প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গুম থেকে যারা ফিরছেন তারা মুখ খুলছেন না
বছরজুড়ে গুম আতঙ্ক

মামুন : বছরজুড়েই আলোচনায় ছিল গুম বা নিখোঁজের ঘটনা। এ নিয়ে দেশবাসীর উদ্বেগ-উৎকন্ঠার মধ্যে কেটেছে সারা বছর। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাবে এ বছরের জানুয়ারি থেকে ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত গুম বা নিখোঁজের শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ৭৬ জন। তাদের মধ্যে পরে ৩৫ জন বিভিন্ন সময় ফিরে আসেন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেফতার দেখায়। উদ্ধার হয় ৭ জনের লাশ। এখনো নিখোঁজ ৩৪ জন। যে ৩৫ জনের হদিস পাওয়া গেছে তাদের মধ্যে আবার কমপক্ষে ১৬ জনকে পরে আদালতে উপস্থাপন করেছে পুলিশ বা র‌্যাব। তাদের পক্ষ থেকে আদালতকে বলা হয়েছে, এক দিন আগে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। সর্বশেষ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোবাশ্বার হাসান সিজার এবং সাংবাদিক উৎপলকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে রাতের আঁধারে। আর সর্বশেষ নিখোঁজ হন ব্র্যাক ব্যাংকের শ্যামলী শাখার সিনিয়র অফিসার নাইমুল ইসলাম সৈকত।

গত ২৬ ডিসেম্বর মঙ্গলবার সকালে শ্যামলী থেকে গুলশানে যাওয়ার জন্য বের হওয়ার পর থেকে তার আর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানানো হয়েছে জিডিতে। ফিরে আসার পর মামলা দায়ের করা হয়েছে কবি ও প্রাবন্ধিক ফরহাদ মজহার ও তার স্ত্রী ফরিদা আক্তারের বিরুদ্ধে। গত ২৮ ডিসেম্বর মিথ্যা অপহরণের মামলা করার অভিযোগ এনে পুলিশ ঢাকার আদালতে এ মামলা করেছে। এ বছর যারা নিখোঁজ হয়েছেন তাদের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন ভিকটিম হয়েছে। নিখোঁজ যারা হয়েছে তার মধ্যে একটা বড় অংশ হচ্ছে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। এছাড়া ব্যবসায়ী, শিক্ষক, ছাত্র, সাংবাদিক, প্রকাশক, ক‚টনীতিক, ব্যবসায়ী ও ব্যাংকারসহ পেশাজীবীর নাম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের অনেক সফলতা রয়েছে। নিখোঁজ বা গুমের ঘটনায় এ সফলতাকে অনেকটাই ¤øান করে দিয়েছে। নিখোঁজ বা গুমের ঘটনাগুলো তদন্ত করে প্রকাশ করা এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রতিটি ঘটনায় স্বজনেরা নিখোঁজ বা গুমের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা অভিন্ন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবশ্য অজ্ঞাত অপহরণকারীরা তুলে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছে পরিবারগুলো। আত্মীয়স্বজনেরা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন বা অপহরণের মামলা করেছেন। তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সবগুলো শাখায় ধরনা দিয়েছেন। গিয়েছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও অন্যান্য মানবাধিকার সংগঠনগুলোয়। সংবাদ সম্মেলন করে সরকারের কাছে স্বজনকে ফিরে পাওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। গুম হওয়ার পরপর পুলিশ-র‌্যাবের পক্ষ থেকে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও চিঠি দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে। এক সময় সব পক্ষের উদ্যোগ থিতিয়ে গেছে। যারা ফিরে আসেননি তাদের পরিবার এখনও অপেক্ষা করছেন স্বজনকে ফিরে পাবার আশায়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, যারা নিখোঁজ রয়েছেন, তারা নানা কারণে স্বেচ্ছায় আত্মগোপন করেছেন। অবশ্য বছরের শেষার্ধে নিখোঁজদের ফিরে আসার পর তিনি বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার কারণেই তাদের ফিরে পাওয়া সম্ভব হয়েছে। বছর শেষে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ এবং পরে ফিরে আসা সাংবাদিক উৎপল দাস ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোবাশ্বার হাসানের পরিবার বলেছেন, মুক্তিপণের জন্য তাদের অপহরণ করা হয়েছিল। ধনাঢ্য ব্যবসায়ী অনিরুদ্ধ রায় বলেছেন, তার ব্যবসায়িক অংশীদার তাকে অপহরণ করিয়েছেন। যদিও আগে পরিবারগুলো মুক্তিপণের বিষয়ে গণমাধ্যমকে কিছু বলেনি। যারা ফিরে আসছেন তারা প্রায় একই ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন এবং তাদের বক্তব্যে এক ধরনের ভীতির ছাপ আছে। বডি ল্যাংগুয়েজ এক ধরনের বার্তা দেয় যে, এখনো তারা মুক্তভাবে কথা বলতে পারছেন না। নিখোঁজের ব্যাপারে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেছেন, বাংলাদেশে গত এক দশকে কমপক্ষে সাড়ে পাঁচশ মানুষ গুম-অপহরণের শিকার হয়েছেন।

নিখোঁজের ক্ষেত্রে আগে অধিকাংশ সময় পরিচয় দেয়া হতো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তরফ থেকে এসেছি। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাচ্ছি। পরে তাকে ডিনাই করা হতো এবং বাসা থেকে, অফিস থেকে, পরিচিত জায়গা থেকে, কোনো ক্ষেত্রে রাস্তা থেকে অপহরণ করা হতো। সা¤প্রতিককালে আমরা লক্ষ করছি যে, অপহরণ প্রক্রিয়ায় একটা পরিবর্তন এসেছে। সেটা হচ্ছে, অতি সঙ্গোপনে এ কাজটি করা হচ্ছে যাতে কোনো সাক্ষী না থাকে, যাতে কোনো মানুষ সাক্ষ্য দিতে না পারে। নিখোঁজের নতুন এই কৌশল সম্পর্কে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্সের ব্যাপারে জাতিসংঘের যে নিয়ম-কানুন আছে, কনভেনশনগুলো আছে সেখানে ধারা-উপধারায় যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করা আছে সেই সংজ্ঞার মধ্যে যাতে এ বিষয়গুলো না পড়ে এ ধরনের একটা প্রবণতা লক্ষ করছি কৌশল হিসেবে গ্রহণ করার। সাবেক আইজিপি নূরুল হুদা বলেছেন, বর্তমান সরকারের অনেক সফলতা রয়েছে। কিন্তু গুম বা নিখোঁজের ঘটনা এই সফলতাকে অনেকটাই ¤øান করেছে। কারা এসব ঘটনায় জড়িত তা বের করার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।

পুলিশ সদর দফতরের এআইজি মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিকেশন্স সহেলী ফেরদৌস দৈনিক বলেন, নিখোঁজ বা গুমের ঘটনা কারো জন্য কাম্য নয়। যারা এ ঘটনার শিকার হয়েছেন তাদের পরিবার যেমন উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছে, তেমনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও গুরুত্ব দিয়ে বিষয়গুলো তদন্ত করছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে আমরা কাজ করছি বলে তিনি জানান। সাবেক তত্ত¡বধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা টিআইবির চেয়ারপারসন সুলতানা কামাল বলেন, আমরা দেখছি মানুষ প্রতিদিন গুম কিংবা বিচারবহির্ভূত আচরণের শঙ্কার মধ্যে বাস করছে। এ পর্যন্ত ৫৪টি গুমের ঘটনা ঘটেছে, তাদের কেউ কেউ ফিরে এসেছেন, কেউ কেউ ফিরে আসেননি। যারা ফিরে এসেছেন তারা কিভাবে গুম হলেন, কিভাবে ফিরে এলেন তারা তা বলার সাহস পাচ্ছেন না, এমনি আতঙ্কের মধ্যে বাস করতে হচ্ছে।

সূত্র জানায়, গত পাঁচ মাসে নিখোঁজের মধ্যে যারা ফিরে এসেছেন তারা হলেনÑ ব্যাংক এশিয়ার এভিপি শামীম আহমেদ, বাংলাদেশ জনতা পার্টির (বিজেপি) সভাপতি মিঠুন চৌধুরী ও দলটির কেন্দ্রীয় নেতা অসিত ঘোষ অসিত, বেলারুশের অনারারি কনস্যুলার অনিরুদ্ধ কুমার রায়, দক্ষিণ বনশ্রীর নকিয়া-সিমেন্সের সাবেক প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান আসাদ, অ্যাভেনটিস-স্যানোফির ফার্মাসিস্ট জামাল রহমান, শাজাহানপুরের ফল ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন, গুলশানের প্রকাশক তানভীর ইয়াসিন করিম, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ড. মুবাশ্বার সিজার ও সাংবাদিক উৎপল দাস। অন্যদিকে ২০১৫ সালের ১০ মার্চ উত্তরার একটি বাসা থেকে নিখোঁজ হন বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ। ৬২ দিন পর ভারতের মেঘালয়ের শিলং থেকে উদ্ধার হন তিনি। ১২ মে তিনি মেঘালয় ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরো সায়েন্সেস হাসপাতাল থেকে তার স্ত্রী হাসিনা খানকে ফোন করেন। মেঘালয়ের গলফ গ্রিন এলাকায় ঘোরাঘুরির সময় সে দেশের পুলিশ তাকে আটক করে। ওই সময় তাকে অপ্রকৃতিস্থ মনে হচ্ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার গণমাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ পরিচয়ে সাক্ষাৎকার দেয়ার পর তানভীর আহমেদ ২০১৬ সালের ১৬ মার্চ রাতে নিখোঁজ হন। ৫ দিন পর তাকে উ™£ান্ত অবস্থায় বিমানবন্দর সড়কে হাঁটতে দেখে পুলিশ বাড়ি পৌঁছে দেয়। একই বছরের ৪ আগস্ট সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী পুরান ঢাকার আদালতপাড়া থেকে নিখোঁজ হন। সাত মাস পর তিনি বাড়ি ফেরেন।

২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল তিনি ঢাকা থেকে নিখোঁজ হন বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী। এখনও ফেরেননি তিনি। ২০১২ সালের ৩ এপ্রিল রাজধানীর উত্তরা থেকে সিলেট ছাত্রদল নেতা ইফতেখার আহমেদ ও জুনেদ আহমেদকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে তেজগাঁও থানার ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলামসহ ছয় জনকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। একই দিন রাজধানীর শাহীনবাগের বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় আরো দুইজনকে। গত ৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বিদেশ থেকে আসা মেয়েকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানাতে ধানমন্ডির বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান। তারও কোনো খোঁজ মিলছে না আজ পর্যন্ত। ইনকিলাব

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত