প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ ২০১৭ সালে বিশ্বনেতাদের উত্থান-পতন

লিহান লিমা: বিশ্বজুড়ে অনেক নেতার কাছে ২০১৭ সাল ছিল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। ভূ-রাজনৈতিক এই ঢামাডোলে কেউ লাভবান হয়েছেন, আবার কেউ বিপর্যয়ের সম্মুখিন হয়ে পিছু হটেছেন। সিএনএনের আন্তর্জাতিক করেসপন্ডেন্টরা ২০১৭ সালে কারা এগিয়েছেন আর কারা পিছু হটেছেন সে বিষয়ে যে প্রতিবেদন করেছেন তা ভাষান্তর করা হয়েছে।

সফল যারা:

ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ:

এই তালিকায় প্রথমেই আসবে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর। নির্বাচনে অভাবনীয় জয় লাভ করে সাবেক এই অর্থমন্ত্রী ফ্রান্সের দুইটি প্রধান দলের ধস নামিয়ে দেন। শুধু ফ্রান্সে নন, লন্ডন, ওয়াশিংটন এবং বার্লিনের রাজনীতিতে জায়গা করে নেন ম্যাক্রোঁ। হয়ে উঠেন মুক্ত বিশ্বের নেতা।

বাশার আল আসাদ:

২০১৭ সালে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ সিরিয়া অঞ্চলকে একত্রিত করতে সমর্থ হন এবং নিজের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে আইএস-এর বিরুদ্ধে লড়াই করেন। শুধু নিজের ক্ষমতাই ধরে রাখেননি, যা চেয়েছেন তার চেয়ে বেশি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন।

রিসেপ তায়েপ এরদোগান:

অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে দেশটির সামরিক অভ্যুত্থান মোকাবেলা করেছিলেন তিনি। তবে সাংবাদিকদের কারাবাস, বিরোধী দলকে নির্যাতন, সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর চাপের জন্য সমালোচিত হন। কিন্তু আঞ্চলিক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মাঝে তুরস্ককে স্থিতিশীল রাখার জন্য অবশ্যই প্রশংসা কুড়োবেন তিনি।

ভ্লাদিমির পুতিন:

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের একনায়কতন্ত্রের পরও রাশিয়ার জনগণের আস্থা তিনি, তীব্র জনপ্রিয়ও। তবে অর্থনৈতিক অচলাবস্থা ও রাষ্ট্রকর্তৃক ডোপিং মদদের অভিযোগে রুশ অ্যাথলেটদের অলিম্পিকে নিষেধাজ্ঞা ভোগাবে তাকে। ২০১৭ সালে মার্কিন নির্বাচনে হস্তক্ষেপ ও ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের ভাষণে রাশিয়াকে প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে উল্লেখ করা ট্রাম্প আমলে আমেরিকার সঙ্গে সেন্ট পিটার্সবুর্গের ভালো সম্পর্ক সৃষ্টির আশায় জল ঢেলে দেয়। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে পুতিন জয়লাভ করেছেন। সিরিয়াতে মিত্র আসাদকে সুবিধাজনক অবস্থানে দাঁড় করানো, এই অঞ্চলে রুশ বাহিনীর অবস্থান নিশ্চিত ও নিজের দেশকে আন্তর্জাতিকভাবে বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছেন।

শি জিনপিং:

২০১৭ সাল চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের জন্য সেরা বছর। নিজ দল কম্যুনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন তিনি এবং তার চিন্তা-ভাবনাকে দলের সংবিধানের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। মাও সে তুং-এর পর শি জিনকেই এই বিরল সম্মাননা দেয়া হয়। শি জিন ক্ষমতাকে এমনভাবে সংঘবদ্ধ করেছেন যা গত এক দশকে আর দেখা যায় নি। চীনের জিডিপি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দেশটির বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে উত্থান হয়েছে। যদিও উত্তর কোরিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি, ট্রাম্পের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, চীনের ধীর অর্থনৈতিক উন্নতি শি জিনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে।

কিম জং উন:

১ জানুয়ারি উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন আন্ত-মহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের চূড়ান্ত ধাপ অর্জন করার ঘোষণা দেন। পরদিনই নব-নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন, পিয়ংইয়ং কখনোই তা করতে পারবে না। কিন্তু ১১ মাসে দেশটি ১৬টি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা ও ১ টি পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। যদি ২০১৭ ইচ্ছাযুদ্ধ হত, তবে ট্রাম্প-কিম ভালোভাবেই একে অপরকে অপমান করে, হুমকি দিয়ে এটি চালিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু ২০১৮ সাল কিমের ভালো যাবে কি না তা বলা মুশকিল, একের পর এক নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হয়েছে তার দেশ উত্তর কোরিয়া।

মোহাম্মদ বিন সালমান:

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এ বছর ক্ষমতা নিয়ে ভালোই খেলা দেখিয়েছেন। এই তরুণ রাজকুমার তার সংস্কারের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের একের পর এক সাহসী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। সিংহাসনের তৃতীয় উত্তরাধিকারী থেকে এখন তিনি দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন। নিজের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে এমন যে কোন পরিস্থিতির পথ রুদ্ধ করেছেন তিনি। দেশে নারীদের গাড়ি চালনার অধিকার, সিনেমা হল উন্মুক্ত, আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা খর্ব, রক্ষণশীলতা নিয়ন্ত্রণ করে তরুণদের মাঝে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন তিনি। আরব বিশ্বের হয়ে ট্রাম্পসহ অন্যান্য বিশ্বনেতাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে গিয়েছেন তিনি। কিন্তু আসছে ১২ মাস তার জন্য চ্যালেঞ্জ, কারণ তার দুর্নীতিবিরোধী ধরপাকড় প্রশ্নের সম্মুখীন, ইয়ামেন যুদ্ধ তাকে বৈশ্বিক সমালোচনার মুখে ফেলেছে।

শিনজো অ্যাবে:

বৈশ্বিক অনির্দিষ্টতার সময়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে অর্জন অনেক। বিশ্বে তিনিই প্রথম নেতা যিনি ট্রাম্পের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছেন, ট্রাম্পের প্রশংসা কুড়িয়েছেন এবং তার সঙ্গে গল্ফ কূটনীতি চালিয়েছেন। গত দুই দশকে জাপান তার সেরা অর্থনৈতিক উন্নতি করেছে এবং তিনি জাপানের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন।

বিপর্যয় যাদের:

অং সান সু চি:

২০১৭ মিয়ানমারের একসময়ের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চির জন্য একটি বিরাট ধস। নির্বাচিত হয়ে সু চি এশিয়াতে প্রত্যাশার বীজ বুনলেও পরে রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতিগত নিধনের সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। তার নোবেল পুরস্কার প্রশ্নবিদ্ধ হয় ও আন্তর্জাতিক বিশ্বে তার বহু সম্মাননা, পদক, স্বীকৃতি বাতিল করা হয়। কিন্তু নিজ দেশের প্রশাসনের কাছ থেকে তিনি পর্যাপ্ত সমর্থন পাচ্ছেন।

অ্যাঙ্গেলা মের্কেল:

জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেল এ বছর কঠিন সময় পার করেছেন। মুক্তমনা মের্কেলের সঙ্গে জাতীয়তাবাদী ট্রাম্পের দ্বন্দ্বে ওয়াশিংটন-বার্লিন সম্পর্ক হুমকিতে পড়লেও মের্কেল সেটি পুনরুদ্ধার করতে পেরেছেন। জার্মান নির্বাচনে জয় পেলেও বুন্ডেসটার্গে জাতীয়তাবাদী দলের প্রবেশ মের্কেলকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। মের্কেল জয় পেয়েছেন কিন্তু তাকে জোট সরকার গঠন করতে হবে এবং খুব শিগগির তাকে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।

থেরেসা মে:

মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র দল। ক্ষমতা ধরে রাখতে তাকে উত্তর আয়ারল্যান্ডের রক্ষণশীল ডেমোক্রেট ইউনিয়নের সঙ্গে জোট বাঁধতে হয়। এই পদক্ষেপের কারণে ব্রেক্সিট সমঝোতায় আয়ারল্যান্ডের সীমান্ত ইস্যু একটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তার ওপর যৌন কেলেঙ্কারি, অফিসে পর্নোগ্রাফি দেখার অভিযোগ, গোপন বৈঠকের দায়ে নিজের ক্যাবিনেটের তিন বলিষ্ঠ মন্ত্রীকে হারান মে।

উহুরু কেনিয়াত্তা:

নির্বাচনে জয় লাভ করার পরও কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উহুরু কেনিয়াত্তার অবস্থান ভালো নয়। এই নির্বাচনে কেনিয়ার বিরোধী দলীয় নেতা রাহিলা ওদিঙ্গা বয়কট করেন এবং কেনিয়াত্তার বিজয় প্রশ্নবিদ্ধ হয়। কেনিয়াত্তা নিজকে সবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে আখ্যা দিলেও তার জয় কেনিয়ার আদিবাসী ও উপজাতিদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দেয়। ২০১৮ সালে তিনি প্রথমেই কেনিয়ার পুলিশ বাহিনীকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা চালাবেন এরপর বিরোধী দলের সঙ্গে বৈঠকের কাজ হাতে নেবেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত