প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডিএনসিসিতে শ্নথগতি

ডেস্ক রিপোর্ট : তেজগাঁওয়ে রাস্তার ওপর গড়ে ওঠা ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদ করতে গিয়ে ২০১৫ সালের ২৯ নভেম্বর অবরুদ্ধ হয়েছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আনিসুল হক। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে শেষ পর্যন্ত ট্রাকস্ট্যান্ডটি অপসারণ করেছিলেন তিনি। তার অবর্তমানে রাস্তার ওপর আবারও পার্কিং শুরু করেছে ট্রাকচালকরা। মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না ডিএনসিসি।

শুধু একটি উদাহরণ নয়। মেয়র আনিসুল হক দীর্ঘদিন লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কাজে গতি হারায় ডিএনসিসি। ৩০ নভেম্বর তার মৃত্যুর পর এই গতি আরও শ্নথ হয়েছে। মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার পর নাগরিকবান্ধব যেসব উদ্যোগ তিনি নিয়েছিলেন, সেসব কাজেও পড়েছে ভাটা। দাপ্তরিক কাজে গতিহীনতার পাশাপাশি উন্নয়ন কাজও চলছে ধীরে। নগর ভবনে বেড়েছে দলীয় ঠিকাদারদের পদচারণা। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, টেবিলে টেবিলে ফাইলের স্তূপ, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে অচলাবস্থা ইত্যাদি মিলিয়ে স্থবির হয়ে পড়েছে গুলশান নগর ভবন।

ডিএনসিসির প্যানেল মেয়র মো. ওসমান গনি এই বিষয়গুলোর কোনো কোনোটি স্বীকার করে জানান, আনিসুল হক অসুস্থ হওয়ার পর একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। তিনি প্যানেল মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই শূন্যতা দূর করার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। সবকিছুতেই গতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন।

তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডের সামনের সড়কে আবারও পার্ক করা নিয়ে বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান ড্রাইভার্স ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি তালুকদার মো. মনির দাবি করেন, দূর-দূরান্ত থেকে আসা চালকরা জায়গা না পেয়ে কখনও কখনও রাস্তার ওপর গাড়ি রাখে। তবে দ্রুত সরিয়েও নেয়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির কার্যকরী সভাপতি ও বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. রুস্তম আলী খান বলেন, কেউ যাতে রাস্তার ওপর গাড়ি না রাখে সে জন্য মাইকিং করা হচ্ছে। তবে রাজধানীতে পরিকল্পিত একটি ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি বলেও মতামত দেন তিনি।

প্রায় একই অবস্থা আমিনবাজার থেকে শ্যামলী পর্যন্ত সড়কটির। ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি এ সড়ককে পার্কিংমুক্ত ঘোষণা করেন মেয়র আনিসুল হক। সেদিন থেকে সড়কের ওপর যানবাহন পার্কিংয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। সম্প্রতি ওই সড়কেও আবার বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যানসহ অন্য যানবাহন পার্ক করা হচ্ছে। সড়কটিতে আবারও সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট। একই অবস্থা মিরপুর-১২, আবদুল্লাহপুর ও মহাখালী এলাকার। ওই এলাকার সড়কগুলোও পার্কিং ফ্রি ঘোষণা করেছিলেন আনিসুল হক।

ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, রাস্তাগুলো আবারও অবৈধ দখলে চলে যাওয়া নিয়ে ডিএনসিসি চিন্তিত। তবে বিষয়গুলো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবগত করে ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা করে তাদের মহাখালীতে নির্মিত ডিএনসিসি মার্কেট, যাত্রাবাড়ী ও আমিনবাজারে স্থানান্তরের বিষয়ে সম্মত করেছিলেন মেয়র আনিসুল হক। কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীরা ওয়াদা করেছিলেন কয়েক মাসের মধ্যে তারা সরে যাবেন। কিন্তু আনিসুল হকের অনুপস্থিতিতে কারওয়ান বাজার স্থানান্তরের উদ্যোগ ধামাচাপা পড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরাও বেঁকে বসেছেন।

কারওয়ান বাজার কাঁচাবাজার ও ক্ষুদ্র আড়ত দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক লোকমান হোসেন জানান, তারা কারওয়ান বাজার থেকে সরে যাওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন ঠিকই, তবে যে তিনটি স্থানে তাদের স্থানান্তরের কথা বলা হয়েছিল, সেখানে সেলামি ছাড়া দোকান বা আড়ত তাদের বরাদ্দ দিতে হবে। আর এসব মার্কেটে যাতায়াতের জন্য আধুনিক রাস্তা বানিয়ে দিতে হবে, তবেই তারা সরবেন।

প্যানেল মেয়র ওসমান গনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে গুলশান নগর ভবনে অপেশাদার কিছু দলীয় ঠিকাদারের যাতায়াত বেড়েছে। এসব ঠিকাদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ- তারা কাজ পাওয়ার পর কমিশন নিয়ে অন্যের কাছে বিক্রি করে দেন। আর দু-একজন কাজ করলেও মান অত্যন্ত নিম্ন। আনিসুল

হক দায়িত্ব নেওয়ার পর ভুইফোঁড় এসব ঠিকাদার নগর ভবন থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই ভুইফোঁড় ঠিকাদাররা আবারও ফিরে আসায় প্রকৃত ঠিকাদাররা বিপাকে পড়েছেন। এতে করে ধীরগতি সৃষ্টি হচ্ছে কাজে।

আনিসুল হক পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে নগর পরিচ্ছন্নতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সেই পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমেও সৃষ্টি হয়েছে ঢিলেমি। সম্প্রতি আদালত রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টার মধ্যে বর্জ্য অপসারণের নির্দেশ দিলে বিপাকে পড়ে করপোরেশন। ফলে নগরীর অনেক স্থানে বর্তমানে আবার বর্জ্যের স্তূপ পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে।

এ ছাড়া মিরপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকায় প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিকায়ন প্রকল্পের কাজ চলছে অত্যন্ত ধীরগতিতে। মিরপুরের অনেক এলাকা খুঁড়ে রাখা হয়েছে দীর্ঘদিন। এসব এলাকায় নগরবাসীর ভোগান্তির অন্ত নেই। বনানী কবরস্থানের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ এখনও শুরু হয়নি। বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রেও তৎপরতা নেই। বিভিন্ন আঞ্চলিক কার্যালয়ে বেড়ে গেছে সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি। করপোরেশনের দাপ্তরিক কাজে দেখা দিয়েছে গতিহীনতা।

এর বাইরে আনিসুল হক তিনটি পৃথক জলাধার তৈরির যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সেগুলোর কাজও এগিয়ে নেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেই। বিভিন্ন বাস কোম্পানিকে কয়েকটি কোম্পানির আওতায় এনে পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগও থেমে গেছে। যানজট নিরসনে ইউটার্ন নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়া হলেও সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর বাধা দিচ্ছে।

প্যানেল মেয়র মো. ওসমান গনি আরও জানান, তেজগাঁও টার্মিনালের সামনের সড়ক ও আমিনবাজার-শ্যামলী সড়কের দখল নিয়ে তিনি পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছেন। তেজগাঁও টার্মিনালের সামনের সড়ক দখলমুক্ত করা হচ্ছে। আনিসুল হকের নেওয়া উদ্যোগগুলো ডিএনসিসি বাস্তবায়ন করবে। যেগুলো বাস্তবায়ন হয়েছে, সেগুলো রক্ষা করা হবে। দলীয় ঠিকাদারদের পদচারণা প্রসঙ্গে তিনি জানান, যেহেতু তিনি একটি দল করেন, কাজেই দলীয় নেতাকর্মীরা তার সঙ্গে দেখা করতে যাবেন এটাই স্বাভাবিক। এটাকে দলীয়ভাবে দেখার কারণ নেই। কাজের মান নিশ্চিত করা হচ্ছে। সব কাজে গতি ফিরিয়ে আনায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত