প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ট্রাম্পের ১ম বছরে যেভাবে বদলে গেল মধ্যপ্রাচ্য

লিহান লিমা: ২০১৭ সালে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর অবস্থানের ব্যাখায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আইএস’ বুলি আন্তর্জাতিক বিশ্বে গ্রহণযোগ্যতা পায় নি। উপরুন্তু জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানীর স্বীকৃতি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম বিশ্বে উত্তেজনা সৃষ্টি করেন ট্রাম্প। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে ট্রাম্প প্রভাবিত করতে পারলেও এই তরুণ যুবা তার হঠকারী সিদ্ধান্তের জন্য আরব বিশ্বে অবস্থান হারান। সংকট ও সমস্যা জিইয়ে রাখার মার্কিন নীতি ট্রাম্পের প্রথম বছরে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব ও রাশিয়ার অবস্থান দৃঢ় করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়।

‘আইএস’ বুলির ব্যর্থতা

২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের পর শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে ধর্মীয় কূটনীতি চালিয়ে প্রভাব বিস্তার করে ইরান। সিরিয়ায়ও ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র বাশার আল আসাদ সরকার টলটলায়মান অবস্থান থেকে অবিশ্বাস্যভাবে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে গেছে। তবে বাশারের পেছনে রয়েছে রাশিয়ার সমর্থন। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি তার সুন্নী রাজনৈতিক দলের সাথে শিয়া সংগঠন হিজবুল্লাহকে নিয়ে সরকার গঠন করেন। ইয়েমেনে শিয়া হুতি যোদ্ধাদের সাথে যুদ্ধে জড়িয়েও সাফল্য অর্জন করতে পারে নি সৌদি আরব। আবার কাতারের ওপর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের অবরোধের পর ইরান, তুরস্ক ও কাতারের মধ্যে মৈত্রী জোট গড়ে উঠে। এতে তেহরান থেকে ভূমধ্যসাগরীয় এলাকা পর্যন্ত ইরান করিডোর বিস্তার করতে সক্ষম হয়।
ইরানের এই পুনঃজাগরণের প্রেক্ষিতে ব্যর্থ হয় মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি। এক্ষেত্রে এই অঞ্চলে ট্রাম্পের আইএসকে পরাজিত করার বুলি কাজে লাগে নি। উপরুন্তু, তার কিছু সিদ্ধান্ত এই অঞ্চলে চরমপন্থাকে উস্কে দিয়েছে।

জেরুজালেম স্বীকৃতি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আগুনে ঘি ঢালেন জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানীর স্বীকৃতি দিয়ে। মাত্র এক সপ্তাহ পরই মুসলিম বিশ্বের নেতারা ইস্তাম্বুলে জরুরি বৈঠক ডেকে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধীতা করে। তুরস্ক, ইরান, জর্ডান এবং কাতারের নেতারা সরাসরি ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখান করেন। ফিলিস্তিন জানিয়ে দেয়, যুক্তরাষ্ট্র দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক শান্তি প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারীর যোগ্যতা হারিয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১২১টি দেশই জেরুজালেম ইস্যুতে ট্রাম্পের জেরুজালেম ঘোষণার বিরুদ্ধে ভোট দেয়।

তার ওপর মধ্যপ্রাচ্যে মিশর, তুরস্ক, জর্ডান এবং সৌদি আরবসহ আটটি মার্কিন দূতাবাসে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কোন রাষ্ট্রদূত নেই। এই অবস্থায়ও ট্রাম্প প্রশাসন অভিজ্ঞ কূটনৈতিক রেক্স টিলারসনের পরামর্শ মানতে নারাজ। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থার জন্য সিএনএন শান্তিদূত ট্রাম্প জামাতা জ্যারেড কুশনারকে দায়ী করে বলে, গোঁড়া ইহুদি কুশনার নিরপেক্ষ কখনই নন, তিনি ও তার পরিবার ইসরায়েলের অবৈধ বসতি বাড়াতে অর্থ সহায়তা করে আসছে এবং তারা ইসরায়েল ও ইহুদিদের সর্বোচ্চ স্বার্থ রক্ষার্থে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

মধ্যপ্রাচ্যের ‘ট্রাম্প ম্যান’

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (৩২) মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র। নিজ দেশে নাটকীয় পরিবর্তনের সূচনা করলেও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভুল হিসেব কষে ফেলেছেন ট্রাম্পের দ্বারা প্রভাবিত এই তরুণ যুবা।
ইয়ামেনের বিধ্বংসী যুদ্ধের জন্য আন্তর্জাতিক বিশ্ব তাকেই দায়ী করে। ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের শাস্তিস্বরুপ সালমানের মদদে সৌদি বাদশাহ কাতারের ওপর অবরোধ জারি করে, উল্টো কাতার, ইরান, তুরস্ক জোট সৌদির মাথা-ব্যথার নতুন কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরিকে চাপ প্রয়োগ করে পদত্যাগে বাধ্য করলেও তিনি এখন পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করে ভাল-ভাবেই দেশ চালাচ্ছেন। সম্প্রতি ফিলিস্তিনি ধনকুবের ও ব্যাংকার সাবিহ আল মাসরিকে সৌদিতে কিছু সময় ধরে আটক রাখার অভিযোগ উঠে সালমানের বিরুদ্ধে। মাসরি ফিলিস্তিন অঞ্চলের একজন প্রধান বিনিয়োগকারী।

আরব বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার এই জোরপূর্বক প্রচেষ্ঠা চালাতে গিয়ে ‘ট্রাম্প ম্যান’ খ্যাত সালমান উল্টো এই অঞ্চলে সৌদি বিরোধী মনোভাব উস্কে দিয়েছেন। ইরানের প্রভাব হ্রাসে জোট বেঁধেছেন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে, ফলে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি প্রক্রিয়া আগের চেয়ে অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রুশ প্রভাব দৃশ্যমান:

এই অঞ্চলে ইরান তার প্রভাব বিস্তার ও অবস্থান দৃঢ় করার সঙ্গে সঙ্গে পূর্বের চেয়ে অধিক ভাবে রাশিয়ার উপস্থিতি বৃদ্ধি পায়। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ইরান, হিজবুল্লাহ ও ইরাককে সঙ্গে নিয়ে বাশার আল আসাদ সরকারকে বিমান ও সামরিক বাহিনী দিয়ে সহায়তা করে বিপর্যস্ত পরিস্থিতি থেকে টেনে তুলেন। এরপর রাশিয়া ন্যাটো সদস্য তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কন্নোয়ন করে। কাজাকস্তানে সিরিয় শান্তি আলোচনার মূল শক্তি হয়ে উঠে মঙ্কো ও আঙ্কারা। রাশিয়ার এই উদ্যোগ সিরিয়াতে কুর্দিদের সমর্থন দেয়া যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মাসল দুর্বল করে দেয়।

সংকট জিইয়ে রাখা:

সত্যি বলতে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতির ধোঁয়াশা নতুন নয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আসাদ সরকারকে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করা নিয়ে ‘রেড লাইন’ জারি করেছিলেন। কিন্তু ২০১৩ সালের আগস্টে সিরিয় সরকার এটি ভঙ্গ করে। ওবামা প্রশাসনও বিরোধীদের সমর্থন না করার পূর্বের প্রতিশ্রুতি ভেঙ্গে আসাদ বিরোধীদের অস্ত্র দেয়, কিন্তু এই সহায়তা আসাদকে পরাজিত করার জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। চরমপন্থার শিকার ও ছিন্নভিন্ন হয়ে সিরিয়ায় সরকারবিরোধীদল এখন প্রায় পরাজয়ের শিবিরে অবস্থান করছে।

ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এই ব্যর্থতা স্বীকার করার সঙ্গে সঙ্গে ইরানকে পারমাণবিক চুক্তি বাতিল করার হুমকি দেয়। জেরুজালেম ইস্যুতে দীর্ঘ দিনের ঝুলিয়ে রাখা আইনেরও ইতি টানে। জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি ইয়ামেন থেকে সৌদি আরবে ইরানের দেয়া ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয় বলে দাবি করেন। ঠিক যেমনটি ২০০৩ সালে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল দাবি করেছিলেন, ‘ইরাকের কাছে বিধ্বংসী অস্ত্র আছে।’ তবে ইরানকে শিক্ষা দেয়ার জন্য হ্যালির এই মিথ্যে মার্কিন নেতৃতাধীন জোট গিলে নি। ওয়াশিংটনের ঐতিহ্যবাহী ইউরোপীয় মিত্ররাও সরে দাঁড়ায়, তারা মধ্যপ্রাচ্যে নিজস্ব মদদে সহিংসতা সৃষ্টি করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবকে দায়ী করে। পশ্চিমা মিত্ররা যখন ওয়াশিংটনের পাশ থেকে সরে দাঁড়ায় ঠিক তখনই রাশিয়া ইরান ও তুরস্কের সঙ্গে আরো গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলে।

সিএনএ বলা হয়, ওয়াশিংটন আসলে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষাক্ত রাজনীতি দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত ও বিভ্রান্ত। এটি মধ্যপ্রাচ্যকেও অপ্রাসঙ্গিক, জঘন্য, পুরোপুরি বিপর্যস্ত অবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সিএনএন আরো বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে ২০১৭ সালের এই ঘটনাগুলো যদি ঘোড়দৌড় বলে মনে করা হয়, ২০১৮ সালে তার লাগাম টেনে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সিএনএন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত