প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শিক্ষার উল্টোযাত্রা আর কত দিন চলবে?

আবুল মোমেন : শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড—এই আপ্তবাক্য বহুব্যবহারে জীর্ণ এবং হয়তো তাই অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু মহাজন উক্তি অকারণে আপনি তৈরি হয় না। এ হলো জাতির মনীষার পুঞ্জীভূত উপলব্ধি। শিক্ষা কেবল স্কুল-কলেজের মতো প্রতিষ্ঠান থেকে আসে না, এতে কৃতিত্বও শুধু পরীক্ষার মাধ্যমে অর্জিত হয় না। একটি স্বাভাবিক প্রাণবন্ত মানবসমাজে নানাভাবে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ থাকে। সেই সুযোগগুলোর মান ও কার্যকারিতার ওপরই নির্ভর করে কোনো সমাজের সামষ্টিক গুণমান।

সামন্ত বা আধা সামন্তব্যবস্থা এবং ঔপনিবেশিক শাসন যেকোনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে হীনম্মন্যতার জন্ম দেয়। হীনতার বোধ বহু চারিত্রিক দোষের কারণ হয়ে ওঠে, এর প্রধান কয়েকটি হলো কপটতা ও মিথ্যাচারের অভ্যাস, স্বার্থপরতা ও স্বজনতোষণ এবং মূল্যবোধ ও নৈতিকতা নিয়ে ভড়ং-অহমিকা প্রকাশে অভ্যস্ততা। বাঙালির এসব দোষ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের অনেক উক্তি-খেদোক্তির কথা আমরা জানি। এ দেশে আবার মুক্তিযুদ্ধসহ রাজনৈতিক ইতিহাসের গৌরবময় যত সামষ্টিক অর্জন, তার দ্বারা নিজের জন্য গৌরবের দুর্ভেদ্য ঢাল তৈরির প্রয়াস যুক্ত হয়েছে। এর আড়ালে নিজের অভ্যস্ত চরিত্র বজায় রেখে পার্থিব উন্নতি নিষ্কণ্টক রাখাই থাকে মূল উদ্দেশ্য। হীনতাদুষ্ট মানুষ নানাভাবে সুযোগ চায়—রেহাই ও রেয়াত চায় সবখানে।

এই অসুস্থ ও দুর্নীতিগ্রস্ত প্রক্রিয়া পারস্পরিক যোগসাজশেই চলে। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিচার হয় না, অপরাধী ধরা পড়ে বিচারে সোপর্দ হলেও শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো পর্যায়ের দুর্বলতা-আপস-দুর্নীতির ফাঁক গলে বিনা শাস্তিতে বেরিয়ে আসে।

সমাজে দুর্নীতি ও অপরাধ চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে চলার কারণ এই বাস্তবতার মধ্যেই নিহিত। ব্রিটিশবিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের সময় রবীন্দ্রনাথ বারবার সাবধান করে বলেছিলেন স্বাধীনতা কতটা বাহ্যিকভাবে পাওয়ার এবং কতটা অন্তরে অর্জনের বিষয়। এর জন্য নিজেকে কীভাবে উপযুক্ত করে তুলতে হয়, সেসব কথা তাঁর ‘স্বদেশী সমাজ’সহ নানা লেখায় পাওয়া যাবে।

সম্প্রতি স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশতক পর দেখা যাচ্ছে আমাদের মেরুদণ্ড নানা রোগে আক্রান্ত—প্রশ্নপত্র ফাঁস তার মধ্যে এই সময়ের জ্বলন্ত ইস্যু। তবে সর্বস্তরে শিক্ষার মানের অধোগামিতা কেন জাতিকে ততটা দুর্ভাবনায় ফেলছে না, সেটা বিস্ময়কর। যাহোক, প্রশ্নপত্র ফাঁস নামক ব্যাধি বা অপরাধ এমন মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে একদিকে প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নও ফাঁস হওয়া শুরু হয়েছে; অন্যদিকে পুলিশ-র‍্যাব-গোয়েন্দা এবং সর্বশেষ দুদক পর্যন্ত এর নিদান খুঁজতে যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে অনেক অপরাধী ধরা পড়েছে, শনাক্ত হয়েছে অপরাধের প্রক্রিয়া। তবে এখনো কারও শাস্তি হয়নি। যে কটি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, তাতেও সন্দেহভাজন অপরাধীরা পার পেয়ে গেছে। এটাই স্বাভাবিক হীনতার যোগসাজশের দুর্নীতি-সংস্কৃতিতে। দুদক প্রশ্নপত্র ফাঁস-ব্যাধি নিরাময়ে ৩৯টা সুপারিশ বা দাওয়াই বাতলেছে! তাদের সেই ব্যবস্থাপত্রে উন্নত মানের বিশেষ তলার সুপারিশও রয়েছে!

সমাজের কোথাও অপরাধ ঘটলে তা নিষ্পত্তির সনাতন ব্যবস্থা চলবে, তা নিয়ে আপত্তির কিছু নেই। তবে ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছি, চোর ধরার ব্যাপারে এবং যেকোনো সংকটের সমাধান বাতলে দেওয়ার ক্ষেত্রে বাঙালি বড়ই উত্সাহী। শিক্ষা নিয়ে কথা বলার অধিকার সবার। কেননা, নিদেনপক্ষে অভিভাবক হিসেবে সবারই অংশীদারত্ব আছে এতে। এর ফলে গৃহকর্তা হিসেবে শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় সত্যিই নানাভাবে অবিরাম জর্জরিত হচ্ছেন—কখনো প্রশ্নবাণে, কখনো গায়ে-পড়া পরামর্শে, কখনো গা-জ্বালানো সহানুভূতির চোটে। বোঝা যাচ্ছে, তাঁর মতো সহিষ্ণু সজ্জনেরও মাঝেমধ্যে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। তিনি প্রথম খড়্গহস্ত হয়েছিলেন প্রাইভেট পড়ানোর ওপর, তারপর নোট বই, কোচিং–বাণিজ্য বন্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন, প্রতিকার হিসেবে নানা উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে—কঠোর আইন, শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি, বুদ্ধিজীবী-শিক্ষাবিদদের পরামর্শ গ্রহণ ইত্যাদি। কিন্তু ভবি ভোলার নয়, রোগ নানাভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। প্রথমত নোটবই, কোচিং, প্রাইভেট টিউশনি—কিছুই বন্ধ হয়নি; উপরন্তু এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁস। এটিও মূলত বাণিজ্য-দুর্নীতির বাণিজ্য, এটুকু।

এবার আসল কথায় আসা যাক, তবে তার আগে একটা কথা বলা দরকার। ব্রিটিশ ভারতের শিক্ষাব্যবস্থাকে ব্যঙ্গ করে লেখা রবীন্দ্রনাথের বহুল পঠিত ‘তোতাকাহিনী’তে পাখিটি শিক্ষার দাপটে শেষ পর্যন্ত মরিয়াই বাঁচে। কিন্তু একালের বিদ্যার্থী সেকালের তোতা নয়, মনে হয় এরা হলো চিরকালের ফিনিক্স পাখি, ভস্ম থেকে উঠে আসে। তবে জন্মান্তরে তাদের রূপান্তরও ঘটছে, তারা শিক্ষার্থী থেকে পরীক্ষার্থীতে পরিণত হচ্ছে। প্রাণ বাঁচাতে তারা এই মূল্য দিচ্ছে এবং বলা যায় রোগটা এখানেই। নোটবই, প্রাইভেট, কোচিং, প্রশ্ন ফাঁস—সবই হলো জ্বরের মতো মূল রোগের লক্ষণ।

বর্তমানে শিক্ষা কেবল পরীক্ষার ফলাফলনির্ভর একটি ব্যবস্থা। সরকার, শিক্ষা বিভাগ ও গণমাধ্যম মিলে এর আকর্ষণ যেমন বাড়িয়েছে, তেমনি ছাত্র ও অভিভাবকদের মনে এর জন্য লালসাও জাগিয়েছেন শিক্ষক এটি পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমে। ফলে এই পুরো বাণিজ্যের লাভের ভাগ তাঁর পাতেই বেশি পড়বে। তিনি কেনই–বা এই পড়ে-পাওয়া লাভ কুড়িয়ে নেবেন না? তা ছাড়া সরকার ও অভিভাবক, যাঁরা এই প্রতিযোগিতা লাগিয়েছেন এবং এতে লড়ছেন, তাঁদের তুলনায় সামাজিকভাবে শিক্ষক এতই দুর্বল যে এর অন্তরায় হতে গেলে তাঁকে যথেষ্ট খেসারত দিতে হবে। সেটা সামলানোর ক্ষমতা তাঁর নেই। আমরা ভুলিনি, প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা চালু হওয়ার পর অধিক হারে পাস ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষা বিভাগ থেকেই শিক্ষক-পরীক্ষকদের ধমক দিয়ে বলা হয়েছিল নম্বর কি তাঁদের পৈতৃক সম্পত্তি নাকি যে এত কৃপণের মতো দিচ্ছেন, তখন দশের অধিক পেলেই পাস করানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

অর্থাৎ এমডিজির লক্ষ্য পূরণে হোক বা নেহাত সাফল্যের মোহে পড়ে হোক, সরকার ও শিক্ষা বিভাগ যুগপৎ শিক্ষকদের নৈতিক দুর্নীতিতে উৎসাহ দিয়েছিল। এর ফল আমরা হাতে হাতে পেয়েছি। সরকারি জরিপেই দেখা যাচ্ছে, প্রাথমিকে উত্তীর্ণদের তিন-চতুর্থাংশই মূল বিষয়গুলোতেই অর্জন-লক্ষ্য পূরণ করে না। অথচ পিইসি-জেএসসি বন্ধ করার কথা বললে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আপনারা শহরের মানুষ এটা বুঝবেন না, গ্রামগঞ্জের দরিদ্র প্রান্তিক মানুষ উৎসবের পরিবেশে এতে অংশ নেয়, একটা সনদের মূল্য তাদের কাছে অনেক। এভাবে গরিবকে ঠকানোর চিন্তা কেন তাঁদের মতো ভালো মানুষেরাও লালন করেন, তা আমাদের বোধগম্য নয়।

হ্যাঁ, আসলে কথাটা হলো, স্কুল পর্যায়ের প্রাথমিকে শিশু ভাষা শিখবে (বাংলা ও ইংরেজি), গণিত শিখবে এবং সমাজ, পরিপার্শ্ব, আচরণ ও বিজ্ঞানের কিছু বিষয় জানবে। মাধ্যমিকে যেতে যেতে তারা সাহিত্য পড়বে, চিন্তা করতে শিখবে, যুক্তির খণ্ডন ও উত্তরণ–সামর্থ্য বুঝবে, যুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত হবে, নিজের ভাষায় লিখবে, মৌলিকত্ব ও স্বকীয়তার প্রতি আগ্রহী হবে, চিন্তার পারম্পর্য বুঝবে, বিচার-বিবেচনার বোধ তৈরি হবে ইত্যাদি। সব পর্যায়েই খেলাধুলা, হাতে কিছু তৈরি করা, বিনোদন, কলা, সংস্কৃতিচর্চাসহ আনন্দের আয়োজন থাকবে। কিন্তু পরীক্ষার প্রস্তুতি ও পরীক্ষায় বসাই যখন একমাত্র কাজ হয়ে পড়েছে, তখন শিক্ষার আসল কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে আনন্দ নেই, চাপ আছে; জ্ঞানচর্চা উপভোগের সুযোগ নেই, আছে আশু ফল দেওয়ার তাড়না। এ অনেকটা বাল্যবিবাহের পর অকালমাতৃত্বের কারণে স্বাস্থ্যের যে সর্বনাশ ঘটে, তার সঙ্গেই তুলনীয়।

পরীক্ষা-পাগল জাতিকে এই প্রবোধটুকু দেওয়া জরুরি যে পরীক্ষা উঠিয়ে দেওয়ার পাগলামি আমরা করব না, তবে তার লক্ষ্য প্রথম-দ্বিতীয় হওয়া নয়, শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন করা এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা গ্রহণ। এ কাজের অধিকারী শিক্ষক, তাই আমলাদের বাদ দিয়ে তাঁকেই সেই অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। পরীক্ষাই শিক্ষার একমাত্র মঞ্জিল না হলে কাজটা কঠিন হওয়ার কথা নয়।

শিক্ষার রোগবালাই দূর হবে অস্বাস্থ্যকর (শিক্ষাবিরুদ্ধ) ব্যবস্থা পাল্টালেই। প্রথম কাজ হবে পরীক্ষার পরিবর্তে শিক্ষার গুরুত্ব ফিরিয়ে আনা। দ্বিতীয় কাজ হবে স্কুলে স্কুলে শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করা। তৃতীয় কাজ হবে শিক্ষকদের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া। বর্তমান ব্যবস্থায় বহু কর্তৃপক্ষের তলায় চাপা পড়ে স্কুলশিক্ষকদের হীনতার বোধ আরও বেড়েছে এবং তাতে দুর্নীতিতে শরিক হওয়ায় কোনো মানসিক বা নৈতিক বাধা থাকে না।

সত্যি বলতে, দুর্বল ছাত্রের জন্য স্কুলে কোনো ব্যবস্থা না থাকলে সে তো প্রাইভেট শিক্ষকের সাহায্য নেবে, নোটবইও পড়তে পারে। তাতে সমস্যাও নেই। সমস্যা হলো আমরা যখন এমন ব্যবস্থা চালু করি, যাতে মূল বিষয় গৌণ হয়ে সহায়ক ব্যবস্থা মুখ্য, এমনকি একমাত্র পাথেয় হয়ে যায়। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, আজ পাঠ্যবইয়ের চেয়ে নোটবই, শিক্ষকের চেয়ে প্রাইভেট টিউটর, স্কুলের চেয়ে কোচিং সেন্টার, শিক্ষার চেয়ে পরীক্ষা, জ্ঞানের চেয়ে নম্বর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এটা যে উল্টোযাত্রা, এসব যে উল্টো ফল, তা বোঝার মতো বোধ নিশ্চয় আমাদের আছে। তাই বলব, এবার উল্টোরথে চেপে মূল পথে ফিরে এলেই হয়।

আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক। প্রথম আলো

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত