প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অনিয়ম-দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হাব

ডেস্ক রিপোর্ট : হজযাত্রীদের সেবার মান নিশ্চিতকরণে সচেষ্ট না হয়ে নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল হাবের সাবেক নেতৃবৃন্দ। হাজীদের সেবার মান বাড়ছে না। অথচ প্রতি বছরই বাড়ছে তাদের বিড়ম্বনা। সে দিকে তেমন নজর না দিয়ে হাবের সাবেক শীর্ষ নেতারা নিজেদের স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন বলেও একাধিক সূত্র জানায়। মক্কা-মদিনায় হাজীদের নানা ভোগান্তি ও দুর্ভোগ পোহাতে হয়। হাবের বর্তমান কমিটি দুর্নীতি মুক্ত হাব প্রতিষ্ঠায় ব্যাপক উদ্যোগ নিচ্ছেন। হাবের সাবেক কমিটি কোনো ইজিএম, এজিএম ও কার্যনির্বাহী পরিষদের অনুমোদন ছাড়াই মাত্র ৯ দিনের মধ্যে ৪ টি সভা করে সাভারের ভাকুরতা মৌজায় নিচু এলাকায় ‘হাব পল্লী’ নামে জমি ক্রয় করে।

আর এতে বিধি বর্হিভূতভাবে ৯ কোটি ২১ লাখ টাকা পরিশোধ করার চাঞ্চল্যকর তথ্য গতকাল বুধবার প্রকাশ করেছে হাব গঠিত তদন্ত কমিটি। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধুমাত্র ক্রয় কমিটি’র সিদ্ধান্তে জমি ক্রয় করা হয়েছে। এটা মোটেও আইনসিদ্ধ নয়, তা সর্ম্পূণ ভিত্তিহীন, অবৈধ, অনৈতিক ও গ্রহণযোগ্য নয়। তদন্ত কমিটি’র সদস্য ও হাবের শীর্ষ কর্মকর্তা না প্রকাশ না করার শর্তে মঙ্গলবার রাতে ইনকিলাবকে বলেন, হাবের বিগত কমিটি ‘হাব পল্লী’র জমি ক্রয়ের নামে পুকুর চুরি নয় ; সাগর ডাকাতি করেছেন । হজযাত্রীদের ট্রলি ব্যাগ ক্রয় নিয়ে অনিয়ম করেছে সাবেক কমিটি।

ট্রলি ব্যাগ ক্রয়ে লাভের টাকা হাব তহবিলে জমাও করা হয়েছিল। গত মঙ্গলবার নয়া পল্টনস্থ হাব কার্যালয়ে হাবের জরুরী ইসি সভায় ২০১৫ সালের ৫ হাজার হাজীর কোটা নিয়ে দুর্নীতির তদন্ত করে সুপারিশ পেশ করার জন্য হাব নেতা এ এস এম ইব্রাহিমকে আহবায়ক ও গোলাম মোহাম্মদকে সদস্য সচিব করে ৯ সদস্য বিশিষ্ট একটি সাব-কমিটি গঠন করা হয়েছে। ভাকুরতা মৌজায় খন্ড খন্ড দাগে এসব জমির বিক্রেতা ছিলেন হাবের তৎকালিন মহাসচিব শেখ আব্দুল্লাহ আর ক্রেতা ছিলেন হাবের তৎকালিন সভাপতি মো: ইব্রাহিম বাহার। হাবের সাবেক মহাসচিব শেখ আব্দুল্লাহ তদন্ত কমিটি’র প্রতিবেদনকে সর্ম্পূণ মিথ্যা ও বানোয়াট হিসেবে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, আট মাস আগে হাবের ক্ষমতা বুঝিয়ে দিয়েছি আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য এ ধরনের মিথ্যা প্রতিবেদন গতকাল হাবের এজিএম-এ পেশ করা হয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে শেখ আব্দুল্লাহ বলেন, হাব পল্লী’র জমি বিক্রির মাধ্যমে কোনো দুর্নীতি করিনি। হাব পল্লীর জমিতে কোনো মামলা নেই। খন্ড খন্ড জমি প্রয়োজনে একত্রে ১০ বিঘা জমি হস্তান্তর করে দিবো। জমিতে উন্নয়নের কাজ চলছে এবং ৮০ ফিট রাস্তা রয়েছে বলেও তিনি দাবী করেন। হাবের পরবর্তী মিটিংয়ে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে তা’ তিনি পালনের চেষ্টা করবেন। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাবেক হাব-এর নেতারা অনিয়ম-দুর্নীতিতে নিমজ্জিত ছিল না।

দু’বার হাবের মহাসচিব থাকাকালে হজযাত্রীদের স্বার্থে কাজ করেছেন এবং কোনো দুর্নীতির সাথে জড়িত ছিলেন না বলেও তিনি দাবী করেন। হাবের সাবেক সভাপতি ইব্রাহিম বাহার বিদেশে অবস্থান করায় তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। হজ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে না পারায় প্রতি বছরই শত শত বেসরকারী হজ এজেন্সি’র বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উত্থাপিত হচ্ছে। ধর্ম মন্ত্রণালয় অভিযুক্ত হজ এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত পূর্বক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে গলদঘর্ম পোহাচ্ছে। ২০১৬ সালের হজেও নানা অনিয়ম-দুর্নীতির দরুন বেশ কিছু হজ এজেন্সি’র বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। ২০১৭ সালের হজেও নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে ধর্ম মন্ত্রণালয় ২শ’ ২৮টি হজ এজেন্সির বিরুদ্ধে শুনানী কাজ সম্পন্ন করে শিগগিরই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে।

সউদী হজ মন্ত্রণালয়ও এবার নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগে ৪৬টি হজ এজেন্সি’র বিরুদ্ধে শো’কজ নোটিশ পাঠিয়েছে। অনেক এজেন্সি এসব শো’কজের জবাব সউদী হজ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। কিন্ত আগামী হজে তারা হজের কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন কিনা তা’ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এদিকে, হজ ব্যবস্থাপনার কার্যক্রমকে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে এগিয়ে নেয়ার জন্য ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান, ধর্ম মন্ত্রণালয় সংসদীয় স্থায়ী কমিটি সভাপতি বি এইচ হারুন এমপি ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো: আনিছুর রহমান নিরলসভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আগামী ১৪ জানুয়ারী জেদ্দায় সউদী-বাংলাদেশ দ্বি-পাক্ষিক হজ চুক্তি সম্পন্ন হবার কথা রয়েছে। ধর্ম সচিব আনিছুর রহমান এ হজ চুক্তির খুঁটি নাটি বিষয়গুলো পূঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখছেন। প্রায় ১৩ শত হজ এজেন্সি’র সংগঠন হাবের দায়িত্ব হচ্ছে হজ এজেন্সিগুলোর স্বার্থ রক্ষা , হজযাত্রীদের সেবার মান নিশ্চিতকরণে অগ্রনী ভূমিকা রাখা এবং সরকারসহ বিভিন্স সংস্থার সাথে বার্গেনিং এজেন্ট হিসেবে হজ ব্যবস্থাপনার কার্যক্রমে স্বক্রিয় ভূমিকার পালন করা।

কিন্ত বিগত কয়েক বছর যাবত হাবের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল। সাবেক হাবের সময়কালে ওমরাহ যাত্রীর নামে সউদী আরবে চাকুরি সন্ধ্যানকারীদের ব্যাপক হারে যাওয়ায় দীর্ঘ দিন বাংলাদেশের জন্য ওমরাহ বন্ধ ছিল। হাবের একজন শীর্ষ নেতা এতথ্য জানান। রাজধানী থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে সাভারের ভাকুরতা মৌজায় স্বপ্নের হাব পল্লী জমি ক্রয় সর্ম্পকে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। রাজউক থেকে লে-আউটের ছাড়পত্র বিহীন ক্রয়কৃত হাব পল্লী’র জমি নিয়ে সদস্যদের মাঝে তোলপাড় শুরু হয়েছে।

রাস্তা-ঘাট বিহীন সমতল জমি থেকে প্রায় ১৫ থেকে ৩০ ফুট নীচু নাল জমি ক্রয়ে ইতিমধ্যেই বিধি বর্হিভূতভাবে ৯ কোটি ২১ লাখ টাকা হাব তহবিল থেকে ব্যয় করা হয়েছে। আরো ৫ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। বর্তমান বাজার মূল্যের চেয়ে দশগুন বেশী অর্থ দিয়ে রাতারাতি হাব পল্লীর জমি ক্রয় করা হয়েছে। জমি রেজিষ্ট্রেশন সংক্রান্ত খরচের পরিমাণ মোট মূল্যের প্রায় ২২% করা হয়েছে, যা সর্ম্পূণ অবাস্তব। ক্রয়কৃত হাব পল্লীর নাল জমিতে সরকারের ড্যাপ ( ডিটেল এরিয়া প্লান) অনুযায়ী ভরাট করা যাবে না, উন্নয়ন করা যাবে না, ঘরবাড়ীর অনুমোদন দেয়া যাবে না। এই রকম যে কোনো কাজ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এনিয়ে সচেতন হাব সদস্যদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিতর্কিত হাব পল্লী’র জমি বিক্রেতার বা তার আগের বিক্রেতার কাগজপত্র যথাযথ যাচাই করা হয়নি। জমি ক্রয়ের পক্ষে কোনো আইন বিশেষজ্ঞের লিখিত মতামতও পাওয়া যায়নি। উল্লেখিত জমিতে যাওয়ার জন্য বর্তমানে কোনো রাস্তা নেই ভবিষ্যতেও রাস্তা হবার সম্ভাবনা নেই। রাজউক থেকে জমির লে-আউটের ছাড়পত্র ছাড়াই উল্লেখিত হাব পল্লীর জমি ক্রয় করা হয়েছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে হাব পল্লীর জমি ক্রয়ের লক্ষ্যে কোনো জাতীয় দৈনিক প্রত্রিকায় জমির মালিকানা বিষয়ে আইনগত বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়নি।

জমি ক্রয় সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো আইনজ্ঞের নিয়োগের প্রমাণও মেলেনি। বর্তমান হাব কার্যনির্বাহী কমিটি গঠিত ১১ সদস্য বিশিষ্ট হাব পল্লী পর্যালোচনা সংক্রান্ত সাব-কমিটি’র পেশকৃত তদন্ত প্রতিবেদনে এতথ্য বেড়িয়ে এসেছে। তদন্ত কমিটির আহবায়ক হচ্ছেন হাবের সাবেক সভাপতি আলহাজ আব্দুস শাকুর ও সদস্য সচিব গোলাম মোহাম্মদ। সাভারের ভাকুরতা মৌজার নিন্মাঞ্চলের একাধিক খন্ডে বিভক্ত ক্রয়কৃত উল্লেখিত জমি হাব পল্লীর জন্য অনুপযুক্ত। খন্ডে খন্ডে বিভক্ত ক্রয়কৃত জমি বিক্রেতার কাছে ফেরত দিয়ে সর্ম্পূণ খরচসহ ব্যয়িত মূল্য আদায়ের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।

জমি বিক্রেতা হাবের সাবেক মহাসচিব শেখ আব্দুল্লাহ’র সাথে আলাপ-আলোচনা করে শান্তিপূর্ণভাবে বিষয়টি সুরাহা না হলে হাব সদস্যদের স্বার্থে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর পুলিশ কনভেনশন হল রুমে হাবের ১৪ তম বার্ষিক সাধারণ সভায় সাব-কমিটি’র তদন্ত প্রতিবেদন তুলে ধরা হলে সাধারণ হাব সদস্যরা হতবাক হন। সভায় সভাপতিত্ব করেন হাব সভাপতি আব্দুস ছোবহান ভূঁইয়া। তদন্ত কমিটি’র আহবায়ক আব্দুস শাকুর তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন।

হাব মহাসচিব মো: শাহাদাত হোসাইন তসলিমের সঞ্চালনায় এতে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন হাবের সিনিয়র সহ-সভাপতি মাওলানা ইয়াকুব শরাফতী, হাবের সাবেক মহাসচিব শেখ আব্দুল্লাহ, হাব নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: তাজুল ইসলাম , আটাবের সাবেক মহাসচিব আসলাম খান, রুহুল আমিন মিন্টু, আফতাব উদ্দিন চৌধুরী, মাওলানা ফজলুর রহমান। এতে আরো উপস্থিত ছেলেন, হাবের সাবেক মহাসচিব এম এ রশিদ শাহ সম্রাট, হাবের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি আব্দুল কবির খান জামান, হাবের সাবেক সহ সভাপতি ফরিদ আহমেদ মজুমদার। রাতে ফরিদ আহমেদ মজুমদার বলেন, হাব পল্লীর জমি ক্রয়ের লক্ষ্যে ৯ দিনে ৪টি সভা করে জমি ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া বেআইনী নয়। এ জন্য ঐ সময়ের হাব নেতাদের কোনো খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না। হাবের তৎকালিন সভাপতি ইব্রাহিম বাহার আর হাবে নির্বাচন করবেন না এ জন্য তিনি হাব সদস্যদের স্বার্থে হাব পল্লীর জমি ক্রয় করে গেছেন। এ নিয়ে কোনো দুর্নীতি হয়নি। ২০১৫ সালের ৫ হাজার হাজীর কোটা নিয়েও কোনো দুর্নীতি হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ নিয়ে গত ২৬ ডিসেম্বর হাবের মিটিংয়ে কোনো তদন্ত কমিটি হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন। হাব সভাপতি আব্দুস ছোবহান ভূঁইয়া হাব পল্লীর জমি’র তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে আরো পর্যালোচনা করে পরে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানান। সূত্র : ইনকিলাব

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত