প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বদলি ঠেকাতে চিকিৎসকদের দৌড়ঝাঁপ

ডেস্ক রিপোর্ট : ঢাকার বাইরে বদলি নিয়ে চিকিৎসকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ঢাকায় অবস্থানরত ১১০ চিকিৎসককে ২১ ডিসেম্বর দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলির আদেশ জারি করে সরকার। গতকাল বুধবার ছিল বদলি হওয়া চিকিৎসকদের নতুন কর্মস্থলে যোগদানের শেষ দিন। কিন্তু এখনও অনেকে নতুন কর্মস্থলে যোগ না দিয়ে বদলি ঠেকানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। বিভিন্ন মহলে সর্বোচ্চ তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন অনেকে। এরই মধ্যে প্রায় অর্ধশত চিকিৎসকের বদলি ঠেকানোর সুপারিশ করেছেন একাধিক প্রভাবশালী মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং সচিবসহ সরকার ও প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। বদলি আদেশ নিয়ে সন্তুষ্ট নয় সরকারদলীয় চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাচিপ (স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ)। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যারা যোগ দেননি- সেসব চিকিৎসককে বদলি আদেশ অনুসারে আজ বৃহস্পতিবার (২৮ ডিসেম্বর) তাৎক্ষণিক অবমুক্ত করার ঘোষণা রয়েছে। এ ছাড়া তাদের বেতন-ভাতাও বন্ধ থাকবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ওএসডি পোস্টিং নিয়ে ঢাকায় অবস্থানরত তিন শতাধিক চিকিৎসকের মধ্যে ২১ ডিসেম্বর ১১০ জনকে বদলি করা হয়। কিন্তু তাদের মধ্যে বেশিরভাগই এখনও নতুন কর্মস্থলে যোগ না দেওয়ায় গ্রামপর্যায়ে দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের লক্ষ্যে নেওয়া সরকারের উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এদিকে স্বাচিপের অভিযোগ, সরকার সমর্থিত চিকিৎসকদেরই ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে। বিএনপি সমর্থিত ড্যাবের নেতাকর্মীদের মধ্যে কাউকে বদলি করা হয়নি বলেও দাবি করেছেন স্বাচিপের শীর্ষ এক নেতা। বিষয়টিকে তিনি সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা বলে দাবি করেছেন। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে বিএনপিপন্থি কতিপয় আমলা জড়িত বলেও অভিযোগ করেন তিনি। বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের প্রতি আহ্বান জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাচিপের এই নেতা।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার বাইরে বদলি করা চিকিৎসকদের মধ্যে ৩ জন অধ্যাপক, ১৪ জন সহযোগী অধ্যাপক, ৬ জন সহকারী অধ্যাপক, ২ জন সিনিয়র কনসালট্যান্ট এবং ৮৫ জন জুনিয়র কনসালট্যান্ট। সবচেয়ে বেশি ৩৫ জন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে বদলি করা হয়েছে। এরপরই ২৫ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে বদলি করা হয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল, ক্যান্সার, হৃদরোগ, কিডনি, নিউরোসায়েন্স, নিটোর, চক্ষু বিজ্ঞান, মুগদা ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকরা রয়েছেন।

নতুন কর্মস্থলে যোগদানের জন্য পুরনো কর্মস্থল থেকে গতকাল পর্যন্ত কতজন চিকিৎসক রিলিজ নিয়েছেন তা জানতে যোগাযোগ করা হলে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম বড়ূয়া সমকালকে বলেন, অনেকে নিয়েছেন। তবে কতজন সেই সংখ্যা তার মনে নেই। অভিন্ন বক্তব্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিনেরও। সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলের অধ্যাপক ডা. উত্তম বড়ূয়া বদলি প্রসঙ্গে সমকালকে বলেন, এমনিতেই জনবল সংকট রয়েছে। অতিরিক্ত চিকিৎসকদের বদলির কারণে সুষ্ঠুভাবে সেবাদান ব্যাহত হতে পারে। তাই নিয়মিত পদ সৃষ্টি করে চিকিৎসকদের পদায়নের ব্যাপারে সরকারের সহায়তা কামনা করেন তিনি।

এখনও যেসব প্রতিষ্ঠানে ওএসডি পোস্টিং :ওএসডি পোস্টিং নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে এখনও দুই শতাধিক চিকিৎসক রয়েছেন। সমকালের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীর চার হাসপাতালেই ১৪০ জন চিকিৎসক এখনও ওএসডি পোস্টিং নিয়ে অবস্থান করছেন। এর মধ্যে ঢাকা মেডিকেলে দায়িত্বরত ৪৮ জন, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে ৩৮ জন, সলিমুল্লাহ মেডিকেলে ২২ জন এবং জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে ৩২ জন। অন্যরা মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, কুর্মিটোলা, জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, নিটোর, চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, নিউরোসায়েন্সসহ বিভিন্ন হাসপাতালে অবস্থান করছেন।

যে কারণে ঢাকামুখী : প্রাইভেট প্র্যাকটিসের মাধ্যমে বাড়তি আয় করতে গিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানে ঠিকভাবে চিকিৎসকরা দায়িত্ব পালন করেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। তাই দিনের শুরুতে নির্ধারিত সময়ে অনেককেই কর্মস্থলে পাওয়া যায় না। অনেকে কয়েক ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করেই চলে যান। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের নির্দেশের পরও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা হাসপাতালে সান্ধ্যকালীন রাউন্ডে আসছেন না। মন্ত্রী সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়েও এমন পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করেছেন। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, রাজধানীর কর্মস্থলে থাকলে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করে বাড়তি অর্থ আয়ের সুযোগ পাওয়া যায়। এ ছাড়া সন্তানের লেখাপড়া ও পরিবার-পরিজন নিয়ে একসঙ্গে থাকতে চিকিৎসকরা ঢাকামুখী হচ্ছেন।

ঢাকার বাইরে চিত্র ভয়াবহ : ঢাকার বাইরে সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে লোকবল সংকটের কারণে চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষক সংকটের কারণে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনও করেছেন। শিক্ষক সংকটের কারণে সবচেয়ে বেকায়দায় পড়েছেন সাম্প্রতিককালে চালু হওয়া ১০টি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকদের ঢাকার বাইরে পাঠাতে না পেরে গত বছর পরামর্শকদের পাঠদানে নিয়োজিত করেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না।

একইভাবে একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েও এক বছর ধরে চিকিৎসকদের ঢাকার বাইরে বদলি করতে পারেনি সরকার। কয়েক মাস আগেই ৩০ জন চিকিৎসককে বদলি করা হয়। কিন্তু তদবির করে তারা আবারও ঢাকায় ফিরে এসেছেন। গ্রামের কর্মস্থলেও চিকিৎসকদের উপস্থিতির হার সন্তোষজনক নয়। কয়েক মাস আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৬০ শতাংশ চিকিৎসক কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকছেন। এতে করে জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার রয়েছে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। মূলত এরপরই ঢাকার বাইরে চিকিৎসকদের পাঠানোর বিষয়ে উদ্যোগ নেয় সরকার।

তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব সমকালকে বলেন, সরকারের অব্যবস্থাপনার কারণেই এমনটি হয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনা ও উচ্চ পর্যায়ের তদবিরে এসব চিকিৎসককে ওএসডি পোস্টিং দিয়ে ঢাকায় আনা হয়েছে। কোথাও চিকিৎসক লাগলে পদ সৃষ্টি করতে হবে। এক কর্মস্থল খালি করে অন্য কোথাও পদায়নে নৈরাজ্য বাড়বে।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব সিরাজুল হক খান সমকালকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে। সবাই নির্দেশনা অনুসরণ করবেন বলে আশা করেন তিনি। কেউ নতুন কর্মস্থলে যোগ না দিলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, আজ বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এ প্রসঙ্গে সমকালকে বলেন, স্বাস্থ্যসেবা নাগরিকের মৌলিক অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অঙ্গীকার মোতাবেক নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য খাতের সকলের সহায়তাও চেয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সূত্র : সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত