প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ওরা বেড়ে উঠছে মা-বাবা ছাড়া
স্বজনের কারণেই বিপন্ন শৈশব

ডেস্ক রিপোর্ট : শৈশব মানে বাবা-মায়ের আদরে বেড়ে ওঠা, অবাধ দুরন্তপনা, রঙিন স্বপ্নের হাতছানি। কিন্তু আপনজনদের নিষ্ঠুরতা ও বিবেচনাহীনতায় সেই সৌভাগ্য হারিয়েছে ওরা। উন্মত্ত আবেগে কিংবা ঠাণ্ডা মাথায় তাদের কারও বাবা হত্যা করেছে মাকে, আবার কারও মায়ের হাতে খুন হয়েছে বাবা। ফলে তাদের বাবা-মায়ের একজন কারাগারে, অন্যজন চিরতরে হারিয়ে গেছেন। আত্মীয়-স্বজনের কাছে আশ্রয় মিললেও নিস্তরঙ্গ ও বর্ণহীন হয়ে পড়েছে এই শিশুদের শৈশব। ভবিষ্যৎও আটকে গেছে অনিশ্চয়তার ঘেরাটোপে।

গত ১ নভেম্বর জামিল শেখকে বালিশচাপা দিয়ে হত্যাচেষ্টার সময় তার সাড়ে চার বছরের ছেলে আলফি জেগে ওঠে ঘুম থেকে। তাকে ফের ঘুম পাড়িয়ে দেয় মা আরজিনা। ভোরে বাসায় লোকজনের সমাগমে ঘুম ভাঙে তার। এ সময় সে দেখতে পায় তার বাবা আর বোনের রক্তাক্ত নিথর দেহ বিছানায় পড়ে আছে। এই ভয়ঙ্কর দৃশ্য এখনও ভুলতে পারেনি সে। ঘুমের মধ্যে কখনও ‘রক্ত-রক্ত’, কখনও বা ‘আব্বু-আপু’ বলে চিৎকার করে ওঠে। ছোট্ট আলফির মা আরজিনা এখন স্বামী ও মেয়ে হত্যায় গ্রেফতারের পর কারাবন্দি। আলফির ঠাঁই হয়েছে তার চাচা-চাচির কাছে। আর তার নিজের মনে ঠাঁই নিয়েছে বেদনা আর আতঙ্ক।

শুধু আলফি নয়, রাজধানীতে এমন শিশু এখন আরও অনেকেই। গত চার বছরে পারিবারিক ঝগড়া কিংবা পরকীয়া সম্পর্কের জের হিসেবে খুনের ঘটনাগুলোর মধ্যে আলোচিত সাতটির বিষয়ে অনুসন্ধান করেছে । এসব ঘটনায় খুন হয়েছে সাত বাবা-মা এবং দুই শিশু। এসব পরিবারের বেঁচে থাকা ১০ শিশু বড় হচ্ছে আত্মীয়ের কাছে। কষ্টে কাটছে তাদের সময়।

সমাজবিজ্ঞানী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এএসএম আমানুল্লাহ বলেন, ‘সব শিশুই সমাজের সম্পদ। বাবা বা মা হারানো শিশু সমাজের বাইরের নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহপাঠীরা কিংবা সমাজ তাকে যেন বাবা-মায়ের কারণে অপবাদ দিতে না পারে, সেজন্য সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সহযোগিতা করতে হবে। মানসিক এবং অর্থনৈতিকভাবেও সহায়তা দিতে হবে তাদের। এই শিশুরা যাতে মানসিকভাবে ভেঙে না পারে, সেজন্য নিয়মিত কাউন্সেলিং করতে হবে।’

মায়ের একটি ব্যাগই আবিদের স্মৃতি :তিন বছর আগে যখন মা ও ভাইকে ঘরের মধ্যে হত্যা করা হয়েছিল, তখন আবিদের বয়স দেড় বছর। সদ্য কথা বলতে শেখা এই শিশুর সামনেই নির্মমভাবে বালিশচাপা দিয়ে তার মা আইরিন আক্তার আরজু ও একমাত্র ভাই সাবিদকে (৭) শ্বাসরোধে খুন করে তারই বাবা আমান উল্লাহ আমান। ২০১৪ সালের ৫ নভেম্বর মিরপুরের মধ্য পাইকপাড়ায় স্ত্রী ও সন্তান হত্যায় গ্রেফতারের পর আমান এখন কারাবন্দি। আবিদ থাকছে মধ্য পীরেরবাগে খালা নিগার সুলতানা আঁখি ও খালু সোহেল ইকবাল ফিরোজের কাছে। এখন তার বয়স সাড়ে চার বছর। ১০ ডিসেম্বর মধ্য পীরেরবাগে সোহেল ইকবালের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, পুরনো একটি ব্যাগ নিয়ে নাড়াচাড়া করছে আবিদ। ব্যাগটি কার জানতে চাইলে, সেটি জড়িয়ে ধরে সে জানায়, এটি মায়ের ব্যাগ। তার জন্য এটি তার মা রেখে গেছেন। মা আর ভাইকে তার বাবা আমান খুন করেছে। এর বিচারও দাবি করে ছোট শিশুটি।

আবিদের খালা বলেন, মাঝে মাঝেই সে বাসার বারান্দার জানালা ধরে আকাশের দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকে। নিজের দুই সন্তানের পাশাপাশি আবিদও এখন তার এক সন্তান বলে জানান তিনি।

ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে আলফি :উত্তর বাড্ডার বাসায় গাড়িচালক জামিল শেখ ও তার নয় বছরের মেয়ে নুসরাত জাহান জিদনীকে হত্যা করা হয় গত ১ নভেম্বর। জামিলের স্ত্রী আরজিনা বেগম ও আরজিনার প্রেমিক শাহিন মল্লিক এই জোড়া খুনের ঘটনা ঘটায়। তাদের সহযোগী ছিল শাহিনের বল্পুব্দ কোয়াজ আলী। এরা তিনজনই এখন কারাগারে। তবে আরজিনা ও জামিলের এক ছেলে আলফি বেঁচে রয়েছে। সে এখন থাকে চাচা ইব্রাহিম শেখের কাছে। তিনি ঢাকায় গাড়ি চালান। তবে দুই মেয়ে ও আলফিকে নিয়ে তার স্ত্রী কারিমা বেগম গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের বনগ্রাম পূর্বপাড়ায় থাকেন। তারা আলফিকে লালন-পালন করার দায়িত্ব নিয়েছেন জানিয়ে কারিমা বেগম বলেন, বাবা ও বোনের হত্যার স্মৃতি এখনও ভোলেনি আলফি। রাতে ঘুমের মধ্যে ‘রক্ত, রক্ত’ বলে চিৎকার করে, আতঙ্কিত চোখে ‘আব্বু-আপু’ বলে কান্নাকাটি করে। তিনি জানান, তাদের বাড়ির সামনে একটি বাড়ির জানালায় থাই গ্লাস লাগানো। সেটি দেখলেই আলফি বলে, ‘ওই বাড়িতে আমার আব্বু আছে, আপু আছে। ওই বাড়িতে আমার আম্মু আব্বু আর আপুকে মেরে ফেলেছে।’ উত্তর বাড্ডার বাসাটির জানালা থাই গ্লাসের ছিল বলে জানান তিনি।

আতঙ্কে মারিয়া :পারিবারিক দ্বন্দ্বে গত ৬ অক্টোবর মধ্য বাড্ডায় স্ত্রী সোমা আক্তারকে গলা কেটে হত্যার পর আত্মহত্যার চেষ্টা করে তার স্বামী মনির হোসেন। তাকে আটক করে কারাগারে নেওয়া হয়েছে। তাদের একমাত্র সন্তান জান্নাতুল ফেরদৌস মারিয়া (১২) দাদার বাড়ি থাকেনি। উত্তর বাড্ডায় নানি আক্তার বানুর কাছে থাকে সে। মারিয়া জানায়, সে দেখেছে, বাবা তার মাকে খুন করছে। বাবার কথা মনে পড়লেই সে ভয়ে কেঁপে ওঠে। মারিয়া বলে, ‘আব্বু জেল থেকে বের হয়ে এলে আমাকেও মেরে ফেলবে।’ মারিয়ার নানি আক্তার বানু বলেন, মারিয়ার দাদা জোর করে মারিয়াকে নিয়ে যেতে চায়। সে যেতে রাজি হয়নি। দাদা বাড়ির কথা শুনলেই সে আঁতকে ওঠে।

মায়ের দেওয়া চকলেট নেয়নি তূর্য :মিরপুর ১০ নম্বরের বাসায় ২০১৪ সালের ১৯ অক্টোবর রাতে খুন হন ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন মাতবর। দুই ছেলেমেয়েকে একটি কক্ষে আটকে রেখে লীনা তার পরকীয়া প্রেমিক তানভীর ও অন্য সহযোগীদের নিয়ে স্বামী গিয়াসকে হত্যা করে। এর পর ডাকাতির নাটক সাজাতে দুই ছেলেমেয়ের হাত-পা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। তাদের সেই দুই শিশুসন্তান হুমায়রা ইয়াসমিন ইশিকা ও আল ফুয়াদ হোসেন তূর্য এখন মিরপুর ১০ নম্বরের ১৫ নম্বর লেনে চাচা মাসুদুর রহমান মাতবরের কাছে রয়েছে। ১০ ডিসেম্বর সেই বাসায় কথা হয় ইশিকা ও তূর্যের সঙ্গে। চাচা-চাচিই এখন তাদের বাবা-মা বলে জানায় তারা। পাশাপাশি বাবা হত্যার বিচার দাবি করে। তূর্য স্থানীয় একটি স্কুলের প্রথম শ্রেণির ছাত্র। সে জানায়, তার মা লীনা জামিনে বের হয়ে এসে তার স্কুলে গিয়ে তাকে চকলেট দিয়ে জোর করে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। সে চকলেট ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। যেতে রাজি হয়নি।

সাম্যর সামনেই খুন হয় মা লিজা :স্বামী এসএম সাজ্জাদ ৩ ডিসেম্বর বাসার মধ্যে স্ত্রী লুদমিলা আহম্মেদ লিজাকে হত্যা করে। এ সময় তাদের ছয় বছরের ছেলে শেহেজাদ সাদিদ সাম্য সামনেই ছিল। সাম্য বলে, ‘আমার আম্মু ঘর ঝাড়ূ দিচ্ছিল। এ সময় লাঠি দিয়ে আব্বু আম্মুর মাথায় বাড়ি মারে।’ লিজার বড় ছেলে এসএম সাজিদ সাওম জানায়, তারা দুই ভাই কমলাপুরে নানা ইকবালের কাছেই থাকতে চায়। তাদের ফুফু ও দাদা-দাদি তাদের নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে জানায় সাওম। নিহত লিজা উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর নেত্রী ছিলেন। স্ত্রী হত্যায় সাজ্জাদ কারাগারে।

আরও দুটি ঘটনা :গত ৬ জুন কল্যাণপুরে স্ত্রী শাম্মী আক্তার খানমকে হত্যার অভিযোগে তার স্বামী আলমগীর হোসেন টিটু কারাগারে। এরপর তাদের দুই ছেলে পাঁচ বছরের আরিয়ান ও দেড় বছরের এ্যারোনের ঠাঁই হয়েছে ময়মনসিংহে নানি বাড়ি। গত বছরের ২ মে চকবাজারে স্বামী জামিল আহমেদকে হত্যার অভিযোগে স্ত্রী মৌসুমী কারাগারে রয়েছে। তাদের একমাত্র ছেলে আহমেদ (৬) ভারতে দাদা-দাদির কাছে বেড়ে উঠছে। সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত