প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জাতীয় সংসদে সরকারি পক্ষই ছিল আলোচনা সমালোচনার কেন্দ্রে

ডেস্ক রিপোর্ট : বছরজুড়ে আলোচনা আর সমালোচনাতে মুখর ছিলো জাতীয় সংসদ। এর মধ্যে সরকারদলীয় এমপিদের আত্ম-সমালোচনাই ছিলো সবচেয়ে বেশি। সংসদে নিষ্প্রভ বিরোধী দলের তৎপরতা না থাকলেও নানা ইস্যুতে সরকারি দলের এমপিরাই আলোচনা-সমালোচনায় সরব ছিলেন। কিছু ইস্যুতে পাল্টাপাল্টি বিতর্ক হয়েছে আওয়ামী লীগের এমপিদের মধ্যেই। জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে নিজ দলের মন্ত্রীদের কঠোর সমালোচনা করতে দ্বিধা করেননি তারা। দলীয় এমপিদের আক্রমণাত্মক বক্তব্যে রীতিমতো বিব্রত ছিলেন মন্ত্রীরা।

এমন কি সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরাসরি ওইসব মন্ত্রীর পক্ষে অবস্থান নিয়ে বক্তব্য রাখেননি। বরং সতর্ক বক্তব্য রাখেন তিনি। অন্যদিকে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সংসদে ভূমিকা পালন করেছেন সতর্কভাবে। দলের দু’একজন এমপি কয়েকটি ইস্যুতে সরকারের সমালোচনা করলেও বেশিরভাগ এমপি ছিলেন সরকারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ প্রতিবারই তার বক্তব্যে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন। পরে সেসব পরামর্শ বাস্তবায়নে তাগাদাও দিয়েছেন। বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ এক আলোচনায় বলেন, আওয়ামী লীগকে বলবো, বঙ্গবন্ধুকে আপনারা কুক্ষিগত করে রাখবেন না। তাকে জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দিন। বিশ্বের কাছে ছড়িয়ে দিন। তাহলে আমরা তাকে জাতির জনক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবো। এছাড়া সরকারের ইতিবাচক কিছু অর্জনের কারণে প্রাণবন্ত আলোচনায় সরকার-বিরোধী দলের সরব উপস্থিতি ছিল নজরকাড়ার মতো।

প্রধানমন্ত্রী-তনয়া পুতুলের স্বীকৃতি, বঙ্গবন্ধুর আরেক কন্যা শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিকীর সাফল্য অর্জন, নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মহানুভবতায় বিশ্ববাসীর স্বীকৃতি নিয়ে আলোচনা এবং সর্বোপরি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের দেয়া ভাষণকে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি প্রদান ছিলো অন্যতম। এ ছাড়া বিদায়ী বছরে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ মোট পাঁচটি অধিবেশন আহ্বান করেন। যার কার্যদিবস ছিলো ৭২ দিন। প্রথম অধিবেশনের মেয়াদকাল ছিলো ৩২ দিন, দ্বিতীয় অধিবেশন পাঁচ দিন, তৃতীয় অধিবেশন ২৪ দিন, চতুর্থ অধিবেশন পাঁচ দিন এবং পঞ্চম অধিবেশন ১০ দিন। বিদায়ী বছরে পাঁচ অধিবেশনে মোট ২৪টি বিল পাস হয়েছে। তবে দশম জাতীয় সংসদের প্রথম চার বছরে ১২২টি বিল পাস হয়। এর মধ্যে ২০১৪ সালে ১৯টি, ২০১৫ সালে ২৯টি, ২০১৬ সালে ৫০টি এবং ২০১৭ সালে ২৪টি। এদিকে গত এক বছরে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দলের ৩০ জন সাবেক ও বর্তমান এমপি মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশও যে বড় আকারের আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করতে সক্ষম তার প্রমাণ মেলে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন-আইপিইউ ও কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন-সিপিএ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে। এই দুই সম্মেলনে অংশ নেয়া বিভিন্ন দেশের সংসদ সদস্যরা বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করে গেছেন। শুধু তাই নয়, সরকারের অর্জনের কথাও শোনা গেছে তাদের ভাষ্যে। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বে বাংলাদেশ নতুন পরিচয়ে পরিচিত হয়েছে। প্রথম দফায় সংসদ উত্তপ্ত হয় বাজেট অধিবেশনে। ব্যাংকের আমানতকারীদের ওপরে আবগারি শুল্ক ধার্য করে সরকারি দলের এমপিদের তোপের মুখে পড়েন অর্থমন্ত্রী। দলের সিনিয়র সদস্যদের তীব্র বিরোধিতার মুখে অবস্থান বদলাতে বাধ্য হন তিনি।

অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশে শেখ ফজলুল করিম সেলিম সংসদে বলেন, আপনার দায়িত্ব বাজেট পেশ করা। এই সংসদের ৩৫০ জন জনগণের প্রতিনিধি ঠিক করবেন জনগণের কল্যাণে কোন্‌টা থাকবে, কোন্‌টা থাকবে না। আপনি একগুঁয়েমি সিস্টেম বন্ধ করেন, কথা কম বলেন। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, বাজেট নিয়ে সারা দেশে আলোচনার ঝড় চলছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এটা নির্বাচনী বাজেট নয়। তাহলে অর্থমন্ত্রী কবে নির্বাচনী বাজেট দেবেন? এরপর সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দাদের ওপর হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়ানোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন সরকারি দলের এমপিরা। এ ইস্যুতে সংসদে মন্ত্রী-এমপিদের ক্ষোভে উত্তপ্ত হয় সংসদ অধিবেশন। ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে গৃহকর (হোল্ডিং ট্যাক্স) বাড়ানোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জাতীয় সংসদে তীব্র ক্ষোভ জানিয়ে মন্ত্রী-এমপিরা বলেন, নির্বাচনের আগে এই সিদ্ধান্তে সরকারের ওপর জনগণের বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। তৃতীয় দফায় সংসদ প্রাণবন্ত হয় ষোড়শ সংশোধনীর রায়কে ঘিরে। বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছ থেকে আদালতের কাছে ফিরিয়ে নিতে ষোড়শ সংশোধনীর রায় বাতিল করে উচ্চ আদালত। সেই রায়ের জের ধরে সংসদে উত্তাপ ছড়ায়। তখন ওঠে সংসদ বড়, নাকি আদালত বড়-এই অস্বস্তিকর প্রশ্নটা সামনে চলে আসে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে সরকারি দল ও বিরোধী দলের এমপিরা তার পদত্যাগ চান। এমনকি সংসদের কাছে ক্ষমা চাইতেও বলেন এমপিরা।

এই ইস্যুতে রাজনীতির মাঠও বেশ সরব ছিলো বছরের অনেকটা সময়জুড়ে। অবশেষে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার পদত্যাগের মধ্য দিয়ে এই আলোচনার ইতি ঘটে। এবছরই বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভ করে। যে ভাষণের মধ্য স্বাধীনতা সংগ্রামের সূত্রপাত ঘটে। ইউনেস্কো ভাষণটিকে ‘ডকুমেন্টারি হেরিটেজ’ (প্রামাণ্য ঐতিহ্য) হিসেবে ঘোষণা করায় সরকারের তথা গোটা জাতির অর্জনের ভাণ্ডারে একটি বিশাল সাফল্য যুক্ত হয়। এই বিষয়টি নিয়েও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলো সংসদ। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বিশ্বের বড় বড় দেশের নেতাদের আগ্রহের কেন্দ্রে আসে বাংলাদেশ। বিভিন্ন বিশ্ব সংস্থা, বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মানবতাবোধের ভূয়সী প্রশংসা করেন। বিষয়টি নিয়ে সংসদ অধিবেশনে একাধিকবার আলোচনায় অংশ নেন এমপিরা।

বিদায়ী বছরে ৫টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এসবের মধ্যে ২০১৭ সালের প্রথম এবং দশম সংসদের ১৪তম অধিবেশন শুরু হয় ২২শে জানুয়ারি। শেষ হয় ১১ই মার্চ। প্রথম অধিবেশনে মোট কর্মদিবস ছিল ৩২টি। এরপর ২রা মে শুরু হয় দ্বিতীয় অধিবেশন যা শেষ হয় ৮ই মে। দ্বিতীয় অধিবেশনের মোট কর্মদিবস ছিলো ৫ দিন। বিদায়ী বছরের বাজেট অধিবেশন শুরু হয় ৩০শে মে, শেষ হয় ১৩ই জুলাই। মোট কর্মদিবস ছিলো ২৬ দিন। এরপর চতুর্থ অধিবেশন শুরু হয় ১০ই সেপ্টেম্বর, শেষ হয় ১৪ই সেপ্টেম্বর। মোট কর্মদিবস ৫ দিন। বছরের শেষ অধিবেশন ছিলো ১২ই নভেম্বর থেকে ২৩শে নভেম্বর পর্যন্ত। মোট কর্মদিবস ১০টি। বিদায়ী বছরে ৫টি অধিবেশনে মোট ৭৮ কর্মদিবস। মানবজমিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত