প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ঘোরা কি নিষিদ্ধ?

শান্তনু চৌধুরী : ব্যক্তি স্বাধীনতা ভোগ করার মধ্যে একটি নিগূঢ় আনন্দ আছে। এই আনন্দই বলে দেয়, সে তার দেশে কতটা শান্তিতে রয়েছে। একজন নাগরিকের অধিকার যখন নিশ্চিত হয় তখনই সে তার দেশের গণতন্ত্রকে উপভোগ করতে পারে। আমরা কথায় বলি, অপার সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ, সবুজ শ্যামল সুন্দর বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশকে ঘিরে আমাদের কতই না অহংকার। তার কারণ প্রকৃতি আমাদের দিয়েছে অকৃপণভাবে। কিন্তু আমরা যেটা পারছি না তা হলো এই সৌন্দর্যকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে। কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের সৌন্দর্য তুলে ধরতে ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ নামে একটি প্রচারও চালানো হয়েছিল পর্যটন কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে। বাংলাদেশ বিউটিফুল এতে কোনও সন্দেহ নেই, তেমনি একমণ দুধের মাঝে যেমন একটি গো-চনা যথেষ্ট তেমনি অপার সৌন্দর্যের মাঝে দুয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাও মনকে নষ্ট করে দিতে যথেষ্ট।

এত কথা বলার কারণ কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে টুরিস্ট পুলিশের হাতে দম্পতি লাঞ্চিত হওয়ার ঘটনাটি। ঘটনাটি অনেকে ইতোমধ্যে জেনে ফেলেছেন, এরপরও আলোচনার সুবিধার্থে সংক্ষেপে মনে করিয়ে দেই। কক্সবাজার শহরের বিজিবি ক্যাম্প এলাকার বাসিন্দা কায়দে আজম রাত ৮টার দিকে স্ত্রীসহ সৈকতের লাবণী পয়েন্টে পর্যটক চেয়ারে বসেছিলেন। এ সময় এএসআই মো. মাসুদসহ তিন পুলিশ সদস্য এসে পরিচয় জানতে চান। তারা নিজেদের স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দেওয়ার পরও মিথ্যা বলছে মন্তব্য করে ধমকাতে থাকেন এবং এক পর্যায়ে বাড়ি থেকে স্বজনদের এনে পরিচয় নিশ্চিত করতে বলেন। নইলে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করার হুমকি দেন। এ সময় পুলিশ তাদের কাছে কাবিননামা দেখতে চায়। কাবিননামা দেখাতে না পারলে তাদের থানায় নিয়ে যাওয়া হবে বলে জানায় পুলিশ। কোনও দম্পতি কাবিননামা সঙ্গে রাখে কিনা এমন প্রশ্নে আরও ক্ষেপে যায় পুলিশ এবং তাদের প্রায় দুই ঘণ্টা আটকে রাখে বলে কায়েদে আজম নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে করা অভিযোগে জানান। পরে অবশ্য ওই পুলিশ সদস্যকে ক্লোজড করা হয়েছে। এরপর আর শাস্তি হবে কিনা সন্দেহ থেকে যায়। স্ত্রীর সামনে নাজেহাল হওয়ায় আজম সাহেব কতটা অপমানিত বোধ করেছেন সেটা নিশ্চয় ভুক্তভোগীরা জানেন।

নিশ্চয় ভাবছেন, এটা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এমন দুয়েকটাতো হতেই পারে। বিশেষ করে টুরিস্ট পুলিশের ফেসবুক পেজেও এমন কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে এও বলা হচ্ছে, টুরিস্ট পুলিশ আছে বলেই এখন রাতে সৈকতে যাওয়ার সাহস পাচ্ছেন। এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বললে ভুল বলা হবে, সব সংবাদ সংবাদ মাধ্যমে আসে না বা প্রচারও হয় না কারণ কায়েদে আজমের মতো কেউ অভিযোগ করেন না। আমি ধরে নিলাম যেদিন সৈকতে যারা বসেছেন তারা স্বামী-স্ত্রী নন। তারা প্রেমিক- প্রেমিকা বা বন্ধু। তাহলে কি আমাদের দেশে প্রেমিক, প্রেমিকারা ঘুরতে পারবে না। বা বন্ধু-বান্ধবীরা (এখানে আমি বান্ধবী কথাটা লিখতে চাইনি, বোঝার সুবিধার্থে লিখতে হলো) ঘুরতে বা রাতে আড্ডা দিতে পারবে না? প্রশাসনের কিছু কিছু কর্মকাণ্ডে মনে হয় ছেলে-মেয়েরা একসঙ্গেই ঘোরা যেন অপরাধ। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় প্রেম করতে গিয়ে পুলিশ বা বখাটেদের হাতে নাজেহাল হওয়ার ঘটনার অভিজ্ঞতা সবারই কম বেশি আছে। কারও কারও হয়তো তিক্ত অভিজ্ঞতাও রয়েছে। আমার পরিচিত অনেকে বলেছেন, পুরো বাংলাদেশে কোথাও যেন শান্তিতে প্রেম করার জায়গা নেই। ভিখারি থেকে শুরু করে পুলিশ সবাই উৎপাত করবেই। এছাড়া সমবয়সী বন্ধু-বান্ধবীরা মিলে ঘুরতে গেলেও একই অবস্থা। অনেকটা নচিকেতার ভাষায় বলতে গেলে, ‘প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া এই দেশে অপরাধ, ঘুষ খাওয়া কখনওই নয়’। বাংলাদেশের যে কোনও পর্যটন স্পটে যান সেখানে কোনও না কোনওভাবেই হেনস্থা হতে হবেই। আর যদি সঙ্গে বিপরীত লিঙ্গের কেউ থাকে তবেতো বিব্রত হওয়ার মতো অবস্থা। কেনরে ভাই, ছেলে-মেয়েরা প্রেম করবে, একজন আরেকজনের সঙ্গে মিশবে এটাইতো স্বাভাবিক। একটা সময়ে আনন্দময় কাটাবে, রোমাঞ্চ করবে, জীবনে বেঁচে থাকার মানে খুঁজে নেবে সেটার মধ্যে অস্বাভাবিকতা কোথায়? বিএনপি সরকারের সময় তখন আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম। ভ্যালেন্টাইন ডে নিয়ে বেশ মাতামাতি বিশ্ববিদ্যালয়ে। গাজী জসীম নামে একজন তখন ডিএমপির গোয়েন্দা পুলিশ প্রধান। সেদিন শহরের বটতলি স্টেশন থেকে শুরু করে কোথাও কোনও জোড়ায় জোড়ায় ছেলে-মেয়েকে বসতে দেয়নি পুলিশ। বিশ্ববিদ্যালয়ে সেটা নিয়ে প্রতিবাদ হয়েছিল।

শুরুতে যেটা বলছিলাম, সুজলা, সুফলা শস্য শ্যামলা এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না। এটা মনেপ্রাণে আমরা বিশ্বাস করি। দেশের পর্যটন স্পটগুলো ঘুরে সেকথা মনে হয়। মনে হয়, ইশ এতো সুন্দর জায়গা আমরা যদি আরও সুন্দর করে উপস্থাপন করতে পারতাম তবে কতই না বিদেশি পর্যটক আকৃষ্ট হতো। দেশের আয় বাড়তো। কিন্তু আমরা মনে হয়, প্রকৃতির দানকে তুচ্ছ করে দেশটাকে পর্যটক বিমুখ করে তুলছি আমরা। কথাটা এই কারণে বলা, কক্সবাজারে পর্যটক হেনস্থার ঘটনা যখন বিদেশি গণমাধ্যমে স্থান পায় তবে সেটা বিদেশি পর্যটকদের কানে যাবেই। তাহলে তারা কি আর এদেশে ঘুরতে আসতে চাইবে? থাইল্যান্ডে গিয়ে একবার সেখানে যতো বিদেশিদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে তাদের বলেছি, ‘তোমরা বাংলাদেশে আসো, আমাদের দেশটা অনেক সুন্দর।’ তাদের বেশির ভাগেরই উত্তর ছিল, ‘তোমাদের দেশ নিরাপদ কি? শুনেছি তোমাদের দেশ নিরাপদ নয়।’ কথাটা অনেকাংশে সত্য বটে! এই যে রোহিঙ্গারা আসার পর কক্সবাজার নিয়ে সবাই বেশ শংকায় ছিল। সেই শংকা যে এখনও কেটেছে তা নয়। এরপরও বলা যায়, প্রাথমিক শংকা কাটিয়ে এখন পর্যটক বেড়েছে। কিন্তু ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা বেড়েছে। নভেম্বর থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৫টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে বলে সংবাদ এসেছে। এর মধ্যে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে একজনের মৃত্যুও হয়েছে। এসব ঠেকাতে তৎপর না হলে পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নেবে।

আমাদের দেশে এমনিতে পর্যটন স্পটগুলো নানা অব্যবস্থাপনায় ধুঁকছে, হোটেল-মোটেল থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট কোনওটাই পর্যটকবান্ধব নয়। এছাড়া রয়েছে দূষণ, দখল ও চুরির মতো ঘটনাও। যেমন উদাহরণ দিয়ে বলতে পারি, আমাদের আহসান মঞ্জিল কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমেরিয়ালের মতোই আকর্ষণীয়। কিন্তু তারা যেভাবে ভিক্টোরিয়াকে উপস্থাপন করতে পেরেছে আমরা পারিনি। আমাদের দেশে টুরিস্ট পুলিশ গঠনই করা হয়েছিল পর্যটকদের স্বার্থে। এখন তারাই যদি ভক্ষক হয় তবে জনগণ কার কাছে যাবে। বলছি না যে, পর্যটকরা সবাই ভালো, পর্যটক সেজে খুন, ধর্ষণের মতো ঘটনাও ঘটছে। কিন্তু কে বউ নিয়ে ঘুরবে, কে বান্ধবী বা প্রেমিকা নিয়ে ঘুরবে সেটা দেখা নিশ্চয় পুলিশের দায়িত্ব নয়। আর এটা নিশ্চয় সৌদি আরব বা আফগানিস্তান বা পাকিস্তান না যে নারীদের স্বাধীনতা নেই। কে কার সাথে ঘুরবে, কি পোশাক পরবে সেটা মানুষের ব্যক্তি অধিকার। সেটা যতক্ষণ পর্যন্ত অপরাধের পর্যায়ে না যাচ্ছে ততক্ষণ পুলিশ কেনও মাথা ঘামাবে? সৌদি আরবের কথা যখন উঠলো প্রাসঙ্গিক বিবেচনা করে আরও একটি কথা যোগ করি, পর্যটন ভিসা চালু করার পরিকল্পনা অনুমোদন দিয়েছে সৌদি আরব। তারা চাচ্ছে সেদেশেও পর্যটক যাক। নতুন যুবরাজ সালমান বুঝতে পারছেন, শুধুমাত্র তেল আর পবিত্র তীর্থস্থানের আয় দিয়ে টিকে থাকা সম্ভব না। তাই তিনি দেশে বেশ কিছু পরিবর্তন আনছেন। সে যাত্রায় বৈধতা দেওয়া হয়েছে নারীদের গাড়ি চালানো, নির্বাচনে দাঁড়ানো। কঠোর ধর্মীয় অনুশাসনে বাঁধা সৌদিতে বাণিজ্যিক সিনেমা হল চালানোর অনুমতিও মিলেছে। আর্ট ফেস্টিভাল থেকে শুরু করে লাইট শো এমনকি মিউজিক কনসার্টেরও অনুমতি মিলছে। সৌদিজুড়ে প্রায় ৯টি জাদুঘর ও ঐতিহ্য স্থাপনা প্রকল্পের জন্য চুক্তি সই করেছে সৌদি সরকার। তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে যুবরাজ সালমান নানামুখী পরিকল্পনা নিচ্ছেন। এর মধ্যে পর্যটন অন্যতম। সৌদি আরব যদিও আমাদের আর্দশ নয়, তবুও উদাহরণটি এই কারণে দিলাম যে তারা কুপমণ্ডুকতা ঝেড়ে ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হচ্ছে। আর এসব কিছুর সূচনা হচ্ছে পর্যটনের বিকাশের মাধ্যমে। আমাদেরতো নিজেদের কিছু তৈরি করতে হবে না, প্রকৃতিগতভাবেই আমরা সমৃদ্ধ। শুধুমাত্র নিরাপত্তা আর একটু নান্দনিক বিন্যাস আমাদের পর্যটনখাতকে নিয়ে যেতে পারে বহুদূর। শুধুমাত্র লক্ষ্য রাখতে হবে এসআই মাসুদের মতো কিছু লোক যেন সেটাতে বাগড়া দিতে না পারে।

লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক। বাংলাট্রিবিউন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত