প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সম্ভাবনাময় নতুন বছর
প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ

ধীরাজ কুমার নাথ : অনেক ঘটন-অঘটন, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা ও আনন্দ-বেদনার স্মৃতি নিয়ে রক্তিম সূর্যাস্তের মধ্য দিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের জীবনের আরেকটি বছর ২০১৭। নতুন বছর, ২০১৮ প্রভাতের সূর্য উদিত হ্চ্ছে সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে, প্রগতির ধারা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতির মাঝে। তবে ২০১৭ সালের বেশকিছু সাফল্য ও সমস্যার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে নতুন বছরে এতে কোনো সন্দেহ নেই। নতুন কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনাবলী যে দেশবাসীকে উত্কণ্ঠিত করবে না এমন কথা বলা যায় না। ২০১৭ শেষ হচ্ছে অনেক সাফল্য আর সমস্যার ধারাবাহিকতাকে লালন করে। সবার উপরে যে সমস্যা দেশকে বিব্রত করেছে তা হচ্ছে- রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ যে সমস্যা বহাল থাকবে ২০১৮ সালে। এছাড়া বড় ধরনের বিপর্যয় হচ্ছে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় দৃশ্যমান দুর্বলতা, যা সহসা উত্তরণ হবে বলে মনে হচ্ছে না।

তবে ২০১৭ সালে মাথাপিছু আয় বেড়ে হয়েছে ১৬১০ মার্কিন ডলার, প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে হয়েছে ৭.২ শতাংশ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে উপনীত হয়েছে ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের হিসাব অনুযায়ী ক্রয়ক্ষমতার সমতার (Purchasing Power Parity) বিচারে বর্তমানে বাংলাদেশ পৃথিবীর ৩৩ তম বৃহত্তম অর্থনীতি এবং বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিসমূহের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম দ্রুত প্রবৃদ্ধির দেশ যা অনেক বিশেষজ্ঞের মতে অবশ্যই প্রশংসনীয়।

এছাড়া কৃষিনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতি পরিবর্তন হয়ে দ্রুত শিল্পনির্ভর অর্থনীতি এবং নগরমুখী অভিবাসন বাড়ছে অনেক দ্রুত গতিতে। জিডিপিতে শিল্পখাতের অবদান বাড়ছে। এছাড়া কর্ম সংস্থান সৃষ্টিতে এর প্রতিফলন ঘটেছে এবং গত আট বছরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে ১ কোটি ৩৬ লক্ষের অধিক। সবচেয়ে অধিক সুযোগ হয়েছে মহিলাদের কর্মসংস্থানে সৃষ্টি এবং বেড়েছে তাদের ক্ষমতায়ন। রপ্তানি আয় বেড়ে হয়েছে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার যা অভূতপূর্ব এবং অনেকের মতে আশ্চর্যজনক। সংক্ষেপে বলা যায়, অর্থনৈতিক অঙ্গনে অনেক অর্জন বাংলাদেশের সম্ভাবনার দুয়ারকে করেছে সম্প্রসারিত। ২০১৮-২০১৯ এর বাজেট হবে অনেক বড়,যা অর্থমন্ত্রী ইতোমধ্যে আভাস দিয়েছেন। ২০১৭ সালে প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছে,কর্মসংস্থান বেড়েছে তেমনিভাবে গণচীন,জাপানের সঙ্গে অর্থনীতির দুয়ার খুলে দিয়েছে। গণচীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং বাংলাদেশে আগমন এবং ২৭ টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত ১ হাজার ৩৬০ কোটি ডলারের চুক্তি, জাপানের সঙ্গে চুক্তি, প্রথম মেট্রোরেল ও বিআরটি -এর সূচনাসহ আরো অনেক সাফল্য জনগণের মনে শুধু আস্থার সঞ্চার করেছে তাই নয়, রাজনৈতিক অঙ্গনকে উত্তপ্ত হতে দেয়নি এবং দেশের সর্বত্র অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিকভাবেই বহমান ছিল। অনেক ঘটনার পরও দেশবাসীর মধ্যে ছিল একটা অস্থিরতার ভাব। কারণ মৌলবাদীচক্র মনে হয় তাদের হাতকে করেছে প্রসারিত। সাম্প্রদায়িকতা এমনভাবে বেড়েছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মনে হতাশা এবং নিরাপত্তার দারুণ অভাব সৃষ্টি হয়েছে।

সবকিছু বিবেচনা করলে কিছুতেই মনে হচ্ছে না ২০১৮ সাল খুব মসৃণ এবং শান্তিপূর্ণভাবে নিরিবিলি কাটবে। উন্নত ও অনুন্নত দেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে অধিক অস্থিরতা বাড়বে। ডোনাল্ড ট্রাম্প সাহেব বিশ্বকে শান্তিতে থাকতে দিবেন বলে মনে হয় না। তিনি নিজের দেশেই সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দিবেন তাই নয়, বিশ্বে সাম্প্রদায়িক মানসিক যন্ত্রণাকে ছড়িয়ে দিতে পারেন বলে অনেকেই মনে করেন। গণচীন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারত ও জার্মানি, এই পাঁচটি দেশ বিশ্ব বাণিজ্যে বিভিন্নভাবে তাদের প্রভাব ও আধিপত্য বহাল রাখবে। তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশ তাদের অগ্রগতিতে অবদান রাখবে কারণ তারা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে তাদের শিল্প ও বাণিজ্যে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করবে এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে ব্যাপকভাবে। বাংলাদেশ তথ্য-প্রযুক্তিতে অনেক বেশি অগ্রসর হবে এতে কোনো দ্বিধা নেই।

কিন্তু বড় বিষয়, ২০১৮ সাল হচ্ছে নির্বাচনের বছর। আগামী ডিসেম্বর মাসেই হতে পারে নির্বাচন। এবারের নির্বাচন হবে প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। অর্থনীতি স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারবে কিনা তাও নির্ভর করে নির্বাচনকে কিভাবে পরিচালিত হয়, তার উপর। নির্বাচনকালে প্রশাসনের দক্ষতা এবং নিরপেক্ষতা কতটা বজায় থাকবে। প্রশাসন যন্ত্রের মানুষগুলো কি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে? তাদের ইচ্ছা থাকলেও তাদের পক্ষে কি পরিচ্ছন্ন নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব? অনেকে মনে করে সম্ভব, কারণ রংপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন তাই প্রমাণ করেছে।

সুষ্ঠু নির্বাচন সবারই কাম্য। কিন্তু ভালো চাইলেই সব ভালোভাবে চলবে তাতো হয় না। রাজনাৈতিক অঙ্গন থাকবে এবার অনেক বেশি সরগরম,এতে কোনো সন্দেহ নেই। ২০১৪ সালের অভিজ্ঞতা ২০১৮ সালকে তাড়িয়ে বেড়াবে এমন ভাবনা অনেকের। নির্বাচন কমিশন তখনই তাদের ভালো কর্মকাণ্ড প্রদর্শন করতে পারবে যখন প্রশাসন কমিশনকে সহযোগিতা করবে।

সাধারণ প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকবে এ হচ্ছে সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা। তা সব সময় হয় না। সত্যি কথা বলতে কি এবার যখন পদোন্নতির প্রবল বন্যা বয়ে গেল, তখন দেখা যায়, তারাই পদোন্নতির মহাদৌড়ে এগিয়ে ছিল যারা সরকারের সমর্থক। অবশ্য এটা হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ সব সরকারের সময়ই তো এটা হয়ে আসছে। অতিরিক্ত সচিবের অনুমোদিত পদ আছে ১১১ টি পদোন্নতি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫০-এর অধিক। তেমনিভাবে যুগ্ম সচিব এবং উপসচিবের সংখ্যা বেড়েছে। প্রশাসন মাথাভারী হয়েছে রাজনৈতিক স্বার্থে। অনেক দুর্বল কর্মকর্তা যারা উপসচিব হবার যোগ্যতা নেই তারা হয়েছে অতিরিক্ত সচিব। এখন বসে আছে, না পাচ্ছে চেয়ার টেবিল, না আছে কোনো কাজ। এমন দুর্বল প্রশাসন কি সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জসমূহ বুদ্ধিমত্তা বা কর্মদক্ষতা দিয়ে মোকাবিলা করতে পারবে? অনেকের ধারণা, অসম্ভব।

বিভিন্ন দলের মধ্যে এখনই মেরুকরণ শুরু হয়েছে তেমনিভাবে মাঠ পর্যায়ে তত্পরতা উঠবে তুঙ্গে। রাজনীতির মাঠ ২০১৮ সালে নীরব থাকবে না। নতুন নির্বাচন কমিশন, ভোটার তালিকা আধুনিকায়ন করণ, নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণ এমন সব বিষয় নিয়ে শুরু হতে পারে নানান জটিলতা, এতে কোনো সন্দেহ নেই। রাজনৈতিক দল এসব ক্ষেত্রে সমঝোতায় আসতে হলে সাহায্য লাগবে সাধারণ প্রশাসনের, এখানে হবে প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।

সরকারের নিজস্ব বাজেটের আকার বৃদ্ধি হবে উল্লেখযোগ্যভাবে যা দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ ও ক্ষমতায়নের নিদর্শন হিসাবে অগ্রযাত্রার পথকে সুগম করবে। তবে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দর্শনীয় বা উল্লেখযোগ্য অর্জন সুনিশ্চিত করতে না পারলে অনেক বিনিয়োগ ব্যর্থ হবে। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে এক প্রকার স্থবিরতা দৃশ্যমান হচ্ছে, শেয়ার মার্কেটে উত্সাহ হারিয়ে ফেলেছে অনেকে বিভিন্ন সময় বিপর্যয়ের কারণে এবং ব্যাকিং খাতের ক্রমাগত দুরবস্থা এবং দক্ষজনশক্তি সৃষ্টিতে দুর্বলতা উন্নয়নের গতিধারাকে ব্যাহত করতে পারে। সাইবার ক্রাইম ভবিষ্যতে বড় হয়ে দেখা দিতে পারে যে ব্যাপারে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। এ সবই হচ্ছে প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।

প্রশাসনের জন্য ২০১৮ সালের নির্বাচন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ এতে কোনো সন্দেহ নেই কিন্তু আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে দেশকে মধ্য আয়ের দেশ হিসাবে উন্নীত করার কর্মকাণ্ড বা প্রবৃদ্ধির হারকে বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রশাসনকে অবদান রাখতে হবে। সেজন্য চাই দূরদর্শী ও জবাবদিহিমূলক দক্ষ প্রশাসন।

২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের জাতিসংঘ ঘোষিত ১৭ টি লক্ষ্য ও ১৬৯ টি টারগেট অর্জন করতে হলে দারিদ্র্য বিমোচনসহ, শিক্ষাখাতে অনেক বেশি অর্জন করতে হবে। শিক্ষাখাতে মানের অবক্ষয় এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের মহোত্সব চলছে, কিভাবে আমরা আশা করব টেকসই শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্য অর্জিত হবে?

২০৪১ সালে বাংলাদেশ উন্নত দেশ হবে,এমন রূপকল্প প্রণয়ন করা হচ্ছে যার অর্থ হবে মাথাপিছু আয় হতে হবে কমপক্ষে ১২ হাজার ডলার। এছাড়া সামাজিক অঙ্গনে আসতে হবে অনেক পরিবর্তন। দুর্নীতিকে বিদায় দিতে হবে , শিষ্টাচার হতে হবে জীবন পদ্ধতি। এইসব কাজে প্রশাসনকে উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে। সবই হচ্ছে প্রশাসনের জন্য নিত্য নতুন চ্যালেঞ্জ। প্রশাসনে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের বেতন বেড়েছে, সুবিধা বেড়েছে, মান বেড়েছে, কিন্তু চালেঞ্জ মোকাবিলার মতো সক্ষমতা বেড়েছে কি? জনগণের কাছে এই হচ্ছে বড় প্রশ্ন।

দেশবাসীর প্রত্যাশা- নতুন বছর ২০১৮ বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি বয়ে আনুক, সোনালি দিনের সন্ধানে সকল রূপকল্প বাস্তবায়ন হোক সঠিকভাবে। অতীতের সকল ব্যর্থতার গ্লানিকে পিছনে ফেলে সোনালি ভবিষ্যতের দিকে সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে অগ্রসর হবে, এহোক সকলের দৃঢ় অঙ্গীকার। সকলের প্রত্যাশা—গণতন্ত্রের পথে দেশের রাজনীতি হবে পরিচালিত, অর্থনীতি হবে অগ্রসরমান এবং সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার ও তার প্রশাসন হবে সক্ষম ও সফল।

n লেখক :সাবেক সচিব। ইত্তেফাক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত