প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ইসির জন্য চূড়ান্ত পরীক্ষার বছর ২০১৮

মাইকেল : ২০১৮ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উপ-নির্বাচনসহ অন্তত পাঁচটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আয়োজনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সামনে। তবে ইসির জন্য এর চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো- সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন আয়োজন করা।

সুষ্ঠু ও সুচারুভাবে এসব নির্বাচন সম্পন্ন করা ইসির জন্য কঠিন পরীক্ষা বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ইসির জন্য আগামী বছরটি চূড়ান্ত পরীক্ষার বছর। এ বছর তাদের সফলতা বা ব্যর্থতার ওপর নির্ভর করছে কমিশনের পাস-ফেল। অবশ্য নির্বাচন কমিশন বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে না নিয়ে ‘বড় কাজ’ হিসেবে দেখছে। তারা বলছে, নতুন বছরে তাদের কিছু বড় কাজ রয়েছে। সেই কাজের প্রস্তুতি নিয়েই তারা এগুচ্ছে।

কেএম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন প্রায় একবছর পার করেছে। এ সময় একাদশ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রোডম্যাপ অনুয়ায়ী চলতে শুরু করেছে ইসি। কমিশন বিদায়ী বছরে বড় দুটি সিটি করপোরেশন, জাতীয় সংসদের একাধিক আসনের উপ- নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছু নির্বাচন করেছে। নানা জটিলতায় দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বেশকিছু নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নিয়েছে। অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছে সংলাপের মতো বড় একটি কর্মযজ্ঞ। এর পাশাপাশি অব্যাহত রেখেছে রুটিন ওয়ার্কগুলো। তবে কমিশন তাদের শুরুটা যেভাবে করতে পেরেছে, নতুন বছরে এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারবে কিনা, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের বৈতরণী কতটা সফলভাবে পার করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে।

প্রসঙ্গত, বর্তমান হুদা কমিশনের মতো বিদায়ী রকিব কমিশনের শুরুটাও বেশ ভালোই ছিল। ওই কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বড় নির্বাচন করেছিল রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন। এরপর কমিশন খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল ও গাজীপুর সিটির নির্বাচনও ভালোভাবেই সম্পন্ন করেছিল। কিন্তু দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি করতে গিয়ে তারা বড় ধরনের ধাক্কা খায়। ওই নির্বাচন বিএনপির মতো বড় দল ও তাদের মিত্ররা বর্জন করায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বিএনপির বর্জনে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫২টি আসনে প্রার্থিরা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঘটে ব্যাপক সহিংস ঘটনা। ভোট প্রদানের হারও ছিল খুবই কম।দশম সংসদ নির্বাচনের পথ ধরে রকিব কমিশন যে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে, তা থেকে আর বেরিয়ে আসতে পারেনি। এরপর অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, ইউনিয়ন ও পৌরসভাসহ সব ধরনের নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম, সহিংসতা ও প্রশাসনের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে। ঘটে প্রাণহানির ঘটনাও। শেষ পর্যন্ত রকিব কমিশনকে ‘ব্যর্থতার’ দায় নিয়ে বিদায় নিতে হয়। অবশ্য ওই কমিশনের মেয়াদের একেবারে শেষ দিকে অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনটি মোটামুটি ভালোই ছিল।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, রকিব কমিশন তার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছিল, বর্তমান কমিশন এখনও সে ধরনের চ্যালেঞ্জের জায়গায় এসে পৌঁছেনি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বর্তমান কমিশনের শুরুটা ভালো হলেও তাদের আসল পরীক্ষা এখনও সামনে রয়েছে। নতুন বছরের ডিসেম্বরে (২০১৮) যে একাদশ সংসদ নির্বাচন হবে সেটাই হবে এই ইসির সক্ষমতা প্রমাণের চূড়ান্ত পরীক্ষা। ওই পরীক্ষায় পাস-ফেলের ওপর নির্ভর করছে কমিশনের সফলতা। আর আগামী বছরই ইসিকে এই পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে।

বর্তমান কমিশন এ বছরের (২০১৭) ১৬ জুলাই ঘোষণা করে নির্বাচনি রোডম্যাপ। ৩১ জুলাই অংশীজনের সঙ্গে সংলাপের মধ্যদিয়ে তা বাস্তবায়ন শুরু করে। রোডম্যাপ অনুযায়ী এ কমিশন ইতোমধ্যে সংলাপ শেষ করেছে। নতুন দলের নিবন্ধনের জন্য আহ্বান করেছে আবেদনপত্র। পুরনো দলগুলো নিবন্ধনের শর্ত মানছে কিনা সেটাও খতিয়ে দেখছে একই সঙ্গে। তবে রোডম্যাপ অনুযায়ী ডিসেম্বরের মধ্যে সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাসের গেজেট প্রকাশের কথা থাকলেও সেকাজে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। সীমানা আইন সংশোধন করতে গিয়ে জটিলতা দেখা দেওয়ায় এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে বলে কমিশন সূত্রে জানা গেছে। অবশ্য সীমানা পুনর্বিন্যাসের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসকদের চিঠি দিয়ে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের তথ্য নিতে শুরু করেছে কমিশন ।

ইসির সূত্র মতে, রোডম্যাপ অনুযায়ী ভোটার তালিকা হালনাগাদের কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। জানুয়ারির ১ তারিখে প্রকাশিত হবে খসড়া ভোটার তালিকা। যাচাই-বাছাই শেষে ৩১ জানুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে। রোডম্যাপ অনুযায়ী আগামী জুনের মধ্যে ৩০০ আসনের ভোটার তালিকা মুদ্রণ করা হবে।

এছাড়া, এ সময়ের মধ্যে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও)এর প্রয়োজনীয় সংশোধনীসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় আইন ও বিধি সংস্কার, নতুন দল নিবন্ধনসহ নতুন-পুরনো মিলিয়ে মার্চের মধ্যে নিবন্ধন তালিকা প্রকাশ করা হবে। জুলাই মাসের মধ্যে ভোট কেন্দ্র চূড়ান্তকরণ, নির্বাচনি কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, জাতীয় নির্বাচনের কেন্দ্র চূড়ান্তকরণ, ভোটগ্রহণের সরঞ্জাম সংগ্রহসহ জাতীয় নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘বর্তমান কমিশন সফল হয়েছে এটা ঠিক। তবে সফলতা কেবল নির্বাচন কমিশনের ওপর নির্ভর করে না। তাদের আন্তরিকতা, নিষ্ঠা, সততা, নিরপেক্ষতা ও সক্ষমতা দেখানো সত্ত্বেও বহুলাংশে নির্ভর করবে সরকার তথা প্রশাসনের ওপর। তারা (সরকার) যদি সদাচরণ করে তাহলেই সম্ভব হবে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন।’

তিনি বলেন,‘একটা কথা মনে রাখতে হবে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্যাটার্ন এক নয়। জাতীয় নির্বাচনে সরকার বদলের প্রশ্ন থাকে।’

রংপুরের নির্বাচনের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘কমিশন রংপুরে সর্বশক্তি নিযুক্ত করতে পেরেছিল। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনে তা সম্ভব নয়। কারণ, ওই সময় একই সঙ্গে সারাদেশে ভোট হবে।’

বিগত কমিশনের প্রসঙ্গ টেনে এই নির্বাচন বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘সরকার সদাচরণ করার কারণে রংপুরের নির্বাচনটা সুন্দর হয়েছে। আগের কমিশনও ২০১৩ সালে পাঁচটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন করেছিল। তৎকালীন সরকার প্রভাবিত করার চেষ্টা করেনি বলেই সেগুলো সুষ্ঠু হয়েছিল। কিন্তু ৫ জানুয়ারি দেখলাম তার সম্পূর্ণ বিপরীত। এজন্য জাতীয় নির্বাচন কী রকম হবে, স্থানীয় সরকারের নির্বাচন তার কোনও আভাস দেয় না।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ড. তারেক শামসুর রেহমান বলেন, ‘এটা নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই যে, নতুন বছর হবে হুদা কমিশনের জন্য চ্যালেঞ্জের বছর। কারণ, এই বছরই তাদেরকে জাতীয় নির্বাচন করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমান কমিশন রংপুর ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনটি সুষ্ঠু ও সুন্দর করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, তাদের অধীনে সব নির্বাচন সুন্দর হবে। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচন। কারণ, সেখানে রয়েছে সরকার বদলের প্রশ্ন। তবে আমি আশাবাদী মানুষ। আশা করবো, কমিশন তাদের সর্বোচ্চ শক্তি কাজে লাগিয়ে দেশ ও জাতির স্বার্থে সব দলকে নিয়ে একটি সুন্দর জাতীয় নির্বাচন উপহার দেবে। জাতীয় নির্বাচনই সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে করতে পারলে সবাই তাকে বাহবা দেবে। আমরাও বলবো- কমিশন সফল হয়েছে। চূড়ান্ত পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেয়ে পাস করেছে।’

সাবেক নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ বলেন, ‘বর্তমান কমিশনের মতো আমাদের শুরুটাও ভালো ছিল। দশম সংসদ নির্বাচনের আগে আমরা যতগুলো নির্বাচন করেছি, তা নিয়ে কোনও প্রশ্ন কিন্তু ওঠেনি। কিন্তু সংসদ নির্বাচনে সব দল অংশগ্রহণ না করায় মাঠ ফাঁকা ছিল এবং একটি অংশের নির্বাচন প্রতিহত করার প্রচেষ্টার কারণে আমাদের সময়ে জাতীয় নির্বাচনটা সুন্দর হয়নি। তবে এবার দৃশ্যত মনে হচ্ছে, সব দল নির্বাচনে আসবে।’

সাবেক এই কমিশনার বলেন, ‘বর্তমান কমিশনের একটাই চ্যালেঞ্জ, তা হলো- সুন্দরভাবে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। এই কমিশনও সুন্দরভাবে শুরু করেছে। আমাদের আশা থাকবে, জাতীয় নির্বাচনও সুন্দর হবে। ভালো নির্বাচনের আশা ছাড়া বিকল্প কোনও চিন্তার সুযোগও নেই।’

নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা কোনোটাকেই চ্যালেঞ্জ বলতে চাই না। নতুন বছরের প্রথম প্রান্তে ভোটার তালিকা ও শেষপ্রান্তে জাতীয় নির্বাচনসহ আমাদের হাতে কিছু বড় বড় কাজ রয়েছে। আমরা সেগুলো করতে চাই।’

তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র একটি দায়িত্ব দিয়ে আমাদের নিযুক্ত করেছে। এই কাজটিই আমাদের করতে হবে। আমাদের যেটুকু সাধ্য ও সামর্থ্য রয়েছে, তা দিয়ে কাজগুলো সুচারুরূপে করার প্রচেষ্টা অব্যহত রাখবো।’

রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের জন্য আমাদের মতো করে যতটুকু প্রস্তুতি নেওয়া দরকার, তা সব নির্বাচনের জন্য নিচ্ছি। তারপরও এসব কাজ করতে গিয়ে অনেক বাধা বিপত্তি থাকে। কখন কোন বিপত্তি আসবে সেটা আমরা জানি না। তবে, যদি এ ধরনের কোনও বাধা আসে, তা অবশ্যই আমাদের মেধা, মনন ও সামর্থ্য দিয়ে ওভারকাম করার চেষ্টা করবো।’

নির্বাচনে সব দল অংশ নেবে কিনা তা ইসির বিষয় নয় বলে মন্তব্য করেন এই কমিশনার। তিনি বলেন, ‘সব দল নির্বাচনে আসবে কিনা সেটা আগাম বলা সম্ভব নয়। কারণ, কাউকে জোর করে নির্বাচনে বাধ্য করার এখতিয়ার ইসির নেই। দলগুলো যদি ইচ্ছে পোষণ করে তাহলেই তারা নির্বাচনে আসবে। আর ইচ্ছে না করলে শত চেষ্টা করেও আমরা তাদের নির্বাচনে আনতে পারবো না। এটা ঠিক অতীতের কোনও নির্বাচনেই সব দল অংশ নেয়নি। কাজেই নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণের আশা করলে, সেটা ভুল হবে। আমরা চাইবো যেন অধিকাংশ দল নির্বাচনে আসে।’

সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ৯০ দিনের মধ্যে দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির আগের ৯০ দিনের মধ্যে একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ হিসেবে ২০১৮ সালের ৩১ অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির মধ্যে একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের শেষভাগে নির্বাচন করতে চায় বলে জানা গেছে। দলটি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে গিয়ে তাদের এই ইচ্ছের কথা জানিয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত