প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বর্তমান শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ নেপালের চেয়েও কম : সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

মারুফ হাসান নাসিম : আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা দিন দিন ভঙ্গুর হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মানসম্পন্ন শিক্ষা আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দিতে পারছি না। এর জন্য আমি আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাকেই দায়ী করবো। শিক্ষাব্যবস্থা অনেকগুলো বিভাগে ভাগ হয়েছে কিন্তু আমরা মানসম্পন্ন শিক্ষা আমাদের শিক্ষার্থীদের দিতে পারছি না। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এই সব কথা বলেন।এই প্রবীণ শিক্ষাবিদ আরও বলেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ক্লাস ফাইভ, ক্লাস এইট ও ক্লাস টেনের যে পরীক্ষা ব্যবস্থা আবিষ্কার করা হয়েছে, এটা কেন করা হলো? বলা হচ্ছে, আত্মবিশ্বাস বাড়বে, আরে পরীক্ষা দিলেই কি আত্মবিশ্বাস বাড়ে? এটা কি আমেরিকা নাকি? এই সবগুলো পরীক্ষা একই রকম।

এমসিকিউ প্যাটার্নের, সবই মুখস্তবিদ্যা। এখানে শিক্ষার্থীরা মুখস্ত করে, কোচিং করে, পরিবারগুলোকে বিপর্যস্ত করে তারা পরীক্ষা নিচ্ছে। আর যখন পরীক্ষাগুলোতে নকল হয়, তখন যেটুকু অর্জন করে আমাদের শিক্ষার্থীরা, সেটুকুও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সেই পরীক্ষায় আত্মবিশ্বাস কীভাবে আসে? নোটবই, গাইড বই এবং কোচিং বাণিজ্যের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের তোতা বাহিনী বানিয়ে ধ্বংস করা হচ্ছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করার আরেক বিধ্বংসী উপকরণ। জাতিকে মেধাশূন্য করার আরেক হাতিয়ার। প্রশ্নপত্র ফাঁসের মাধ্যমে এখন পরিবার ও পরিবারের সন্তানেরাও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। শিক্ষার্থীরা পরিবারকে চাপ দিচ্ছে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র কিনে দিতে। তখন পরিবার নিরূপায় হয়ে টাকা দিয়ে প্রশ্ন কিনে সন্তানকে দিচ্ছে। আমরা পরিবারগুলোকে একেবারে দুর্নীতিগ্রস্ত করে ফেলছি। সন্তানদের একদম বিপর্যস্ত করে ফেলছি। পাশ করার সব ধরনের ব্যবস্থা করেই এই পরীক্ষাগুলো নেয়া হয়। একটি শিক্ষিত জাতি তৈরি করতে হলে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করতে হবে। তা অতিসত্বর করার উচিত। শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়মগুলো দিন দিন মহামারি আকার ধারণ করছে।

স্বদিচ্ছা থাকতে হবে। সংকল্পও থাকতে হবে, আমাদের শিক্ষার্থীদের মানসম্পন্ন ও গুণগত শিক্ষা প্রদান করবো। এই স্বদিচ্ছা রাষ্ট্রের যতগুলো রাজনৈতিক দল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্যারিকুলামে থাকবে এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ যতগুলো এজেন্সি জড়িত আছে সবার দৃঢ় সংকল্প থাকতে হবেÑ আমাদের শিক্ষার্থীদের মানসম্পন্ন ও গুণগত শিক্ষা দিবো। তিনি আরও বলেন, সরকারকে শিক্ষা খাতে বাজেট বাড়াতে হবে। বর্তমান শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ নেপালের চেয়েও কম। এটা আমাদের দেশের জন্য খুবই লজ্জাজনক। তাই আমাদের উচিত এই ক্ষেত্রে বাজেট এর ২৫ শতাংশ অথবা জিডিপির ৬ শতাংশ আমরা শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করতে।

এছাড়া আমি মনে করি, আমাদের কাছে আর কোনো বিকল্প নেই। এতে শিক্ষকদের বেতন বাড়বে। জীবনযাত্রা যখন মানসম্পন্ন হবে, তখন অভাবের কারণে শিক্ষকরা এসব প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নকলের মতো অপরাধের সাথে জড়িত হবে না। তখন মানসম্পন্ন শিক্ষাও পাওয়া যাবে, শিক্ষকও পাওয়া যাবে।
তিনি বলেন, যদি আমরা গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থায় শতভাগ সৃজনশীল হবে এবং পরীক্ষা সম্পূর্ণ কমিয়ে আনা যাবে। শুধুমাত্র দ্বাদশ শ্রেণীর আর পাবলিক পরীক্ষা থাকতে পারে। এক্ষেত্রে আমরা আমেরিকার শিক্ষাব্যবস্থা অনুসরণ করতে পারি, ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থা না। এই শিক্ষাব্যবস্থায় মুখস্ত নির্ভরতা খুবই কম।

তাহলে এই ব্যবস্থায় পঞ্চম, অষ্টম, দশম শ্রেণীর যে পরীক্ষা আছে, তা সম্পূর্ণ তুলে দিতে হবে। ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থায় জাতি দিন দিন মুর্খ হয়ে যাচ্ছে। কোনো শিক্ষিত জাতির মুখস্তনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা থাকতে পারে না। মুখস্তনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় আমাদের শিক্ষার্থীরা লেখতে পারে, বলতে পারে না। এই জন্যই আমাদের পেশাদারিত্বের অভাব। সৃজনশীলতার অভাবের কারণেই এগুলো হচ্ছে। যখন আমরা সৃজনশীল শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন করতে পারবো, তখন আমাদের আর এই তোতা বাহিনী তৈরি হবে না। কোচিং বাণিজ্য, নকল, প্রশ্নপত্র ফাঁস শাস্তিযোগ্য অপরাধও কমে যাবে আমাদের দেশ থেকে।

সম্পাদনা : খন্দকার আলমগীর হোসাইন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত