প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বদলগাছীতে ৪৬ বছরেও সংরক্ষণ হয়নি মুক্তিযোদ্ধাদের গণকবর

আশরাফুল নয়ন,নওগাঁ : নওগাঁর বদলগাছীতে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর হাতে নিহত শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের গণকবর ৪৬ বছর ধরে অরক্ষিত। সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে ভূমিক্ষয় ও ভূমিধ্বসের কারণে অরক্ষিত গণকবরটি নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে।

গণকবরে শায়িত শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা বদলগাছী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদে থাকলেও শহীদদের গণকবর হেফাজত করার কেউ নেই। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন প্রকাশ করেছে এলাকাবাসী।

মুক্তিযুদ্ধ কালীন সময়ে প্রত্যক্ষদর্শী উপজেলার ডাঙ্গিসারা গ্রামের আসতুর আলী, লুৎফর রহমান, আব্দুস সামাদ ও ওসমান আলী জানান, ঐ দিন দুপুরের পর একজন ব্যাক্তি ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত অবস্থায় নদী পার হয়ে ডাঙ্গিসারা গ্রামে এসে তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিয়ে গ্রামবাসীর সাহায্য চায়।

আহত ঐ মুক্তিযোদ্ধা বলেন, তারা ছিলেন মোট ৯ জন মুক্তিযোদ্ধা সকলের বাড়ী নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলায়। বেঁচে যাওয়া ঐ মুক্তিযোদ্ধা আরো জানায় ৯ জন মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে তাঁরা ৩ জন মুক্তিযোদ্ধা প্রাণে বেঁচে যায়। কারণ তাঁরা ৩ জন ছিল ভারতে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা।

আর ঐ ৩ জন প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে আরো ৬ জনকে সঙ্গে নিয়ে বদলগাছীর উপর দিয়ে ভারতে যাওয়ার পথে ঐদিন সকালে বদলগাছীর বালুভরা ইউপির মির্জাপুর মোড়ে তাঁদের মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে আটক করে কতিপয় রাজাকারেরা।

আটকের পর পাক-হানাদার বাহিনীর নিকট তাঁদেরকে হস্তান্তর করলে নির্মম নির্যাতনের এক পর্যায়ে আধাইপুর ইউপির সেনপাড়া গ্রামের জঙ্গলে শারীবদ্ধ ভাবে তাদের চোখ বেঁধে ৯ জন মুক্তিযোদ্ধাকে গুলি করে।

প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ৩ মুক্তিযোদ্ধা গুলির শব্দ পেয়ে তাঁরা চিৎ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার কৌশল করে প্রাণে বেঁচে যায়। আর বাঁকী ৬জন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। বেঁচে যাওয়া একজন মুক্তিযোদ্ধা হাতের বাঁধন খুলে ঐদিন দুপুরের পর ছোট যমুনা নদী পার হয়ে ডাঙ্গিসারা গ্রামে গিয়ে উঠে।

এসময় সে দেখতে পায় তাঁর আরও একজন সঙ্গী ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় উদ্ধার হয়ে নদীতে এসে পানি খাচ্ছে। বেগতিক অবস্থার মধ্যে স্থানীয় লোকজন ঐ ২ জন আহত মুক্তিযোদ্ধাকে সেবা দিয়ে সুস্থ করে নিজ গ্রামে পাঠিয়ে দেয় । বেঁচে যাওয়া ৩ জন মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে ১ জন মুক্তিযোদ্ধা প্রাণে বেঁচে নিজ থেকেই বাড়ি ফিরে যায় । বাঁকী ৬ জন মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর খবর পেয়ে ছুটে আসে তাঁদের স্বজনরা ডাঙ্গিসারা গ্রামে।

স্বজনরা স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় নিহত ৬ মুক্তিযোদ্ধার ক্ষত-বিক্ষত লাশ উদ্ধার করে এনে ডাঙ্গিসারা গ্রামে ছোট যমুনা নদীর ধারে গণকবর দেয়। যা স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও অরক্ষিত।যে কোন মূহুর্তে নদী গর্ভে বিলিন হয়ে যেতে পারে।

ডাঙ্গিসারা গ্রামের প্রত্যক্ষদর্শী সহ এলাকাবাসী জানান, তাঁরা নিজ হাতে প্রাণে বেঁচে যাওয়া ২ জন মুক্তিযোদ্ধাকে সেবা দিয়েছে এবং যে ৬ জন মারা গিয়েছে তাদের ক্ষত-বিক্ষত লাশ উদ্ধার করে কবরস্থ করেছে। স্বজনরা মান্দা উপজেলা থেকে এসে এখানে মিলাদ মাহাফিলও করেছেন। কিন্তু আজও এই গনকবরটি সংরক্ষনে প্রশাসনের কোন উদ্যোগ নেই। যা খুবই দু:খ জনক।

৬ শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা হলেন জেলার মান্দা উপজেলার ময়নম ইউনিয়নের দূর্গাপুর গ্রামের মৃত করিম সোনারের ছেলে কাদের বক্স, মৃত কাওছার আলী মন্ডলের ছেলে শাকায়েত মন্ডল, মৃত মকা আকন্দের ছেলে ইয়াজ উদ্দীন আকন্দ, মৃত লইম উদ্দীন মন্ডলের ছেলে লুৎফর রহমান মন্ডল, প্রসাদপুর ইউনিয়নের মৃত শশি মন্ডলের ছেলে মোহাম্মদ আলী খোকা, গনেশপুর ইউনিয়নের মৃত মাদার উদ্দীন এর ছেলে রিয়াজ উদ্দীন।

এছাড়া প্রাণে বেঁচে যাওয়া ৩ জন হলেন মান্দা উপজেলার ময়নম ইউনিয়নের দূর্গাপুর গ্রামের মৃত মীর মোল্লার ছেলে নজরুল মোল্লা, মৃত কলিমুদ্দীন মন্ডলের ছেলে নিকবর মন্ডল, মৃত খয়রুল মন্ডলের ছেলে গছির উদ্দীন মন্ডল।

এ বিষয়ে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার জবির উদ্দীন (এফ.এফ) জানান, উপজেলার ৬ টি গণকবরের তালিকা দেওয়া হয়েছে এর মধ্যে ডাঙ্গিসারা গ্রামে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা গণকবরস্থান রয়েছে এবং এ তালিকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দেওয়া আছে। এই গণকবরস্থানটি সংরক্ষণ করা জরুরী বলে এলাকাবাসী দাবী জানিয়েছে।

বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাসুম আলী বেগ বলেন, ডাঙ্গিসাড়া গ্রামের গণকবরটির শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা পাওয়া গিয়েছে যা উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ আসলে উক্ত গণকবরস্থানটি সংস্কার সহ সংরক্ষণ এর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত