প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নিখোঁজ ব্যক্তিদের অপহরণকারী কারা
নানা প্রশ্ন, সমাধান অধরা

তারেক : নিখোঁজ বা গুম হওয়া ব্যক্তিদের অপহরণকারী কারা? অপহৃত ব্যক্তিদের উদ্ধার কিংবা গ্রেফতার করতে পারছে না কেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী? তাহলে কি সর্ষেই ভুত! তা না হলে নিখোঁজ, অপহরণ বা গুম হওয়া ব্যক্তিদের মাসের পর মাস নিরাপদ আস্তানায় রেখে থাকা, খাওয়া-দাওয়ার খরচা করে মুক্তিপণের টাকা আদায় না করেই আবার নিরাপদে ফিরিয়ে দেয়ার ঘটনাগুলো খুবই রহস্যজনক, যা নিয়ে সর্বমহলেরই একই ধরনের অভিন্ন প্রশ্ন। দেশে বিভিন্ন সময় নিখোঁজ হয়েছেন অনেক ব্যক্তি। এদের মধ্যে সম্প্রতি কয়েকজন ফিরেও এসেছেন। এতে স্বস্তি ফিরেছে ওইসব পরিবারের স্বজনদের বুকে। কিন্তু যারা এখনও ফেরেনি তারা কি বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন। এ নিয়ে নিখোঁজ পরিবারের সদস্যদের উৎকন্ঠার শেষ নেই।
নিখোঁজ থাকার পর যারা ফিরেছেন তাদের কাছেও মিলছে না কোনো তথ্য। অপরহরণকারীদের ব্যাপারে তেমনভাবে মুখও খুলছেন না তারা। ফলে কারা তাদের অপহরণ করেছিলেন, নিখোঁজের দিনগুলোতে তারা কোথায় ছিলেন, কেনই বা আটকের পর আবার ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে এমন সব প্রশ্নের কোনো উত্তর মিলছে না। সংগত কারণে রহস্যেঘেরা থাকছে অপহরণকারীদের তুলে নেওয়া ও ফিরিয়ে দেওয়ার তথ্য।

এ বছরের গত ৪ মাসে যে ১২ জন নিখোঁজ হয়েছিলেন তার মধ্যে ৯ জনই ফিরে এসেছে। অথচ ফিরে এসে সত্যি কথাটা বলার মতো সাহস নিয়ে মুখ খুলতে চান না কেউই। অজানা এক ভয়, আতঙ্ক, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা অবসানের পর ফিরে আসা ৯ জনের প্রায় সবার পরিবারই যেন ফিরে আসার ঘটনায়-ই সন্তুষ্ট, খুশিতে আনন্দিত। এখনও নিখোঁজ হওয়া ৩ জন ফিরে আসার অপেক্ষায় স্বজনরা।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘হার্ট এ্যাটাক’, ‘ক্রস ফায়ার’-নিখোঁজ থাকার পর যারা ফিরে আসছেন সেই তাদের ‘টাকার দাবি’র গল্পগুলোর ধরন মোটামুটি একই, অনেকটা সাজানো নাটকের মতোই। গত তিন দিনের ব্যবধানে ফিরে এসেছেন সাংবাদিক উৎপল দাশ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোবাশ্বের হাসান সিজার ও সর্বশেষ ফিরে আসার পর গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে কল্যাণ পার্টির সাধারণ সম্পাদক আমিনুর রহমানকে। এখনও যারা ফিরে আসেননি তার মধ্যে আছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান, কানাডার ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ইশরাক আহমেদ ও বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও এপিবিএন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সৈয়দ সাদাত আহমেদ। তারা কবে কোথা থেকে কিভাবে ফিরে এসে অন্যদের মতোই আবার সেই সাজানো গল্প বলবেন?

গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘হার্ট এ্যাটাকের’ ঘটনা দিয়ে তুলে নেয়ার গল্পের শুরু। ১৯৯৬ সালের ঘটনা। বিএনপি সরকার গঠন করেছে। দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটল তখন। সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে গঠন করা হলো যৌথ বাহিনী। দেশব্যাপী শুরু করা হলো সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা। যৌথ বাহিনী হেফাজতে মারা গেলেই তখন বলা হতো ‘হার্ট এ্যাটাকে’ মৃত্যুর গল্প। যতদিন যৌথ বাহিনীর সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা অব্যাহত ছিল ততদিন হার্ট এ্যাটাকের গল্প ছিল সবার মুখে মুখে। যৌথ বাহিনীর সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনার সমাপ্তি ঘটাতে এলিট ফোর্স র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (র‌্যাব) গঠন করল বিএনপি। বিএনপির সরকারের সময়ে র‌্যাবের অভিযান জালে। তাদের জালে যারাই আটকা পড়ত তখন বলা হতো ‘ক্রসফায়ারে’ মারা গেছে। ‘ক্রস ফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যাওয়ার গল্প এখনও অব্যাহত আছে, তবে কমে গেছে। এখন আবার বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিখোঁজ বা গুম হওয়ার ঘটনা ঘটছে। এই ধরনের ঘটনার পর যারা ফিরে আসছে তাদের জন্য তৈরি হয়েছে আরেক গল্প, যা ভয়ার্ত চোখে মুখ খোলা বন্ধ থাকার এক পর্যায়ে বলা হচ্ছে, ‘টাকা দাবি’। এসব গল্প তোতা পাখির মতো শেখানো বুলির মতোই, যা সমালোচকদের ভাষায় সাজানো নাটক বলে অভিহিত।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত কয়েক মাসে ‘অপহৃত-নিখোঁজ’ ব্যক্তিদের সন্ধান দাবিতে সভা-সেমিনার ও মানববন্ধন করেছেন স্বজনরা। কোনও কোনও নিখোঁজ ব্যক্তির শিশুসন্তানও গণমাধ্যমের সামনে আহাজারি করেছে। কিন্তু কোনও দিক থেকেই আশার কথা শুনতে পাননি এই স্বজনরা। তবে দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহরের মধ্যেই এবার নতুন প্রত্যাশা জেগে উঠেছে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে অপহৃত বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মুবাশ্বার হাসান সিজার ও তরুণ সাংবাদিক উৎপল দাস ও কল্যাণ পার্টির সাধারণ সম্পাদক আমিনুর রহমান ফিরে আসায় আপনজন ফিরে পাওয়ার নতুন স্বপ্নে বুক বাঁধছেন বাকি অপহৃতদের স্বজনরা। তারা বলছেন, শীঘ্রই হয়তো বাড়ির দরোজায় কড়া নাড়বেন হারানো স্বজন। অপহৃত কয়েক ব্যক্তির স্বজনদের সঙ্গে আলোচনা করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

গত চার মাসে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে রহস্যজনকভাবে ‘অপহৃত’ ও ‘নিখোঁজ’ হন ১২। এর মধ্যে ৯ জন ফিরে এসেছেন। বাকি ৩ জনের এখনও সন্ধান মেলেনি। যারা ফিরে এসেছেন, তারা হলেন, ব্যাংক এশিয়ার এভিপি শামীম আহমেদ, বাংলাদেশ জনতা পার্টির (বিজেপি) সভাপতি মিঠুন চৌধুরী ও দলটির কেন্দ্রীয় নেতা অসিত ঘোষ অসিত, বেলারুশের অনারারি কনস্যুলার অনিরুদ্ধ কুমার রায়, দক্ষিণ বনশ্রীর নকিয়া-সিমেন্সের সাবেক প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান আসাদ, অ্যাভেনটিস-সানোফির ফার্মাসিস্ট জামাল রহমান, শাজাহানপুরের ফল ব্যবসায়ী গিয়াসউদ্দিন, গুলশানের প্রকাশক তানভীর ইয়াসিন করিম, সাংবাদিক উৎপল দাশ ও মুবাশ্বার হাসান সিজার ও কল্যাণ পার্টির আমিনুর রহমান। জনকণ্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত