প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ

রবিউল আলম : এই পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বস্তু হচ্ছে পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ। এই কথাটি কে বলেছেন, আমার জানা নাই, তবে একথাটি বিশ্বাস করতাম। পাশাপাশি কিছু প্রশ্ন থাকত মনে, কেন এত ওজন। যে কারো লাশ বহন করতে, কান্দা দিতে ৪ জন মানুষই যথেষ্ট। আমি নিজেও অনেক লাশ বহন করেছি, অনেক লাশের কান্দা দিয়েছি। এমনকি আমার ভাই, বাবা এবং দাদার লাশও আমার কাঁধে বহন করেছি, তেমন কোনো ভার অনুভব করিনি। প্রিয় নেতা জাহাঙ্গির কবির নানক, আলহাজ্ব মকবুল হোসেন, রহমান ভাই অনেক কাছেই শুনেছি পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ অনেক ভারি হয়। ২৬ নভেম্বর রবিবার কেন পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ এত ভারী হয়, সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেলেন নিজের জীবন দিয়ে আমার বড় ছেলে ওমর ফারুক শিশির আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য অঘোষিত নির্দেশ দিয়ে গেলেন। একজন যুবকের হতাশা থেকে কি হতে পারে, কেন একজন মেধাবী ছাত্র সঙ্গদোষের কারণে নিজের জীবনকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য মনে করে, কত সহজভাবে নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিতে পারে।

একজন জীবন দানকারী বিপদগ্রস্থ পিতা তার সন্তানের নিথর দেহ নিয়ে কিভাবে চিকিৎসার জন্য চিকিৎসালয়ের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, কত কাকুতি-মিনতি করতে হয়। আমার বড় ছেলে হতাশা থেকে কিছু ঘুমের ঔষধ জাতীয় কিছু একটা খেয়ে ফেলেন, প্রায় ৬/৭ ঘণ্টা পরে আমরা টের পাই, তখনো জানিনা কি খেয়েছে। রাত ১২টায় মেডিকেল কলেজে নিয়ে যেতে সক্ষম হই। কিছু চিকিৎসা করার পরে ডাক্তার আইসিইউ-র কথা বলেন। আমার পূর্ব কিছু অভিজ্ঞতায় ভাবলাম এখানে আইসিইউ রোগী মড়ার আগে আইসিও পাওয়া যাবে না, আমি ছেলেকে নিয়ে অসহায়ের মতো বাংলাদেশ মেডিকেলে আসলাম। সেখানে কর্তৃপক্ষ রোগী গ্রহণ করলেন না, পুলিশ কেসের জন্য। রাস্তায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করছি, এর আগে আরও কয়েকটি হাসপাতালের দ্বারস্ত হয়েছিলাম। হাসপাতালের একজন কর্মচারী আমাকে উপদেশ দিলেন, ইবনে সিনায় নিতে। তার কথামত ইবনে সিনায় নিয়ে গেলাম, সেখানেও একই কথা, পুলিশ কেস নেওয়া যাবে না।

পাঠক অনুমান করুন, আমি একজন পিতা, আমার চোখের সামনে আমার সন্তান মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে, আমি কিছুই করতে পারছি না। ধানমন্ডি এলাকায় বসবাস করেও অগনিত চিকিৎসালয় থাকা সত্বেও আইনী জটিলতার কারনে আমি চিকিৎসা করাতে পারছি না। পরবর্তীতে জানতে পারলাম, স্থানীয় থানায় একটি জিডি থাকলে চিকিৎসা করাতে কোনো আপত্তি থাকে না। নিরুপায় হয়ে ইবনে সিনার ডাইরেক্টর আনিস সাহেবকে ফোন করলাম, উনি তখন কক্সবাজার থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন, সেসময় তার গাড়ি ফেনী ছিল। আমার কান্না বিজড়িত কন্ঠে বললাম, স্যার আমার ছেলেটাকে বাঁচান, আমি সবকিছুই করব, কাগজে বন্ডসই দিলাম, চিকিৎসা শুরু হলো। বেলা ২টায় জানতে পারলাম, ডায়ালাইসিস করতে হবে, রক্তে বিষ মিশে গেছে। ইবনে সিনায় এই মেশিন নেই। ৩টায় রেনেসা হাসপাতালে নিয়ে গেলাম, রাত ৯টায় ডায়ালাইসিস শুরু হলো, প্রতিদিন ৭৫,০০০/- (পঁচাত্তর হাজার) টাকা চুক্তিতে ১২ ঘণ্টা ডায়ালাইসিস হওয়ার পরে প্রেসার নেই, আর ডায়ালাইসিস করা গেল না, আমার চোখের সামনে ধীরে ধীরে আমার ছেলের মৃত্যু হলো, ১ লক্ষ ১৭ হাজার টাকা বিল নেওয়া হলো মেডিসিনের বিল ছাড়া।

প্রশ্ন টাকার নয়, আমার টাকা আমার ছেলের জীবন বাঁচাতে পারল না। যারা টাকার পিছনে হাকডাক করেন তাদের জন্য একথা বলছি। সরকারের কাছে অনুরোধ, আমার ছেলেকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। আর কোনো বিপদগ্রস্থ পিতার করুন অবস্থা যাতে আমার মতো না হয়। পুলিশ কেস হতে পারে এ অযুহাতে চিকিৎসা করতে যাতে কোনো তালবাহানা না হয়। ডাক্তারদের চিকিৎসা করতে হাত বাধা না থাকে। বন্ডসই করলেই চলে। চিকিৎসার অভাবে অনেক সন্তানের জীবন আমরা বাঁচাতে পারছি না, একটি আইনের অযুহাতে। জিডি ও পুলিশ ইনফরমেশন বাধ্যতামূলক ভাবে থাকবে। কিন্তু চিকিৎসা করার ক্ষেত্রে কোনো বাধা থাকতে পারবে না। সরকার এই হুকুম না দিলে আমার মতো আরও অনেকের সন্তানরে লাশ কাঁধে নিতে হবে। জাহাঙ্গির কবির নানকের মতো অনেককেই সন্তানহারা হতে হবে। সন্তানের বিষাক্ত দেহ নিয়ে হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরতে হবে।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতি
সম্পাদনা : মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত