প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডিএমপির ৪৯ থানায় ঘুরেফিরে ওরাই ওসি

ডেস্ক রিপোর্ট : ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ৪৯টি থানার সমন্বয়ে গঠিত। এই ৪৯ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা (ওসি) যেন রাজধানীতেই স্থায়ী পোস্টিং পেয়ে গেছেন। বিভিন্ন ঠুনকো যুক্তি, নির্দিষ্ট এলাকার প্রভাব কিংবা তদ্বির করে ৬-৭ বছর ধরে একই ব্যক্তিরা ঘুরেফিরে বিভিন্ন থানায় দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে, ৫ থেকে ১০ বছর ধরে একই জায়গায় থেকে পদোন্নতি পেলেও বদলি নেই! বদলির আদেশ আসার পরও রহস্যজনক কারণে তা থমকে যায়। যদিও পুলিশ প্রবিধানে স্পষ্ট বলা আছে, কোনো পুলিশ সদস্য ২ বছর এক স্থানে থাকতে পারবেন না।

আবার দেখা যায়, গুরুতর অপরাধে কেউ শাস্তি হিসেবে অন্য জেলায় বদলি হলেও পরবর্তী সময়ে আবার ডিএমপিতে ফিরে আসেন। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে একই জায়গায় অবস্থান করলে ওই এলাকার অপরাধী এবং প্রভাবশালীদের সঙ্গে এক ধরনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়। এতে করে ওই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার সমূহ আশঙ্কা থাকে।

সর্বশেষ ডিএমপির বদলি লক্ষ্য করলে দেখা যায় ওসিদের কত শক্ত সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর ডিএমপির সদর দপ্তরের আদেশে রাজধানীর চার থানার ওসি বদলি করা নিয়ে শুরু হয় বিভিন্ন ধরনের গুঞ্জন। কেউ কেউ বলেন, ওসিরা এতটাই ক্ষমতাধর, তারা যখন যে থানা চাইবেন সেখানেই দায়িত্ব দিতে হবে। যে কারণে ওসি পরিবর্তন নিয়ে ১০ সেপ্টেম্বরের একটি আদেশ পরিবর্তন করতে বাধ্য হয় ডিএমপি সদর দপ্তর।

ডিএমপির সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, পুলিশ প্রবিধানে স্পষ্ট বলা আছে, কোনো পুলিশ সদস্য দুই বছর এক স্থানে থাকতে পারবেন না। তবে বিশেষ প্রয়োজনে কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করলে সময়ের মেয়াদ কিছু দিন বাড়াতে পারে। কিন্তু নির্দিষ্ট সময় পর ওসি পরিবর্তন করতে গেলে উপর থেকে বিভিন্ন ধরনের চাপ আসে। অতীতে এসব ওসির বেশির ভাগ বিএনপির মতাদর্শে বিশ্বাস করলেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এরা রাতারাতি সাইনবোর্ড পরিবর্তন করে নিজেদের বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক বলে প্রচার শুরু করেন। এ কারণে ওসিদের পরিবর্তন করতে গেলেই ডিএমপির শীর্ষ কর্মকর্তারা অনেকটা বেকায়দায় পড়ে যান।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, রমনা মডেল থানার ওসি মাইনুল ইসলাম আগে খিলগাঁও থানার ওসি ছিলেন। শাহবাগের আবুল হাসান আগে কোতোয়ালিতে, ধানমন্ডির ওসি লুৎফর রহমান ডিবিতে, হাজারীবাগের মীর আলিমুজ্জামান একসময় ডিবিতে, নিউমার্কেটের আতিকুর রহমান ক্যান্টনমেন্টে, কলাবাগানের ইয়াসির আরাফাত নিউমার্কেটে, লালবাগের সুবাস কুমার পাল হাজারীবাগের ইন্সপেক্টর (তদন্ত), কোতোয়ালির এ বি এম মশিউর রহমান তেজগাঁওয়ের ইন্সপেক্টর (তদন্ত), কামরাঙ্গীরচরের মো. শাহিন ফকির আগে রূপনগর ও শাহবাগে ইন্সপেক্টর তদন্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। চাকরি জীবনে ডিএমপি থেকে বদলি হতে হয়নি তাকে। চকবাজারের শামীম অর রশীদ তালুকদার দক্ষিণখানে, বংশালের শাহিদুর রহমান ডিবিতে, সূত্রাপুরের কে এম আশরাফউদ্দিন খিলক্ষেতে ইন্সপেক্টর (তদন্ত), ডেমরার এস এম কাউসার আহমেদ ২ বছরের বেশি সময় ধরে কর্মরত, শ্যামপুরের মীজানুর রহমান মিরপুরে ইন্সপেক্টর (তদন্ত), যাত্রাবাড়ীর আনিছুর রহমান ডিবিতে, কদমতলী থানার ওসি এম এ জলিল বাড্ডায়, গেণ্ডারিয়ার কাজী মিজানুর রহমান ডিবিতে, ওয়ারীর রফিকুল ইসলাম আগে পল্টনে ওসি ও রামপুরায় ইন্সপেক্টর (তদন্ত) ছিলেন, মতিঝিলের ওমর ফারুক মুগদায়, পল্টনের ওসি মাহমুদুল হক ডিবিতে, সবুজবাগের আবদুল কুদ্দুস ফকির বংশালে, খিলগাঁওয়ের মশিউর রহমান রমনায়, রামপুরার প্রলয় কুমার সাহা পল্টনের ইন্সপেক্টর (তদন্ত), শাহজাহানপুরের সফিকুল ইসলাম মোল্যা ডিবিতে, মুগদার এনামুল হক ডিবিতে, তেজগাঁওয়ের মাজহারুল ইসলাম আগে কদমতলীতে থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে তেজগাঁওয়ে রয়েছেন, মোহাম্মদপুরের জামাল উদ্দিন মীর আগে ঢাকার পাশে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে থাকলেও একসময় ডিবিতে ছিলেন, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের মীজানুর রহমান ডিবিতে, আদাবরের শেখ শাহিনুর রহমান ডিএমপিতেই, শেরেবাংলা নগরের গণেশ গোপাল বিশ্বাস ডিবিতে, মিরপুরের নজরুল ইসলাম ভাষানটেকে, পল্লবীর ওসি মাদারীপুরের দাদন ফকির, শাহআলীর আনোয়ার হোসেন আগে ধানমন্ডিতে থাকলেও ২০০০ সাল থেকে ডিএমপিতেই কর্মরত, কাফরুলের ওসি গোপালগঞ্জের সিকদার মুহাম্মদ শামীম হোসেন, দারুস সালামের সেলিমুজ্জামান শাহআলীতে, রূপনগরের সৈয়দ সহিদ আলম আগে গেন্ডারিয়ায় ও ডিবিতে, ভাষানটেক থানার ওসি মুন্সি সাব্বির আহম্মেদ শেরেবাংলা নগরের ইন্সপেক্টর (তদন্ত), গুলশানের আবু বকর সিদ্দিক শাহবাগে, বাড্ডার ওয়াজেদ আলী কদমতলীতে, ক্যান্টনমেন্টের মাহবুবুর রহমান নিউমার্কেটের ইন্সপেক্টর (তদন্ত), খিলক্ষেত থানা ওসি শহিদুল হক আগে পল্টন, আদাবর ও তেজগাঁওয়ে, ভাটারার এস এম কামরুজ্জামান রাজধানীর নিকটস্থ সাভারে, বনানীর বি এম ফরমান আলী বিমানবন্দর ও মতিঝিলে, উত্তরা পূর্ব থানার নূরে আলম সিদ্দিকী বংশালে, তুরাগের নুরুল মুক্তাকিম ভাটারা, লালবাগ ও ডেমরায় ছিলেন, দক্ষিণখানের তপন চন্দ্র সাহা ওয়ারী, উত্তরখানের হেলাল উদ্দিন ধানমন্ডিতে, বিমানবন্দরের নূরে আযম মিয়া আগে ধানমন্ডি ও গুলশানে, উত্তরা পশ্চিম থানার আলী হোসেন খান আগে উত্তরা পূর্ব থানার ওসি ছিলেন।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহ্দীন মালিক বলেন, একই থানায় অবস্থানের ক্ষেত্রে যে আইন রয়েছে সেটা অবশ্যই মানা উচিত। পুলিশই যদি আইন না মানে তাহলে আইন মানবে কে? এ ক্ষেত্রে বর্তমান আইন অবশ্যই মানতে হবে। আর যদি পুলিশ মনে করে, আইন পরিবর্তন করা উচিত তাহলে তারা সেটাও করতে পারে। এক প্রশ্নের উত্তরে বিশিষ্ট এই আইনজীবী বলেন, সাধারণত এক স্থানে তিন বছরের বেশি সময় না থাকার যে প্রশাসনিক নীতি রয়েছে, তা উপেক্ষিত হতে পারে দুই কারণে। প্রথমত, দলীয় আনুগত্য, দ্বিতীয়ত অর্থের বিনিময়। স্পষ্টত একটি বাহিনীর এত অধিক সংখ্যক কর্মকর্তার বেলায় দুই বছরের বেশি সময় ধরে এক জায়গায় থাকার জন্য নিয়ম যখন লঙ্ঘিত হয়, সেটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হয়নি বললে ভুল হবে না।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক শিফা হাফিজা বলেন, পুলিশের মতো একটি সংবেদনশীল বাহিনীতে এটা অবশ্যই অনিয়ম। অতীতে একই স্থানে তিন বছরের বেশি সময় পুলিশ বাহিনীর কর্মকর্তারা অবস্থান করতেন না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে দলীয় এবং আঞ্চলিকতার প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একই স্থানে অবস্থান করছেন। এটা কোনোভাবেই পুলিশ বাহিনীর জন্য শুভকর নয়।

এর ক্ষতিকর দিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করলে সেখানে শেকড় বিস্তার ঘটবে এটাই স্বাভাবিক। ফলে ওই কর্মকর্তার অপরাধী ও প্রভাবশালীদের সঙ্গে এক ধরনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় এবং পক্ষপাতিত্বের বিষয়টি জোড়ালোভাবে কাজ করে। এতে করে ওই এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার সমূহ আশঙ্কা তৈরি হয়। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী বদলি করলে এ ধরনের কোনো আশঙ্কা থাকবে না বলেও জানান তিনি।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি সুলতানা কামাল বলেন, কোনো এলাকায় যদি কোনো কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে থাকেন তাহলে ওই এলাকার মানুষের সঙ্গে তার একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি হয়। তখন তিনি আর নৈর্ব্যক্তিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। এ জন্য সময়মতো বদলি করাই উচিত। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমার মনে হয়, নির্দিষ্ট এলাকায় কোনো কর্মকর্তা নিজে থাকছেন না। তাদের রাখা হচ্ছে। সুতরাং কারা কি কারণে তাদের একই এলাকায় রাখছেন সেগুলো তদন্ত করে দেখা উচিত। ভোরের কাগজ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত