প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নির্বাচনী রাজনীতি
সমঝোতা নাকি সংঘাত

মাইকেল : অমীমাংসিত ইস্যু নিয়েই নতুন বছরের রাজনীতি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে কি না এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে সরকারে মূল ভাবনাটা কীÑএমন প্রশ্নের উত্তর ছাড়াই শেষ হচ্ছে বছর। আবার নির্বাচন সামনে রেখেই বারবার নতুন জোট গঠনের চেষ্টা এবং দুই প্রধান দলÑক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির জোটভুক্ত দলগুলোর ভূমিকা কী হবেÑদেখা দেওয়া এমন ধোঁয়াশারও উত্তর মেলেনি। এমনকি সব দলকে নির্বাচনে আনতে ও নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন (ইসি) কী করবে তা নিয়েও সংশয় রয়েই গেছে। বিশেষ করে বিএনপির নির্বাচনকালীন সরকার, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ ও সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনের দাবির কী হবেÑএই সংকটও রয়ে গেল নির্বাচনী রাজনীতিতে।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে, নতুন বছরে নির্বাচন কেন্দ্র করে মূল দুই ইস্যুতে দেখা দেওয়া এমন সংকটের সমাধান হবে, নাকি দেখা দেবে অনাকাক্সিক্ষত রাজনীতি? এমন প্রশ্ন ছিল বছরজুড়েই। এ নিয়ে নির্বাচনী রাজনীতিতে গতি-প্রকৃতির বদল হয়েছে। সংকট সমাধানে কখনো আশা জেগেছে, কখনো দেখা দিয়েছে নিরাশাও। বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচির প্রতি সরকার নমনীয় মনোভাব দেখিয়েছে। শান্তিপূর্ণ রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনও আশা জাগিয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাশাপাশি দেশি-বিদেশি কূটনৈতিক মহলের পক্ষ থেকেও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পক্ষ থেকেও কিছুটা নরম সুরেই কথা বলতে শোনা গেছে বিভিন্ন সময়। বিশেষ করে রাজনীতির মাঠে অনেক বেশি সংযত ছিল ক্ষমতাসীনরা।

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বারবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ওপর জোর দিয়েছেন। সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতেও নির্দেশ দিয়েছেন দলীয় নেতাদের। এমনকি আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের সদিচ্ছার কথাও বলেছেন তিনি। বছরের শেষের দিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেছেন, যত প্রতিকূল পরিবেশই আসুক না কেন, বিএনপি আগামী নির্বাচনে যাবে। দেশি-বিদেশি কূটনীতিরাও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলেছেন। ফলে একধরনের আশা জেগেছিল মানুষের মধ্যে; হয়তো বছরের শেষ দিকে হলেও সমাধানের পথ মিলবে; নতুন বছরের রাজনীতিতে সমঝোতার আভাস থাকবে। কিন্তু তা হয়নি।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি শেষ পর্যন্ত এসব ইস্যু নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানেই রয়ে গেছে। বছর শেষে এই সংকট সমাধানে কোনো পক্ষই আশার কথা শোনাতে পারেনি। শেষে এসে গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেন ‘নাকে খত দিয়ে বিএনপি নির্বাচনে আসবে’। তিনি আরো বলেন, কোন দল নির্বাচনে অংশ নেবে আর কোন দল নেবে নাÑসেটা তাদের সিদ্ধান্ত। আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, নির্বাচন প্রশ্নে বিএনপিকে কোনো ছাড় দেওয়া বা সাধাসাধি নয়, যা হওয়ার সংবিধান মোতাবেক হবে। আর বিএনপিও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। এমনকি দলের পক্ষ থেকে বছরজুড়ে নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি জানানো হলেও সে সরকারের কোনো ফর্মুলা বা রূপকল্প দিতে পারেনি দলটি। দলের নীতিনির্ধারকরা বলেছেন, নির্দলীয় বা সহায়ক সরকারের দাবিতে তারা মাঠে নামবেন এবং তা নতুন বছরের মাঝামাঝি সময়ে।

অবশ্য চলতি বছরের সার্বিক রাজনীতি বিশ্লেষণ করে ইতিবাচক আভাস দিয়েছেন নির্বাচন ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, নির্বাচন নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সাম্প্রতিক রাজনীতিতে কিছুটা হলেও আশা জেগেছে। সরকার বলছে, তারা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায়। বিএনপিও যেতে চাইছে নির্বাচনে। এখন প্রশ্ন হলো, নির্বাচন ঘিরে দেখা দেওয়া বিতর্কের সমাধান কীভাবে হবে। সেটা ভাবতে হবে সবাইকে। সংকট সমাধানে সরকারের সদিচ্ছা প্রয়োজন। দেশের মানুষও তাকিয়ে সেদিকে।

নির্বাচনী সংকট সমাধানে আওয়ামী লীগ কী চায়Ñএমন প্রশ্নের উত্তরে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবছে না দলটি। বরং বিগত সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে বিএনপি যেমন সহিংস আন্দোলন কর্মসূচি দিয়েছিল, এবার সেই চেষ্টা করলে তা কঠোরভাবে দমনের নীতি নেবে সরকার। এমনকি বিএনপিকে আগামী নির্বাচনকালীন সরকারে রাখার বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে বিএনপিকে কোনো প্রস্তাব দেওয়ারও আগ্রহ নেই। আর এবার বিএনপি সংসদে না থাকায় নির্বাচনকালীন ছোট পরিসরের মন্ত্রিসভায় টেকনোক্র্যাট কোটায় এক-দুজনের বেশি রাখার সুযোগও নেই। ফলে গত নির্বাচনকালীন সরকারে অংশগ্রহণের জন্য বিএনপিকে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তা আগামী নির্বাচনে দেওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, বিএনপির দাবি অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার কিংবা সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের কোনো সম্ভাবনা নেই। নির্বাচন হবে সংবিধান অনুযায়ী। নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনা করবে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে বা অন্য কোনো উদ্যোগে ছোটখাটো কোনো বিষয়ে দ্বিমত থাকলে তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা হতে পারে। তিনি আরো বলেন, বিএনপি যদি আন্দোলনের পথে হাঁটে তবে আমরা তা রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করব। আর একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন সহযোগিতা করবে। তারা তাদের দিক থেকে উদ্যোগ নেবে, আমরা আমাদের দিক থেকে সহযোগিতা করব। তিনি এমনও বলেন, নির্বাচনকালীন সরকারে সংবিধান অনুযায়ী বিএনপির অংশগ্রহণের সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না।

তবে নতুন বছরে নতুন রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে মাঠে নামার ইঙ্গিত দিয়েছে দলটি। অতীতে ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে সেখান থেকে বেরিয়ে একেবারে নতুন ধারার রাজনীতি শুরু করতে চান দলের নেতারা। কোনো অবস্থাতেই তাড়াহুড়ো করে হঠকারী কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না দল। সরকার যত কঠোর অবস্থান নিক বা উসকানিমূলক কথা বলুক, আপাতত ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার কৌশল নিয়েছে। দলটি মনে করছে, নির্বাচনের এক বছর আগে হঠকারিতা করা যাবে না বা ভুল কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।

এ ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, নির্বাচন এখনো কিছুটা দূরে থাকায় বিএনপি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে। কিন্তু সরকারের সম্ভবত শান্তিপূর্ণ অবস্থান পছন্দ নয়। তাই একতরফা নির্বাচনের ইঙ্গিত দিয়ে তারা নানা ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছে। কিন্তু আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ছাড়া আমরা কিছুই করব না। কারো উসকানিতে পা দেব না। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায়ের আন্দোলন উপযুক্ত সময়েই হবে।

নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির প্রধান তিন দাবি অসাংবিধানিক। এর মধ্যে নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে সংবিধানের ৫৫(১) অনুচ্ছেদে ও ৫৬ অনুচ্ছেদের (২) উপ-অনুচ্ছেদের শর্তাংশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানে সহায়ক বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কোনো কাঠামো নেই। পঞ্চদশ সংশোধনীর পর নির্বাচনকালীন সরকারের রূপ কী হবে, কারা মন্ত্রিসভায় থাকবেন বা থাকবেন নাÑতা নির্ধারণের একমাত্র অধিকার প্রধানমন্ত্রীর।

একইভাবে সংবিধানের ১২৩(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মেয়াদ অবসানের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়ার এখতিয়ার কারো নেই বলেও জানিয়েছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞরা। এই বিধানের কারণে সংসদ বহাল রেখেই নির্বাচন কমিশনকে আরেকটি সংসদ নির্বাচন করতে হবে। তবে ওই সময় সংসদের অধিবেশন বসবে না।

এমনকি নির্বাচনের আগে বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের যে দাবি করেছে, সংবিধানের এ ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা নেই বলেও জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ব্যাপারে সংবিধানে বলা আছে, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সংসদের মেয়াদ শেষের ৯০ দিনের মধ্যে। ফলে সরকারের পদত্যাগের প্রশ্ন ওঠে না। কোনো কারণে যদি প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগও করেন তাহলেও সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ আস্থাভাজন কাউকে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেবেন।

এ ব্যাপারে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন বলেন, কিছু নেতিবাচক ঘটনা থাকলেও রাজনীতিতে সমঝোতার একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। যা আমাদেরকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি সব দলের অংশগ্রহণমূলক হওয়ার বিষয়ে আশাবাদী করে তুলছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ করে মনে হচ্ছে, সরকার ও বিরোধী দল সবাই চাচ্ছে, আগামী নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে ও সমঝোতার মধ্যে অনুষ্ঠিত হোক। সরকার থেকেও এ বিষয়ে বলা হয়েছে ও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিএনপিও নির্বাচনে অংশ নেবে বলেই দলটির বিভিন্ন নেতার বক্তব্যে মনে হচ্ছে।

এই নির্বাচন বিশ্লেষক আরো বলেন, নির্বাচনী রাজনীতিতে বর্তমানে যে সমঝোতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, তা ধরে রাখতে প্রয়োজন সব রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছা। গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে রাজনীতিবিদদের আন্তরিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। প্রতিদিনের সংবাদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত