প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নিষ্প্রাণ অক্ষর যখন মশাল ও অন্যান্য

আহমেদ মূসা:
।।এক।।
সামান্য স্ফূলিঙ্গ থেকে দাবানল সৃষ্টির নজির ইতিহাসে রয়েছে । রয়েছে অল্প কিছু ব্যক্তি, ক্ষ্রদ্র সংগঠন কিংবা কোনো-কোনো গ্রন্থের নিষ্প্রাণ কিছু অক্ষরের মশাল হয়ে ওঠার অনেক উদাহরণ। মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্রের প্রকাশিত কয়েকটি গ্রন্থ নিকট-অতীতে সেই ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল।

১৯৮০-র দশকের শুরুতে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের মূল নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ প্রভাবিত মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ ও জাসদ প্রভাবিত মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রাম পরিষদসহ কিছু সংগঠনের প্রয়াসে গড়ে উঠেছিল যুদ্ধাপরাধী এবং স্বাধীনতা-বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন।

জামায়াতে ইসলামীসহ কিছু দল ও তাদের নেতারা আমাদের স্বাধীনতার যুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। কোনো অনুতাপ প্রকাশ দূরে থাকুক, উল্টো তাদের সেই ভূমিকার জন্য তারা বহুবার দম্ভ করেছে, উস্কানী দিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রথম গড়ে ওঠা আন্দোলন সে-সব দর্প-উষ্কানীরও ফসল।

১৯৮১ সালের ২৮ মার্চ জামায়াত নেতারা প্রথম সংবাদ সম্মেলনে দম্ভোক্তি করেন যে, ১৯৭১ সালে তারা কোনো ভুল করেননি এবং বাংলাদেশের কনসেপ্ট সঠিক ছিল না। গোলাম আযমও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সঙ্গে একই কথা বলেন। এই বক্তব্যের পর দেশে জামায়াত-শিবির-বিরোধী প্রচন্ড ক্ষোভ তৈরি হয়। বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতৃত্বে আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে। কয়েকটি পত্রিকাও এগিয়ে আসে সোচ্চার ভ‚মিকা নিয়ে। দাবি ওঠে অবৈধ নাগরিক ও যুদ্ধাপরাধেযুক্ত গোলাম আযমের বিচারের। কেউ কেউ দাবি তোলেন গোলাম আযমকে বহিষ্কারের ।

মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে গোলাম আযম পাকিস্তানে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি যে মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার সক্রিয় বিরোধিতা ও পাকিস্তানিদের সহায়তা করেছিলেন তা-ই শুধু নয়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও বিদেশে বাংলাদেশ-বিরোধী প্রচারণা চালিয়েছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে নস্যাৎ করতে চেয়েছেন। এসব কারণে বাংলাদেশে তার নাগরিকত্ব বাতিল হয়ে যায়।

১৯৭৮ সালে গোলাম আযম পাকিস্তানি নাগরিক হিসাবে বাংলাদেশের ভিসা নিয়ে এ দেশে আসেন অসুস্থ মাকে দেখার কথা বলে। তার ৬ মাসের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তিনি আর পাকিস্তানে ফিরে যাননি। এ দেশে থেকে যান এবং একাত্তরে তাদের অবস্থানই সঠিক ছিল বলে প্রচারণা চালাতে উদ্বুদ্ধ করেন অন্যদের। জামায়াত নেতাদের দম্ভোক্তির পর যুদ্ধাপরাধের বিচার ও গোলাম আযমের বহিষ্কারের দাবি জোরদার হতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আন্দোলনের পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো আন্দোলনে এগিয়ে আসে। এ ব্যাপারে সাপ্তাহিক বিচিত্রা পালন করে ঐতিহাসিক ভূমিকা। তারা পরপর কয়েকটি প্রচ্ছদ কাহিনী করে জনগণকে সচেতন ও সংঘবদ্ধ হতে সাহায্য করে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ, মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রাম পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন সক্রিয় ভ‚মিকা পালন করতে শুরু করে। সারাদেশে তারা জামায়াত-শিবিরের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে প্রতিরোধের ডাক দেন। মুক্তিযোদ্ধাদের নেতৃত্বে তখন কয়েকটি সফল হরতালও পালিত হয়। আন্দোলনে শাহরিয়ার কবির, নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ও সাদেক আহমদ খানসহ অনেকেই পালন করেন সাহসী ভূমিকা। আন্দোলনের মুখপত্র ছিল সাপ্তাহিক নয়া পদধ্বনি। কর্ণেল জামান সম্পাদক। আমি তাতে নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর আন্দোলনের সঙ্গে আরো ঘনিষ্টভাবে জড়িয়ে পড়ি। পরে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বিবৃতি-স্মারকলিপি প্রভৃতি লেখার দায়িত্ব এসে পড়ে। ১২ জন মুক্তিযোদ্ধার ফাঁসি হবার পর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ ও মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রাম পরিষদ ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন শুরু করলে তিন সংগঠনের বিবৃতি লেখার ভারও আমার ওপর এসে পড়েছিল।

জিয়াউর রহমানের হত্যাকান্ড ও এরশাদের ক্ষমতা দখলের কারণে আন্দোলনে সাময়িক বিরতি ঘটে। আন্দোলনের পুরোধা-নেতাদের এরশাদ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ থেকে বের করে দিয়ে একটি পকেট সংগঠন করেন। এরা এরশাদের তল্পীবাহক হয়ে কাজ করেছেন। এরশাদ একই সাথে প্রকাশ্যে এবং গোপনে আন্দোলনের পিছনে ছুরিকাঘাত করেন। তিনি ক্ষমতা দখল করেই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী উল্লিখিত তিন সংগঠনের দুই নেতা কর্ণেল নূর উজ্জামান ও কর্ণেল শওকত আলীকে গ্রেফতার করেন, মেজর জিয়াউদ্দিন সুন্দরবনে পালিয়ে গিয়ে রক্ষা পান। পাশাপাশি নঈম জাহাঙ্গীরসহ আরো অনেককে গ্রেফতার করা হয় ।

রাজনীতি ও সাংগঠনিক কার্যক্রম তখন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কর্নেল জামান জেল থেকে বের হয়ে আসার পর চিন্তা শুরু হয় কি ভাবে নতুন করে কাজ শুরু করা যায়। উল্লিখিত আন্দোলনে যাদের দলীয় পরিচয় প্রবল ছিল, তাদের ছাড়া পরবর্তীকালে গঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্র। এতে আরো যোগ দেন ড. আহমদ শরীফ, ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বিনোদ দাশগুপ্ত, ড. সাঈদ উর রহমানসহ লেখক শিবির থেকে চলে আসা আরো অনেকে। জেনারেল ওসমানীকে সমর্থন করা ও না করা নিয়ে লেখক শিবিরে মতপার্থক্য তৈরীর প্রেক্ষাপটে এই নিরব বিভক্তি ঘটে, যদিও দ্বিখন্ডিত হয়নি। লেখক শিবিরে রয়ে যান বদরুদ্দীন উমর, আনু মুহাম্মদ, আবরার চৌধুরী প্রমুখ। মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্র থেকেই প্রকাশিত হয় আকরগ্রন্থ ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’সহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু বই, যে-গুলির প্রধান প্রতিপাদ্য ও লক্ষ্য ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং একাত্তরের গণহত্যাকে দেশে-বিদেশে সম্যক গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা। তাই সংশ্লিষ্ট আন্দোলনের কোনো বিজয় অর্জিত হলে ঘুরে-ফিরে আসে এই আকরগ্রন্থটির নাম। নাম চলে আসে মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্রের। দুর্দিনে এই সংগঠন ও এর প্রকাশিত গ্রন্থগুলি সাহস ও আলোর মশাল হয়ে পালন করেছে ঐতিহাসিক ভূমিকা। এই সংগঠন আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থও প্রকাশ করে। এরশাদের সামরিক শাসনের রক্তচক্ষু এড়িয়ে আন্দোলনের রেশ ধরে রাখার পাশাপাশি অর্থ সংগ্রহের জন্য সংগঠনের পক্ষ থেকে কোটপিনও বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়। র’নবী ও নিতুন কুন্ডের যৌথ সৃষ্টিকর্মের মূল কথা ছিল ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা : আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’ বিচিত্রায় এ নিয়ে বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়েছিল। আদর্শিক ও আর্থিক উভয় ক্ষেত্রেই সফল হয়েছিল এই প্রয়াস। প্রতিষ্ঠানটির উপদেষ্টা ছিলেন বরেণ্য লেখক-বুদ্ধিজীবীরা। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হন যথাক্রমে কর্ণেল জামান ও শাহরিয়ার কবির। আমাকে করা হয় প্রকাশনা সম্পাদক।

প্রকাশনা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পরও নানা জায়গায় দৌড়াদৌড়ির কাজগুলি আমাকে করতে হতো। অর্থাৎ, মস্তিষ্ক ও পা-যুগল সমানভাবে কাজ করেছে। ভবিষ্যতে আরো বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার ইচ্ছে আছে। কারণ, আজকাল দেখতে পাচ্ছি, মাঝে-মাঝে নিজের ঢোল নিজে না পেটালে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথাও তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। আজকাল আরো দেখতে পাচ্ছি, নিজের প্রবল অন্তর্মুখিতার কারণে সেই-সব ভূমিকার কথা অনেক ঘনিষ্ট বন্ধু বা কাছের জনেরও ভালোভাবে জানা নেই। সংশ্লিষ্ট সবাই নিজেকে তুলে ধরতে বা ঘটনা থেকে ফায়দা তুলতেই সদাব্যস্ত। অনেক বড়বড় মানুষেরও কিছু কিছু ক্ষুদ্রতার চেহারা কাছে না থাকলে দেখা যায় না।

১৯৮৭ সালে একুশের বইমেলায় ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’ প্রকাশের পর লোকজন লাইন দিয়ে বই কিনতে থাকে। সে কারণে পরবর্তীতে বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে প্রায় ২৫ হাজার ছাপা হলেও বাংলাটির চাহিদা ছিল আরো বেশি। তাই হাজার হাজার নকল বইয়ে বাজার ছেয়ে যায়।

আমাদেরকে এরশাদ ও জামায়াতীদের যুগপৎ রোষানল এড়িয়ে কাজ করতে হয়েছে। নকল সমস্যা ছাড়াও বই প্রথম প্রকাশের পর আরো কিছু ‘বিচিত্র’ সমস্যা দেখা দেয়। এরমধ্যে দু’টি হচ্ছে ঃ ক. একটি পত্রিকা আমাদের কাজের প্রশংসার পাশপাশি বইটিকে ‘উড়োচিঠি’ বলে পরিহাস করে। কারণ প্রথম সংস্করণে সম্পাদক, সংকলক বা লেখক হিসেবে কারো নামই ছিলো না। অভিযোগ যথার্থ ছিল। তাই দ্রæত দ্বিতীয় সংস্করণ করে আরো অনেক তথ্য দিয়ে এর আমুল পরিবর্তন আনা হয়। সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয় ড. আহমদ শরীফ, কাজী নূর উজ্জামান ও শাহরিয়ার কবিরের নাম। দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় প্রথম সংস্করণ লেখার দায়িত্ব শফিক আহমদকে দেওয়া ও দ্বিতীয় সংস্করণের তথ্য সংগ্রাহক হিসেবে শফিক আহমদ ও আমার নাম উল্লেখ করা হয়। পরবর্তী সংস্করণগুলিতে আরো অনেক তথ্য সন্নিবেশিত হয়ে পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে বইটি।

দ্বিতীয় অভিযোগটি ছিল আওয়ামী লীগের একজন মুক্তিযোদ্ধা নেতার। তিনি বলেন, গ্রন্থে ঘাতক-দালালদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগেরও কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। এই অভিযোগটিরও সারবত্তা আছে। সাধারণ ক্ষমা ও চিহ্নিত ঘাতক-দালালদের বিচারে গড়িমসির জন্য গ্রন্থে আওয়ামী লীগেরও ব্যাপক সমালোচনা করা হয়।

গণহত্যার ভয়াবহতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার জন্য ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’ ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়েছিল ‘জেনোসাইড সেভেন্টি ওয়ান ঃ এ্যান একাউন্ট অব কিলার্স এ্যান্ড কলাবরেটরস’ নামে। প্রায় ত্রিশ বছর আগে। এতে সম্পাদক হিসেবে আরো যোগ হয় ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর নাম। অনুবাদ করেছিলেন ড. নিয়াজ জামান। সে কারণে ২০১৭ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান তিনি। এটি ছাপা হয়েছিল আমার নিজের প্রেস বর্ণবিন্যাসে। কেউ একজনের করা বাংলাটির পিডিএফ কপি থাকলেও ইংরেজিটির ছিল না। অনেকেই দীর্ঘদিন থেকে আমাকে তাগাদা দিয়ে আসছিলেন। শেষ পর্যন্ত এবার ইংরেজিটিরও পিডিএফ দেওয়া গেল।

একদিন যে আওয়াজ কিছু লোকে তুলেছিলেন, সেই আওয়াজ অনেক আগেই পৌঁছে গেছে ঘরে-ঘরে। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিও ছিল আগেরই প্রয়াস – মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্রের কার্যক্রমের সম্প্রসারণ। নির্মূল কমিটি প্রথমত গঠন করেন মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্রের সঙ্গে জড়িতরা। পরে এটি আরো সম্প্রসারিত হয়। অন্তর্ভুক্ত হয় রাজনৈতিক দলও।

‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’ গ্রন্থে ঘাতক-দালালদের তখন পর্যন্ত বিচার না হওয়ায় আওয়ামী লীগেরও কঠোর সমালোচনা ছিল। তবে ঐতিহাসিক এই সত্যকেও স্বীকার করতে হবে যে, বইটি যখন প্রকাশিত হয় তখন আওয়ামী লীগের নেতারাও বিপদগ্রস্ত এবং দল অগোছালো। ১৯৭৫ সালে দল ও নেতৃবৃন্দের ওপর দিয়ে যে রক্তাক্ত বিভীষিকা গেছে তার রেশ তখনো চলছিল।

অবশ্য দীর্ঘকাল পরে হলেও আকরগ্রন্থের সমালোচনার যথাযথ জবাব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা; ঘাতক-দালালদের বিচারে অনড় অবস্থান নিয়ে ও বাস্তবায়ন করে। শেখ হাসিনা ছাড়া এ বিচার সম্ভব ছিলো না, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও সম্ভব হতো না, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা না থাকলে। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে এটাই ছিল সবচেয়ে দরকারী ও কঠিনতম কাজ। একই সঙ্গে গণহত্যার ভয়াবহতাকে দেশে-বিদেশে সর্বব্যাপী করে তুলে ধরার প্রয়াস নিয়েও তিনি ব্যাপক ভূমিকা রেখে গেলেন। ইতিহাস শেখ হাসিনাকে এ কাজের জন্য অমর করে রাখবে সন্দেহ নেই।

আবার একথাও ঠিক, এই লক্ষ্য-প্রত্যয় ২০০৮ সালের নির্বাচনী ঘোষণায় থাকাতেই আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসা সহজতর হয়েছে এবং শেখ হাসিনা হয়েছেন শক্তিমান নেত্রী। চূড়ান্তভাবে সবগুলি প্রয়াসের ইতিবাচক ফল ভোগ করেছে আওয়ামী লীগ। রাজনৈতিক ফসলও কম তোলেনি দলটি। নয়া প্রজন্মের আকাক্সক্ষার অনুবাদ শেখ হাসিনা ঠিকই করতে পেরেছিলেন।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অঙ্গীকারের কাছাকাছি সময়ে গুলশানে এক ইফতার পার্টিতে সাময়িকভাবে-বিভক্ত বিএনপির সংস্কারপন্থী অংশও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের অঙ্গীকার ঘোষণা করেছিল, যার কারণে জামায়াতীদেরও রোষানলে পড়তে হয়েছিল তাদের। অবশ্য পরে সংস্কারপন্থীদের আর আলাদা নির্বাচন করা হয়নি। মুষ্ঠিমেয় কয়েকজন ছাড়া সবাই ফিরে গেছেন মূল দলে। কেউ কেউ স্বতন্ত্র নির্বাচন করে অকৃতকার্য হন। ফিরে যাওয়া সংস্কারপন্থীরাদেরও কেউ কেউ মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হোন, কেউ কেউ মনোনয়ন পেয়েও অকৃতকার্য হন।

আওয়ামী লীগ যেমন অন্যান্যের আন্দোলনের ফসল নিজের গোলায় তুলেছে, তেমনি ফসল তোলার কম-বেশি অবকাশ বিএনপিরও ছিল। কিন্তু তারা ফসল তুলবে কী; মুক্তিযুদ্ধের ময়দানটাই ছেড়ে দিয়েছে আওয়ামী লীগকে, যে ময়দানে দাঁড়িয়েই বিএনপির সংগ্রাম করার কথা আওয়ামী লীগ নামক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের গৌরব-ঐতিহ্য ধারণ-লালন অপরিহার্য। অথচ মুক্তিযুদ্ধের অনেক বায়া-দলিল বিএনপির হাতে থাকলেও পায়ের নিচে মুক্তিযুদ্ধের জমিন না থাকায় বিপর্যয়ে পড়ে দলটি। বিভিন্ন দিবসকে সামনে রেখে তারা মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে নানান কথা বলেন বটে, কিন্তু সেগুলি বিচ্ছিন্ন বলে পরিগণিত হয়। কিছু কিছু মানুষ প্রেসক্রিপশন ছাড়াই বিভিন্ন ধরনের টনিক খেয়ে থাকেন স্বাস্থ্য ভালো থাকবে মনে করে Ñ খাবার আগে এক চামচ বা খাবার পরে দুই চামচ। ব্যাপারটা অনেকটা ঐ রকম।

একই সঙ্গে বিএনপি মাথায় তুলে নিয়েছে তাদেরকে, যারা বাংলাদেশটাই চায়নি এবং স্বাধীনতার সঙ্গে বেঈমানীর পাশাপাশি তাদের ভূমিকা নিয়ে দম্ভকরা অব্যাহত রেখেছে। বড় কথা, জামায়াতের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে বিএনপির বিদ্যমান জায়গাটাও দখল করা। এমন কি, ওয়ান ইলেভেন-পরবর্তী নির্বাচনের প্রাক্কালে জামায়াত ‘পনের বছরের মধ্যে ক্ষমতায় চলে আসার’ ছক এঁকেছিল বলেও শোনা যায়। বিএনপিকে চিন্তা-ভাবনা বা দরকষাকষির সুযোগ না দিয়ে বগলদাবা ও বাধ্য করে নির্বাচনে নিয়ে যাওয়াও ছিল সেই ছকেরই অংশ। জন্মের পর থেকেই জামায়াত সব সময় হটকারিতা ও ভুল হিসেব করে আসছে। আর বিএনপির ট্রাাজেডি হচ্ছে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে যাওয়ার আগে যেখানে প্রবল দরকষাকষির দরকার ছিল বা যে-নির্বাচন বর্জন করলেও তেমন ক্ষতি-বৃদ্ধি হতো না, সেই নির্বাচনে জামায়াতের ধাক্কায় লাফ মেরে চলে গেছে। আর ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ নেওয়া অপরিহার্য হওয়া সত্তে¡ও সেটা বর্জন করে আমছালা দু’টোই হারিয়েছে। এই নির্বাচন বর্জনের পরামর্শ দিয়ে যারা বেগম খালেদা জিয়ার হাতে সবুজ পাসপোর্ট ধরিয়ে দিয়েছিলেন এদের সম্পর্কে সতর্ক থাকলে বিএনপি কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

অন্যদিকে জামায়াতকে ময়দানে-সংসদে দ্বিতীয় শক্তিতে পরিণত করতে আওয়ামী লীগও বাতাস দিতে পারে নিজের স্বার্থে বা বিএনপিকে আরো ঘায়েল করতে। সংসদে এরশাদের দলের সঙরা দ্বিতীয় শক্তি হিসাবে থাকলে যে আনন্দ, তা থেকে প্রতিনিয়তই মজা লুটছে আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে, জামায়াত দ্বিতীয় শক্তি হিসেবে পরিণত হলে আওয়ামী লীগ দেশ-দুনিয়াকে দেখাতে পারবে যে, তার বিকল্প হচ্ছে মৌলবাদী-জঙ্গিরা। অন্যদিকে জামায়াতের লাভ হচ্ছে বিএনপির বদলে তারা ব্যাপক শক্তি ও প্রচারণা ভোগ করবে। এমনটা ভেবে থাকলে এটা দুই পক্ষেরই অলীক কল্পনা। বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতিতে জামায়াতের বড় ধরনের শক্তি হওয়া অসম্ভব। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের একাত্তরের ভূমিকার জন্য প্রকাশ্য ক্ষমা না চাইবে, উগ্রতা-হটকারিতা পরিহার না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এ দেশের মানুষ জামায়াত বা পরিবর্তিত নামের সংগঠনের তাদেরকেও কার্যকরী রাজনৈতিক দল হিসেবে বিবেচনায়ই আনবে না। তা ছাড়া তাদের রাজনৈতিক দল-কাম-এনজিওগিরি দুটো জায়গাতেই এসেছে ইতিহাস-নির্ধারিত চরম আঘাত। দান-খাম-ঋণ দেওয়ার ক্ষমতাও তাদের কমে আসছে। আওয়ামী লীগ বলতে গেলে জামায়াতের প্রাণ-ভেমরায় হাত দিয়েছে।

আর, ‘অসৎ-সঙ্গে সর্বনাশ’ বলে যে প্রবাদ আছে তার প্রতিফলন বিএনপিতে ঘটায় অনেক বড় আকারের ভুল বিএনপিও করেছে। ইতিহাসে কোনো কোনো ভুলের মাশুল খুবই চড়া।

।। দুই।।

চেতনা শব্দটিকে অসম্মান প্রসঙ্গে

কিছু লোকের বিতর্কিত কাজের জন্য আজকাল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শব্দটি নিয়ে কাউকে কাউকে ব্যঙ্গ করতে দেখি। সুযোগ পেয়ে এটি বেশি-বেশি করছে তারাই, যারা একাত্তরে বাংলাদেশ চায়নি, পাকিস্তানীদের খুন-লুন্ঠন-ধর্ষণে সাহায্য করেছে এবং যারা বাংলাদেশকে অন্তর থেকে মেনে নেয়নি শুধু, এখনো তারা বাংলাদেশকে পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের মতো দেশে পরিণত করতে চায়। এরা চেতনা শব্দটি কলুষিত করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অসাবধানতা বা অভিমানবশত এটি যখন মুক্তিযুদ্ধের গৌরব-মহিমা ও চেতনার ধারক-বাহকদের মুখে শুনি কিংবা নব্যরাজাকার-আলবদর বা তাদের আদর্শ-অনুসারী উত্তর-পুরুষদের বাইরেও অন্যদের মুখে শুনি, তখন খারাপ লাগে। এ দেশে কিছু লোক ধর্মের অপব্যাখ্যা করে অন্যায় কাজ করে। এখানে অপব্যবহারকারীই সমালোচনার পাত্র, ধর্ম নয়। তেমনি চেতনার নামধারী কিছু অসৎলোক যখন অন্যায় কাজ করে, এখানেও অপকর্মের জন্য দায়ী অসৎ লোকটি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নয়।

যারা মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন-চেতনায় বিশ্বাস রাখেন বা এগুলিকে সর্বতোভাবে উর্ধে তুলে রাখতে চান তাদের সবারই চেতনা শব্দটাকে কলুষিত হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে এগিয়ে আসা উচিত। আওয়ামী লীগের বা তার সরকারের কিংবা অন্য কোনো দল বা সরকারের অনেক কাজের বিরুদ্ধে অনেকের সমালোচনা আছে এবং ভবিষ্যওে থাকবে । কিন্তু সেই সমালোচনাটা দয়া করে মুক্তিযুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়েই করুন, ময়দান ছেড়ে দিয়ে রাজাকার-আলবদরদের কাতারে গিয়ে নয়। মুক্তিযুদ্ধ যেমন আওয়ামী লীগের একার নয়, তেমনি চেতনা শব্দটিও আওয়ামী লীগের একার নয়।

অনেকে মনে করেন বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের যেহেতু সীমান্ত নেই তাই একে আর পাকিস্তান বানানো সম্ভব নয়। তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, পাকিস্তান শুধু একটি ভূখন্ড বা ইতিহাস নয়, এটা একটা নেতিবাচক-প্রতীক, একটি অপদেশ। বাংলাদেশকে পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের মতো দেশে পরিণত করা বা পাকিস্তান-আফগানিস্তানের কার্বনকপি করতে চেষ্টা করার মতো কিছু মানুষ বাংলাদেশে আছে। এটা যারা অস্বীকার করছে বা রাজাকার-আলবদরদের ভাবাদর্শগত প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে তাদের উভয়পক্ষের প্রচারণাই মারাত্মক ক্ষতিকর।

কেউ কেউ আবার জাতীয় ঐক্যের দোহাই দিয়েও উল্লিখিত ক্ষতিকর প্রচারণার পক্ষে থাকার আহবান জানাচ্ছেন। কিন্তু তারা ভুলে যান যে, যারা বাংলাদেশের অস্তিত্বকেই আজ পর্যন্ত মেনে নিতে পারেনি, কিংবা বাংলাদেশের পতাকা হাতে পেলে পাকিস্তান-আফগানিস্তানের দিকে দৌড় লাগাবে তাদের সঙ্গে জাতীয় ঐক্য হয় না। জাতীয় ঐক্য তাদের মধ্যেই হয়, দেশটা যারা একসঙ্গে যুদ্ধ করে সৃষ্টি করেছে, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও দেশের মৌলিক স্বার্থে তারা একমত। কিন্তু মতপার্থক্য ও বিশ্বাসঘাতকতা ভিন্ন বিষয়। বাংলাদেশটাকে এখনও পর্যন্ত কারো কারো মেনে নিতে না পারাটা অবশ্যই বিশ্বাসঘাতকতা। আমি উল্লেখ করেছি বিশ্বাসঘাতকদের কথা। তা ছাড়া এগার শ’ মাইল দূরের পাকিস্তান ভূ-খন্ডটি ২৩ বছর ধরে আমাদের লাথি-ঝাটার মধ্যে রাখা এবং দেশে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়ার ইতিহাস আমাদের ভুলে যাওয়ার কথা নয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানী সৈন্যদের আত্মসমর্পনের খবর শুনে জুলফিকার আলী ভুট্টো জাতিসংঘের ফ্লোরে দাঁড়িয়ে দম্ভের সঙ্গে বলেছিলেন, বাংলা এখন আমাদের হাতছাড়া হলে কী হবে, একে আমরা যুগ-যুগ ধরে শায়েস্তা করে যাব। ভুট্টো মারা গেলেও পাকিস্তান সেই দম্ভ যে ধরে রেখেছে তার প্রমাণ প্রায়ই দিয়ে থাকে। নব্যরাজাকারদেরও এটা বোঝা উচিত, বাংলাদেশ টিকে থাকার জন্যই জন্ম নিয়েছে। পাকিস্তানী দাসত্বের হ্যাংওভার নিঃশেষ হয়ে যাবে বাংলাদেশ থেকে। মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিক চেতনাও বলীয়ান হবে দিনে-দিনে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত নির্বিশেষ মানুষের বহুমাত্রিক সেই চেতনার স্বরূপ তুলে ধরা ও বাস্তবায়নের তাগিদ অব্যাহত রাখা।

আওয়ামী লীগ বা ভারতের অনেক আচরণ কারো কারো কাছে পছন্দ না হলে মুক্তিযুদ্ধও তাদের কাছে সমালোচনা বা ব্যঙ্গ করার বিষয় হয়ে ওঠে। তাদেরও এ কাজ থেকে বিরত থাকার আহবান জানাই। বাংলাদেশের মানুষ বাংলাদেশপন্থী হয়েই প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে পাকিস্তান বা ভারতের ন্যায্য সমালোচনা করতে পারে এবং করেও যাচ্ছে। সরকারের সমালোচনার প্রশ্নেও একই দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত।

আমরা কিছু লোক মুক্তিযুদ্ধের নির্বিশেষ মানুষের চেতনার বিষয়টি নিয়ে কিছু কাজ করে আসছি। সর্বস্তরের কিছু মানুষের বক্তব্য সংগ্রহ করা হয়েছে যথাক্রমে ১৯৯৬ ও ২০০২ সালে। বক্তব্যদানকারীদের অনেকে এরমধ্যে গতায়ু হয়েছেন। অনেকে বেঁচে আছেন। কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া বক্তব্য শাশ্বত। ‘জনগণের মুক্তিযুদ্ধ চেতনার স্বরূপ সন্ধান’ গ্রন্থে আমরা বক্তব্যগুলি মুদ্রিত করে রেখেছি। গ্রন্থটির সম্পাদনা আমার। প্রথম সংস্করণে সহকারী সম্পাদক ছিলেন শাকিল কালাম। বর্তমানে সৃজনকাল নামের বহুমাত্রিক সংগঠনের পক্ষ থেকে এই সংগ্রহ অব্যাহত আছে। ফেসবুক, টুইটার, ওয়েব সাইটসহ নানা মাধ্যমে প্রচারও চলছে। কেউ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পর্কে বক্তব্য ও তথ্য দিয়ে আমাদের সহায়তা করলে তা সাদরে গ্রহণ করা হবে।

লেখক-সাংবাদিক-নাট্যকার।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত