প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাজনীতির ফাঁদে নিরাপদ পানি

মাইকেল : পানির অপর নাম জীবন। শুধু জীবন কেন, মানব সভ্যতাও পানি ঘিরেই গড়ে উঠেছে। বর্তমানে নিরাপদ খাবার পানি কব্জায় নিয়ে রমরমা ব্যবসা ফেঁদেছে ক্ষমতাসীনরা। খাবার পানির প্রকল্প নলকূপ স্থাপনে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বিশাল অঙ্কের অর্থ। ব্যবহার হচ্ছে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নিশ্চিতে নিরাপদ খাবার পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায় বৈশ্বিকভাবে মডেল দেশ হতে চায় বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনকে মানুষের মৌলিক অধিকারের খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে সরকার; কিন্তু আওয়ামী লীগের সমর্থক পরিচয় ছাড়া মিলছে না বিশুদ্ধ পানির প্রধান উৎসের এ সংযোগ। মূল্যায়ন ছাড়াই রাজনৈতিক বিবেচনা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের নির্বাচনী এলাকায় প্রকল্প গ্রহণ, রাজনৈতিক পরিচয়ে ঠিকাদার ও তৃণমূলে সুবিধাভোগীদের নলকূপ বরাদ্দ ও নলকূপ স্থাপনে নানা কৌশলে আদায় করা হচ্ছে নগদ টাকা। শুধু তাই নয়, প্রকল্পের বিল আটকে রেখে ঠিকাদারদের কাছ থেকে ‘১০ শতাংশ’ কমিশন আদায়ের অভিযোগ প্রভাবশালী নীতিনির্ধারকের বিরুদ্ধে। ৬ ধাপে অবৈধ লেনদেন ও রাজনীতিকরণে খাবার পানির অধিকারবঞ্চিত সাধারণ মানুষ। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারে নলকূপের ভিটিতে ফাটল ও চাপকলের হাতল ভাঙছে। ভোটার টানতে সরকারি নলকূপে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ‘মন্ত্রীর সৌজন্যে’ নামফলক বসানো হয়েছে।

সরকারিভাবে নলকূপ স্থাপন করছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ‘জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই)’। ডিপিএইচই সূত্র জানায়, উন্নয়ন বাজেটের ‘পল্লী অঞ্চলে পানি সরবরাহ’ প্রকল্পে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সারা দেশে ৬৩ হাজার নলকূপ বসছে। নলকূপপ্রতি ৭০ হাজার টাকা করে প্রকল্পের ব্যয় ৪৪১ কোটি টাকা। গ্রাহক থেকে প্রতিটিতে ৭ হাজার টাকা করে ‘কন্ট্রিবিউশন মানি’ জমা নেওয়া হচ্ছে। সরকারের ভর্তুকি প্রায় ৪শ কোটি টাকা।

এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনে (ক্ষতিগ্রস্ত, বন্যা ও আর্সেনিকপ্রবণ) এলাকায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের ‘জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের (বিসিসিটিএফ)’ অর্থায়নে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২২টি প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন জেলায় প্রায় ৬৯ কোটি টাকার পয়ঃনিষ্কাশন ও নলকূপ স্থাপনের কাজ চলছে। বন্যার পানির প্রতিরোধক উঁচু ভিটির এ নলকূপপ্রতি বরাদ্দ প্রায় এক লাখ টাকা।

পানি ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সারাদেশে বরাদ্দকৃত নলকূপের বিপরীতে টাকার অঙ্ক কম; কিন্তু গ্রামাঞ্চলে নলকূপপ্রতি উপকারভোগীর সংখ্যা শতাধিক। ছোট ব্যয়ের এসব প্রকল্পে জনসম্পৃক্ততা যে কোনো বড় প্রকল্পের চেয়েও বেশি। ঘাটে ঘাটে অনিয়মে পানি ও জলবায়ু খাতে সুশাসনের অভাব দেখা দিচ্ছে। মান খারাপে দীর্ঘ সময় ধরে পানি উত্তোলনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

নলকূপ বরাদ্দ অনুসন্ধানে সরেজমিনে যাওয়া হয় প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ভোলার মনপুরা ও চরফ্যাশন উপজেলার চরকুকরি-মুকরি ইউনিয়নে। ‘বিশেষ যোগ্যতায়’ ওই এলাকা এখন গভীর নলকূপের রাজ্য! বিসিসিটিএফ প্রকল্পে প্রথম ধাপে মনপুরায় ৯৮৫টি এবং চরফ্যাশনে ৮১৭টি নলকূপ বসানো হয়। দ্বিতীয় ধাপের এক হাজার নলকূপের মধ্যে চরফ্যাসনে ১৪০ এবং মনপুরায় ৩৫টি বসানো শেষ হয়েছে।

মনপুরার হাজীরহাট, উত্তর ও দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নে ট্রাস্ট ফান্ডে স্থাপিত ৩২টি নলকূপ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরেজমিন মূল্যায়ন ছাড়াই যতজন বরাদ্দ পেয়েছেন সবাই স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা। বিএনপি নেতা এমন একজন ভাগ্যবানের সন্ধান পাওয়া গেলেও তার জন্য তদবির ছিল দুই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতির।

মনপুরা উপজেলা শহর ঘিরে হাজীরহাট ইউনিয়নে আগে থেকেই নলকূপ থাকা সত্ত্বেও নতুন করে পেয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বায়েজিদ কামাল, প্রচার সম্পাদক সালাউদ্দিন, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন আজম, যুবলীগ সাংগঠনিক সম্পাদক বাবুল মাতব্বর, যুবলীগ নেতা মহিউদ্দিন আহমেদের বাড়িতে। নলকূপ আরও পেয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগ সদস্য আবদুস সালাম কাঞ্চন, কোষাধ্যক্ষ আবদুল হাশেম, যুবলীগের সিরাজ মাতব্বর, ইউপি স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা নুরুন্নবী বাহার, বাসেদ মেম্বার, দাসেরহাট যুবলীগ নেতা সিরাজ মিয়া, মান্নান মাঝি, আবদুল্লাহ জুয়েলসহ এমন অনেকে। কারো কারো রান্নাঘরে বসেছে নলকূপ। নলকূপে পাথরের নামফলক বসিয়ে তাতে খোদাই করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির ‘সৌজন্য’ লেখা রয়েছে।

একই অবস্থা দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নে। ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি পান্নু বেপারী আক্ষেপ করে বলেন, আওয়ামী লীগ করে একটি নলকূপ পেয়েছি। কাউকে নগদ টাকা না দিলেও ৪ দিনে ঠিকাদারের ১৪/১৫ জনকে খাইয়েছি; কিন্তু স্থাপনের এক বছর শেষ না হতেই ভিটির আস্তর উঠে যাচ্ছে। ঠিকাদার ঠিকমতো সিমেন্ট দেয়নি বলেই এই অবস্থা।

পান্নু বেপারীর মতে, রাজনৈতিক পরিচয়ে নলকূপ পেয়েছেন উত্তর সাকুচিয়া সোনাপুর গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা রফিক মেম্বার, তার স্বজন আলাউদ্দিন কেরানী, জাকির মিস্ত্রি ও সৈয়দ চৌকিদার। দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি ভোটার টানার তাগিদে এসব নলকূপ বরাদ্দ দিয়েছেন স্থানীয় চেয়ারম্যান-মেম্বাররা।

তবে ব্যতিক্রম ঘটেছে দক্ষিণ সাকুচিয়া বিএনপির নেতা আব্বাস তালুকদারের বেলায়। তিনি জানান, দক্ষিণ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম ও উত্তর সাকুচিয়ার সভাপতি সিরাজ কাজীর সঙ্গে সুসম্পর্ক তার। তাদের তদবির ছিল। দলীয় লোক না হলেও নিরাপদ পানির ভরসা পান ওই গ্রামের সোবহার সিকদার। তার মামা চরফ্যাসন উপজেলা চেয়ারম্যান জয়নাল আকন্দ। পান্নু বেপারীর ভাষ্য, জয়নাল আকন্দের ফোনে সোবহান সিকদারের নলকূপ মেলে।

তবে মনপুরা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেলিনা আক্তার চৌধুরী বলেন, দলীয় লোক বুঝি না, ৫০টি ঘরে একটি নলকূপ দেওয়া হয়।

কুকরি-মুকরিতেও দেখা গেছে একই চিত্র। কুকরি বাজারঘেঁষা হাজীপুরের মফিজ হাওলাদার ইউপি ছাত্রলীগের সভাপতি। দলীয় পরিচয়ের বাইরে তাদের গুনতে হয়েছে ১০ হাজার টাকা।

মফিজ বলেন, নগদ টাকা দিলেও ড্রিল মেশিনের তেলসহ অন্যান্য খরচ বাবদ ঠিকাদারের পেছনে এই টাকা ব্যয় হয়। প্রতিবেশী ইউপি আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মুক্তার চৌধুরী বলেন, তার ব্যয় হয়েছে ১৫ হাজার টাকা।

চর কুকরি-মুকরিতে দলীয় পরিচয়ে নলকূল বরাদ্দের হিড়িক পড়ে গেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন ইউপি যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হাওলাদার, আওয়ামী লীগ নেতা জয়নাল মুন্সী, ইউপি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ওয়ার্ড মেম্বার খোকন হাওলাদার, আমিনপুরের আলাউদ্দিন হাওলাদার, নজির হাওলাদার, শাহবাজপুর গ্রামের রতন বেপারী, বশার হাওলাদার, ফারুক মজুমদার, লোকমান হাওলাদার। দলীয় পরিচয় ছাড়াও ভোটের বিবেচনায় চেয়ারম্যান-মেম্বাররা বিনা টাকায় বরাদ্দ দিলেও টাকা গুনতে হয়েছে তাদের।

এক ঠিকাদার বলেন, ই-টেন্ডারের মাধ্যমে তারা কাজ পেলেও বিল তুলতে গেলে এলাকার এক রাজনৈতিক প্রভাবশালীকে নলকূপপ্রতি ৮ হাজার টাকা করে কমিশন দিতে হয়েছে। টাকা না দিলে উপজেলা ওয়াটসন কমিটির মাধ্যমে কাজ আটকে দেন ওই নেতা।

মনপুরায় নলকূপের কাজ পেয়েছেন ভোলা সদর উপজেলার ধনিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা কবির হোসেন, জেলা আওয়ামী লীগ নেতা ইলিয়াস।

জানতে চাইলে বিসিসিটিএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীপক কান্তি পাল বলেন, নলকূপের কাজ করে ডিপিএইচই। আমরা কাজের তদারকি করি। তদারকিতে অনিয়ম দেখিনি। তবে সরকারি নলকূপে ব্যক্তির নামে সৌজন্য বসানো ঠিক নয়।

ডিপিএইচই ভোলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আকমল হোসেন বলেন, নতুন নীতিমালায় জনপ্রতিনিধিরাই ওয়াটসন কমিটিতে থাকবেন। তারাই তালিকা তৈরি করে বরাদ্দ দেন। আমরা কাজের মান দেখি। মান নিয়ে অভিযোগ পাইনি।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের বাইরে এখন হচ্ছেটা কী? যে কাজই হোক, সেখানে আওয়ামী লীগই লাভবান হবে। সুবিধাভোগীও তাদের লোক হতে হবে। এমন একটি কাজ দেখাতে পারবেন, যেটি দলীয় বিবেচনা ছাড়া নিরপেক্ষভাবে হয়েছে। এভাবে সুশাসনের প্রশ্নই আসে না।

ডিপিএইচই সূত্র মতে মাটি ও পানির গুণাগুণ, জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় ২০১৪ সাল পর্যন্ত নলকূপ বরাদ্দ দেওয়া হতো; কিন্তু এমপিদের সন্তুষ্ট রাখতে ২০১৫ সালের নীতিমালায় উপজেলা ওয়াটসন কমিটি এবং এমপিদের ফিফটি ফিফটি পারসেন্ট নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কমিটিতে স্থানীয় এমপি উপদেষ্টা, উপজেলা চেয়ারম্যান সভাপতি, ইউএনও সহসভাপতি, ডিপিএইচই কর্মকর্তা সদস্য সচিব, ইউপি চেয়ারম্যান সদস্য।

তবে জনপ্রতিনিধিদের চাপে ফান্ডের তদারকি, অভিযোজন (জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো), যোগ্যতা ছাড়াই বরাদ্দ দেওয়া হয়। এতে অরাজনৈতিক বা বিরোধী রাজনীতিকরা বঞ্চিত হয়ে আসছেন। জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডে দুর্নীতি নিয়ে এর আগে টিআইবি (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ) প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

টিআইবির সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার (জলবায়ু অর্থায়নে সুশাসন) এম জাকির হোসেন খান বলেন, জলবায়ু অর্থায়নের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত না করলে অভিযোজন কার্যক্রম ব্যাহত ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হবে না। ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী আরও ক্ষতির শিকার হবে।

সূত্র : আমাদের সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত