প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এমপির ভূমিকায় ডুবছে বাঁশখালী আ.লীগ

এম এ আহাদ শাহীন : নির্বাচন কর্মকর্তাকে মারধর, সাংবাদিক হয়রানি, টিআর কাবিখা ও কাবিটার প্রকল্পের দুর্নীতির অভিযোগে আলোচনায় থাকার পর দলীয় কোন্দল চরমে থাকায় ফের আলোচনায় এসেছে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর এমপি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী। এমনকি সম্প্রতি (চট্টগ্রাম-১৬) বাঁশখালী আসনে আগামী সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী আবদুল্লাহ কবির লিটনকে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে এমপির বিরুদ্ধে।

বাঁশখালীর সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগামী সংসদ নির্বাচনে (চট্টগ্রাম-১৬) বাঁশখালী আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী তিনজন। তাঁরা হচ্ছেন- বর্তমান এমপি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক ও দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার সম্পাদক মুজিবুর রহমান সিআইপি এবং জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আবদুল্লাহ কবির চৌধুরী লিটন। বর্তমানে তিনজনকে ঘিরে দলের মধ্যে আলাদা বলয়ও সৃষ্টি হয়েছে।

তবে সাংসদ মোস্তাফিজুর রহমান ও জেলা আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল্লাহ কবির লিটনের সমর্থকের মধ্যে দলীয় কোন্দল চরমে পৌঁছেছে। এরই মধ্যে গত ৯ নভেম্বর এই দুই গ্রুপের অনুসারীদের সংঘর্ষে ২৩ জন গুলিবিদ্ধ হয়। সংঘর্ষের তিনদিন পর চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে এমপি মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনেন প্রতিদ্বন্দ্বী মনোনয়নপ্রত্যাশী আবদুল্লাহ কবির লিটন। এই হামলার জন্য এমপির চাচা রশিদ আহমেদ ও পিএস তাজুল ইসলামকে সরাসরি দায়ী করেন তিনি।

অপরদিকে এমপি মোস্তাফিজুর রহমান ও তার অনুসারীরা অভিযোগ করে বলেন, আবদুল্লাহ কবির লিটন বাইরে থেকে সন্ত্রাসীদের এনে বাঁশখালীকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। এছাড়া লিটন ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে ও ২০১৭ সালের ইউপি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। এমনকি লিটন বাঁশখালী আওয়ামী লীগের কেউ না বলেও জানান তারা।

সরেজমিনে খবর নিয়ে ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত দুই বছরে নানা বিতর্কিত কর্মকান্ডের জন্য প্রায়ই পত্রিকার শিরোনাম হয়েছেন সরকার দলীয় এমপি মোস্তাফিজুর রহমান। অপরদিকে আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী আবদুল্লাহ কবির লিটনও সবসময় সন্ত্রাসী ও নিজস্ব ক্যাডারদের মাধ্যমে বাঁশখালীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে নাজুক অবস্থায় নিয়ে গেছেন।

এদিকে সরকারি কর্মকর্তা থেকে সাংবাদিক হয়রানি, দলীয় নেতা-কর্মীদের নির্যাতন ও অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের কারণে বিতর্কও পিছু ছাড়ছে না এমপি মোস্তাফিজুর রহমানের। বর্তমানে বাঁশখালীর ৪১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরি নিয়োগে টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠজনদের বিরুদ্ধে।

এ বিষযে খবর নিয়ে জানা যায়, বাঁশখালীর ৪১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরি কাম প্রহরী পদে নিয়োগের জন্য গত জুলাই মাসে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এসব পদে নিয়োগ দিতে এমপির পিএস ও ঘনিষ্টজনেরা প্রতি বিদ্যালয়ে এক-দুইজন প্রার্থীর কাছ থেকে ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা নিয়েছে।

বেড়িবাঁধ নির্মাণ নিয়েও বাঁশখালী মানুষের আশা গুড়েবালিতে পরিণত হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন উপকূলীয় এলাকার অধিবাসীরা। তারা জানান, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ও তদারকির দায়িত্বে থাকা এমপির অনুসারী দুই চেয়ারম্যানের অনিয়মের কারণে নির্মাণ কাজ শেষ না হতেই বেড়িবাঁধের ব্লকগুলো তলিয়ে যাচ্ছে।

খানখানাবাদ ইউনিয়নের বাসিন্দা ও জেলা যুবলীগ নেতা জাহেদ আকবর বলেন, নিম্ন মানের বালি দিয়ে বেড়িবাঁধের ব্লকগুলো তৈরি করা হয়েছে। যার কারণে কাজ শেষ না হতেই ব্লকগুলো সমুদ্রে ভেসে যাচ্ছে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ও তদারকির দায়িত্বে থাকা লোকজনই এই অনিয়মের জন্য দায়ী। উল্লেখ্য, ২৫১ কোটি ২৯ লাখ টাকা ব্যয়ে বেড়িবাঁধ নির্মাণের এই প্রকল্পটি নেওয়া হয় ২০১৫ সালে।

বাঁশখালীর এমপি মোস্তাফিজুর রহমান কতৃক ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বরাদ্দকৃত টিআর ও কাবিটা প্রকল্পেও অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের টিআর ও কাবিটা প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), চট্টগ্রাম শাখায় অভিযোগ করেন বাঁশখালী এক অধিবাসী। অভিযোগপত্রটি বর্তমানে দুদক চট্টগ্রাম শাখার অনুমোদন হয়ে দুদক চেয়ারম্যানের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে বলে জানিয়েছে দুদকের চট্টগ্রাম কার্যালয়।

অভিযোগপত্রটি থেকে জানা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের টিআর ও কাবিটা ভুয়া ও অস্তিত্বহীন প্রকল্প গ্রহণ করে অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। অভিযোগপত্রটিতে মোট ৪০টি টিআর ও কাবিটা প্রকল্পের দুর্নীতি ও অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়।

এর মধ্যে বাহারছড়া ইউনিয়নে টিআর ক্রমিক নং ১৩,১৬,৯১; শেখেরখীল ইউনিয়নে কাবিটা ২১; পৌরসভা সদরে টিআর নগদ টাকা ৭৪, টিআর ৫১, টিআর ৪৮, টিআর ৮১, টিআর ৫৫; চাম্বল ইউনিয়নে টিআর ৬৫; বৈলছড়ি ইউনিয়নে টিআর ১১৪, টিআর ২৮, কাবিটা ১১; পুইছড়ি ইউনিয়নে টিআর ৭২; সরল ইউনিয়নে টিআর ৪২, টিআর ১২৬, কাবিটা নগদ অর্থ-১৭ প্রকল্পগুলোর কোন অস্তিত্ব নেই বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

এসব অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ ছাড়াও এমপি মোস্তাফিজুর রহমানের আক্রোশের শিকার হয়েছেন নিজ দলীয় অনেক নেতা-কর্মী। এসব নেতা-কর্মীদের মধ্যে আছেন পুঁইছড়ি ইউনিয়নের আবদুল খালেক, বৈলছড়ি ইউনিয়নের লিটন চক্রবর্ত্তী, ছনুয়া ইউনিয়নের মুজিবুর রহমান ও উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি মো. এমরানুল হক প্রমুখ।

বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করার কারণেও বিতর্কিত হয়েছেন এমপি মোস্তাফিজ। তিনি গত বছরের ২২ অক্টোবর দৈনিক পূর্বদেশের সাংবাদিক রাহুল দাশকে হত্যার হুমকি দেন। গত ২২ আগস্টও সাংবাদিকদের শায়েস্তা করার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) অনুরোধ করেন বিতর্কিত এই এমপি।

এসব নেতিবাচক কর্মকান্ড ছাড়াও গত বছরের ১ জুন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে মারধর করে সারাদেশে সমালোচিত হন এমপি মোস্তাফিজুর রহমান। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে পছন্দের লোকজনকে দায়িত্ব না দেওয়ায় এমপি ও তার লোকজন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে বেড়ধক মারধর করেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাঁশখালীর ইউপি নির্বাচনও স্থগিত করা হয়। পরে এই ঘটনায় এমপিকে আসামি করে মামলা করা হয়। সরকারি কর্মকর্তার ওপর স্থানীয় এমপির এই হামলায় সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠে।

দলীয় কোন্দল নিয়ে সাংসদ মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী এই প্রতিবেদককে বলেন, বাশঁখালী আওয়ামীলীগে কিছু দুস্কৃুতিকারী আছে। এরা সারা বছর আওয়ামীলীগ করে কিন্তু জীবনে কোনো দিন নৌকায় ভোট দেয়নি।

বাঁশখালীতে মনোনয়নপ্রত্যাশী আবদুল্লাহ কবির লিটনের নাম উল্লেখ করে সাংসদ মোস্তাফিজ বলেন, ওনার সাথে আছেন নুর হোসেন। ওরা কোনো দিন নৌকায় ভোট দেয়নি। গতনির্বাচনে নেত্রী আমাকে মনোনয়ন দিয়েছেন। কিন্তু তারা আমাকে নৌকায় ভোট দেয়নি।

সাংসদ মোস্তাফিজ বলেন, তারা বিএনপি নেতা জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর বউয়ের আপন বড় ভাই হায়দার আলীকে নিয়ে সাইকেল মার্কায় ইলেকশন করেছে। নৌকায় ভোট দেয়নি। ওরা বছরে ৩৬৪ দিন আওয়ামীলীগ করে আর ভোটের দিন করে বিএনপি।

অনিয়ম, দুর্নীতি ও সাংবাদিক নির্যাতনের বিষয়ে জানতে চাইলে সাংসদ মোস্তাফিজ বলেন, সাংবাদিকদের সাথে আমার কোনো দ্বন্দ্ব নেই। দ্বন্দ্ব হলো রাহুলের সাথে (সাংবাদিক দৈনিক পূর্বদেশ)।

তিনি বলেন, সে যেই পত্রিকায় কাজ করে তার মালিক মুজিবুর রহমান সিআইপি। সিআইপি সাহেব এখন ইলেকশন করবে। সে চাচ্ছে আমাকে অপধস্ত করার জন্য। আমি টিআর কাবিখা, সোলারের জন্য বিভিন্ন কাজ করছি। ওখানে আমি দুর্নীতি করছি বলে পেপারে দিয়েছে। দুদকে দিয়েছে। দুদক দু সপ্তাহ ধারে তদন্ত করেছে। যা আমি জানিও না। পরে দেখি যে দুদক সব জায়গায় চিঠি দিয়েছে। আমাকেও একটা কপি দিয়েছে।

পরে দুদক তদন্ত করে কিছু পাওয়া পায়নি বলে জানান সমালোচিত এই সাংসদ।

সাংসদ মোস্তাফিজ এই প্রতিবেদককে বলেন, আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ থাকলো, আপনার নেগেটিভ নিউজগুলো করেন কিন্তু পজেটিভ নিউজগুলো করেন না। এটাই আমার সাংবাদিকদের কাছে দুঃখ।

দলীয় কোন্দলের বিষয়ে আবদুল্লাহ কবির লিটন বলেন, সাংসদের সাথে আমার আদর্শিক দ্বন্দ্ব আছে। ওনার সাথে আমার ব্যক্তিগত কোনো সমস্যা নেই। জায়গা জমি নিয়েও কোনো বিরোধ নেই।

আদর্শিক দ্বন্দ্বের বিষয়ে জানতে চাইলে লিটন বলেন, সাংসদ মোস্তাফিজ অরজিনালি আওয়ামীলীগের না। হি ইজ এ মাইগ্রেটেড পারসন। ওনি জাতীয় পার্টি করতেন। ওইখান থেকে এখন আওয়মীলীগে। তারপরে কি ভাবে তিনি এমপি হলেন আপনারা সবাই জানেন। এটা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।

দ্বন্দ্ব, দলীয় কোন্দল ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টিতে সাংসদ মোস্তাফিজের ভূমিকার দিকে ইঙ্গিত করে আওয়ামীলীগ নেতা আবদুল্লাহ কবির লিটন বলেন, যিনি দায়িত্বে আছেন তিনিই ত রেসপনসিবল হবেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত