প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কোন যৌক্তিকতায় তারা বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালক?

ইকতেদার আহমেদ : বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালকগণ ব্যাংকগুলো প্রতিষ্ঠাকালীন মূলধনের ১০ ভাগ যোগান দিয়েছিলেন। এ সকল বেসরকারি ব্যাংকে বর্তমানে আমানতকারীদের গচ্ছিত আমানতের পরিমাণ মূলধনের কয়েকগুণ অধিক। বেসরকারি ব্যাংকের প্রায় সকল পরিচালকই স্ব স্ব ব্যাংক হতে বা একে অন্যের ব্যাংক হতে পরস্পর যোগসাজসে বিপুল অংকের ঋণ গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে বেসরকারি ব্যাংকসমূহে আমানতকারীদের আমানত অনুপাতে উদ্যোক্তা পরিচালকদের জমাকৃত অর্থের পরিমাণ খুবই নগণ্য, যার পরিমাণ হলো ৯৭.৫ ঃ ২.৫। উদ্যোক্তা পরিচালকরা তাদের ২.৫ জমাকৃত অর্থের বিনিময়ে যে পরিমাণ ঋণ ব্যাংকসমূহ হতে গ্রহণ করেছেন তা ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক আমানতের ১৫%। সে নিরীখে একজন উদ্যোক্তা পরিচালকের ঋণের পরিমাণ তার জমাকৃত অর্থ হতে ৬ গুণ অধিক।

বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে জমাকৃত অর্থের ৯৭.৫ ভাগের মালিক সাধারণ মানুষের অন্তর্ভুক্ত আমানতকারীরা হলেও ব্যাংকের পরিচালনায় তাদের কোনো ভূমিকা নেই। সামগ্রিক আমানতের ২.৫ ভাগের মালিক হয়ে উদ্যোক্তা পরিচালকরা ব্যাংকগুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সকল সিদ্ধান্ত তাদের স্বার্থের অনুকূলে গ্রহণ করছেন। বিশ্বস্ত সূত্রের তথ্যমতে এমন অনেক বিশিষ্ট উদ্যোক্তা পরিচালক রয়েছেন যাদের দেশের অভ্যন্তরে সামগ্রিক সম্পদের মূল্যমান ব্যাংক হতে গৃহিত ঋণের চেয়ে কম। এ সকল উদ্যোক্তা পরিচালক রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে পরিস্থিতির প্রতিকূলতাকে বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংক হতে ঋণের মাধ্যমে গৃহিত অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচার করে তথায় বিকল্প আবাস গড়ে তুলেছেন।

এ ধরণের বিকল্প আবাস গড়ার ক্ষেত্রে তারা প্রবাসে কর্মরত শ্রমিকদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা কালো বাজার হতে ক্রয় করে বিদেশে পাচার করেছেন। এ ধরণের উদ্যোক্তা পরিচালকদের অধিকাংশের ঋণ সময় মতো পরিশোধ না করার কারণে খেলাপি হওয়া পরবর্তী তারা বিভিন্ন কলাকৌশলে সুদ মওকুফের সুযোগ সৃষ্টি করে ঋণগুলো পুনঃতফসিলের ব্যবস্থা করে চলেছেন। এরা রাজনৈতিকভাবে আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ার কারণে এদের ঋণের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের নিয়ন্ত্রণ শিথিল ও অকার্যকর।গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনটিগ্রেটি নামক যে সংস্থাটি এক দেশ হতে অন্য দেশে বিশেষত: স্বল্পোন্নত দেশ হতে উন্নত দেশে অর্থ পাচার বিষয়ে কাজ করে সে সংস্থাটির তথ্যমতে বাংলাদেশ হতে বিগত দশ বছরে প্রায় ৬ লাখ হাজার কোটি টাকা পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশে পাচার হয়ে গেছে। এ অর্থ পাচারের সাথে যারা জড়িত এদের একটি বড় অংশ হলো বিভিন্ন ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালক। এ সকল উদ্যোক্তা পরিচালকের বিভিন্ন ব্যাংক হতে গৃহিত ঋণের বিপরীতে দেশে যে সম্পদ রয়েছে এ বিষয়ে কার্যকর তদন্ত করা হলে ঋণের অর্থ তারা কিভাবে পাচার করছেন এর সন্ধ্যান মিলবে।

এরা ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় প্রভাবশালী বিধায় দুর্নীতি নির্মূলের দায়িত্বে নিয়োজিত সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এদের বিষয়ে তদন্তে কদাচিৎ আগ্রহী হতে দেখা যায়।
একটি ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালকের নিজ ব্যাংক হতে ঋণ গ্রহণে বিধিনিষেধ থাকলেও অধিকাংশ উদ্যোক্তা পরিচালক বেনামে অথবা একে অপরের ব্যাংক হতে ঋণ গ্রহণ করে তাদের অভীষ্ট আর্থিক লক্ষ্য হাসিল করে চলেছেন। বেসরকারি ব্যাংকসমূহে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কর্মকর্তা হিসেবে যারা কর্মরত রয়েছেন এদের সকলের নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হলো উদ্যোক্তা পরিচালক সমন্বয়ে গঠিত ব্যবস্থাপনা বোর্ড। সুতরাং ব্যবস্থাপনা বোর্ডের সিদ্ধান্ত ব্যাংকের স্বার্থের প্রতিকূলে হলেও চাকরি রক্ষার্থে ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ব্যাংকে কর্মরত কর্মকর্তাদের ব্যবস্থাপনা বোর্ডের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ তাদের চাকরির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দেখা দেয়।

আর এ কারণেই উদ্যোক্তা পরিচালকদের বেপরোয়া হওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকের অভ্যন্তরে কর্মকর্তা পর্যায়ে যারা রয়েছেন তাদের বাঁধা দেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল।
উদ্যোক্তা পরিচালকদের অন্যায় লোভের কারণে অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংক কাঙ্খিত পরিমাণ মুনাফা অর্জনে ব্যর্থ। আর এ ব্যর্থতায় ব্যাংকের শেয়ার ক্রয় করে যে সকল বিনিয়োগকারী মনে মনে লাভের হিসাব কষছিলেন তারা ব্যাংক কর্তৃক লভ্যাংশ ঘোষণা পরবর্তী আশাহত ও ব্যথিত। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সম্মিলিতভাবে ব্যাংকের মূলধন ও সামগ্রিক আমানতের সিংহভাগের মালিক হওয়া সত্ত্বেও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের ভূমিকা শূন্য। আর এভাবে মূলধন ও আমানতের মোটা অংকের মালিকদের ব্যাংক পরিচালনা ও নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে ভূমিকা না থাকলে সে ব্যাংক কখনো প্রকৃত অর্থে ঋণ ও বিনিয়োগের সমন্বয়ে লাভজনক প্রতিষ্ঠান না হয়ে স্বার্থান্বেষী উদ্যোক্তা পরিচালকদের অনেকটা ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের ন্যায় অযৌক্তিকভাবে তাদের সুযোগসুবিধা সংরক্ষণে ব্যতিব্যস্ত থাকবে।

লেখক: সাবেক জজ। সংবিধান ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
রশঃবফবৎধযসবফ@ুধযড়ড়.পড়স
সম্পাদনা : মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত