হাজার অভিযোগকারীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে তিন শতাধিক অভিযোগ অনুসন্ধানের অনুমতি চেয়ে বাছাই কমিটির কাছে সুপারিশ করেছেন সেলের সদস্যরা। এর মধ্যে ৩০টির মতো দুর্নীতির অভিযোগ আমলযোগ্য বিবেচনায় গ্রহণ করে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। দুদকের এ কর্মকর্তা আরও জানান, হটলাইনে পাওয়া অভিযোগের সূত্র ধরে ৫টি ফাঁদ মামলা পরিচালনা করে ঘুষসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে।

গত বছর ২৫টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির উৎস খুঁজে বের করতে ৮ জন পরিচালকের নেতৃত্বে পৃথক ১৪টি প্রাতিষ্ঠানিক টিম গঠন করে দুদক। ওই টিমের সদস্যরা অনুসন্ধান শেষে কমিশনের কাছে সুপারিশসহ তাদের প্রতিবেদন দাখিল করতে শুরু করেছেন। এরই মধ্যে ভূমি ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি ও শিক্ষা খাতে দুর্নীতি রোধে সুনির্দিষ্ট সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। দুর্নীতি ঠেকানোর পরামর্শ দিয়ে এসব সুপারিশ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। জানা গেছে, শিক্ষা খাতে দুর্নীতি সংক্রান্ত দুদকের প্রতিবেদনে প্রশ্নপত্র ফাঁস, নোট/গাইড, কোচিং-বাণিজ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণ, এমপিওভুক্তি, নিয়োগ ও বদলিসহ নানা ধরনের দুর্নীতির উৎস এবং তা বন্ধের জন্য ৩৯টি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করা হয়। এ প্রসঙ্গে দুদক কমিশনার ড. নাসিরউদ্দীন আহমেদ বলেন, এসব প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নে সম্মিলিত প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই। এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করা গেলে শিক্ষা খাতে দুর্নীতি তো কমবেই, সরকারি সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটবে। যুগান্তর

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত