প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাঁশরিয়ার বাঁশি

মোহাম্মদ মোহসীন : বাঁশ দিয়ে তৈরি বলেই কি এর নাম বাঁশি? ব্যাকরণগত বিশ্লেষণে দেখা যাবে, বাঁশ এর সাথে ই বা ইন যুক্ত করে বাঁশি শব্দটি হয়েছে। ব্যাকরণের ঝামেলায় না গিয়ে, বাঁশি সম্পর্কে সাধারণভাবে একটু জেনে নিই। বাঁশি এক ধরনের সুষির অর্থাৎ ফুৎকার (ফুঁ) দিয়ে বাজানো যায় এমন বাদ্যযন্ত্র। বাংলায় বাঁশিকে মুরালি, মোহন বাঁশি, বংশী অথবা বাঁশরিও বলা হয়। বাঁশির পাশ্চাত্য সংষ্করণের নাম ফ্লুট (ভষঁঃব)। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাঁশি তৈরিতে তরলা বাঁশ ব্যবহার করা হয়। কেউ কেউ সখের বশে স্টিলের, তামার, পিতলের, রূপার এমনকি সোনার পাইপ দিয়েও বাঁশি তৈরি করিয়ে থাকেন। হেমিলনের বংশি বাদকের বাশি কিসের তৈরি ছিল তা জানা হয়নি, তবে বাঁশির সুর যে জীবকূলকে আকর্ষণ করে, তা ঐ গল্প থেকে জানা যায়।

এ উপমহাদেশে, বাঁশি নিয়ে অনেক গান রচনা হয়েছে। যেমন, (১) প্রাণও সখিরে ঐ শোন কদম্ব তলে বংশি বাজায় কে? (২) বাবলা বনের ধারে ধারে বাঁশি বাজায় কে? (৩) কালার বাঁশির সুরে, মন উদাসী ঘরে রইতে পারি না… (৪) আমি যখন রানতে বসি বন্ধু বাজায় বাঁশি, রান্না বান্না ছেড়ে আমি কেমন করে আসি… (৫) বন্ধু আমার আলারে ভোলা, বাজায় বাঁশি দুপুর বেলা আরও একেলা…, ও তার বাঁশির সুরে মন হরে গো,… ঘরে রইতে দিল না,… বহুদিনের পিড়ীত গো বন্ধু, একই দিনে ভেঙ্গ না… (৬) বাঁশি কেন গায়…আমারে কাদায়… যে গেছে হারায়ে… কেন মনে এন দেয়… (৭) আমি মেলা থেকে তাল পাতার এক বাঁশি কিনে এনেছি… বাঁশি তো আগের মতো বাজে না…।
বাঁশির প্রতি বাহ্যিক বিরক্তি কিন্তু বাঁশরিয়ার প্রতি প্রচ্ছন্ন ভালবাসা ফুটে উঠেছে, শচিন দেব বর্মনের এই গানে ‘বাঁশি শুনে আর কাজ নেই, সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি। সে যে দিন দুপুরে চুরি করে রাত্তিরে ত কথা নাই, ডাকাতিয়া বাঁশি…। বাশেতে ঘুন ধরে যদিও পোড়া বাঁশিতে ঘুন ধরে না। কত জনায় মরে শুধু পোড়া বাঁশি কেন মরে না? পবনে বিষ ঢালে বাঁশি, পোড়ায় এ প্রাণ গড়লে। ঘুচাব তার নষ্টামি আজ আমি সপিব তায় অনলে…।

ভারতীয় হিন্দী গানেও বাঁশির বিষয়টি এসেছে যেমন, (১) মন দোলে মেরা টানু দোলেরে, দিলকা গিয়া পেরার, কোনো বাজায়ে বাঁশরিয়া? (আমার মন প্রাণ দোলিয়ে কে তুমি বাঁশি বাজাও?) (২) মুরলি ওয়ালে মুরলি বাজা, সোন সোনে মুরলি কো নাচে জিয়া (বাঁশরিয়া তোমার বাঁশি শোনে শোনে আমার প্রাণ নাচে)।

বাঁশির সুর আমার খুব পছন্দের। ছোটবেলায় বৈশাখী মেলায় গিয়ে প্রথমেই একটি বাঁশি কেনা হত। যে বাঁশির মাথার দিকে হাসের ঠোটের মতো, ফু দিলেই বাজে, সেই বাঁশিই কিনতাম। বাজত ঠিকই কিন্তু সুর তুলতে পারিনি কোনোদিন। উপরে গোল ছিদ্রযুক্ত বাঁশিতে ফু দিতে, দিতে, বুকের ছাতি ফাটিয়ে ফেললেও কোনো শব্দ বের করতে পারতাম না। অবাক হতাম তখনই, যখন আমার এক দূর সম্পর্কের ফুপাত ভাই মফিজ, ফু দেওয়া মাত্রই বাঁশিতে সুর বেজে উঠত। মফিজকে অনুরোধ করতাম, ভাই একটু বাঁশি বাজানো শিখিয়ে দে না।
মফিজের গানের কণ্ঠ যেমন ভাল ছিল, তেমনি বাঁশির সুর। রাতের বেলায় মফিজের মনহরা বাঁশি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করত। গানের সুর মফিজ বুঝত ঠিকই, কথাগুলি রপ্ত না করেই গান গাইত। অনেক সময় ওর গান শুনে মিটি মিটি হাসতাম।

অনেক দিন আগের কথা। সমবয়সী কিছু বন্ধু বান্ধব মিলে ফুটবল খেলা দেখতে যাচ্ছি। খেলার স্থান, আমাদের বাড়ি থেকে বেশ দূরে গোমতী নদীর চরে। সেখানে এলাকার বিখ্যাত সব ফুটবলাররা খেলতে আসবেন। চলার পথ, কখনো বড় রাস্তা, কখনো ধান ক্ষেতের আল। সময় কাটাতে মফিজকে বললাম গান ধর। আমজাদ হোসেন পরিচালিত নয়ন মনি ছায়াছবির গানগুলি তখন সকলের মুখে মুখে। এই ছবিরই একটি গান ছিল ‘কোনো কিতাবে লিখা আছে গো হারাম বাজনা গান? দাউদ নবীর বাঁশির সুরে চমকে পাখির প্রাণ। সুর যদি হারাম হইত, বিল্লালে কি আজান দিত? পড়িত কি মধুর সুরে পবিত্র্র কুরান। মফিজ এ গানটি শুনেছে কিন্তু কথাগুলি ভালভাবে শুনেনি। সুর তার মুখস্ত। সে গান ধরল’ কোন কিতাবে লিখাছ গো হারানো দুইটি পান? আমরা সবাই হু হু করে হেসে ফেললাম। এভাবে পৌঁছে গেলাম গোমতীর চরে।

মফিজের বাঁশির সুর সত্যিই ছিল মনোমুগ্ধকর। সে যখন বাঁশিতে সুর তুলত (১) কালা আর না বাজাও বাশরি, বাঁশির সুরেতে কালা রইতে না পারি। (২) অনেক সাধের ময়না আমার বাধন কেটে যায়…, মিছে তারে শিকল দিলাম রাঙা দুটি পায়…। বুঝতাম মফিজের বাঁশি।অনেক দিন বাঁশির সুর শুনি না। একদিন অনেক রাতে সেই বাঁশির সুর শুনতে পেলাম। এত রাতে ঢাকা শহরে কে বাঁশি বাজায়? আস্তে, আস্তে বাঁশির সুর মিলিয়ে গেল। একদিন সন্ধ্যায়, বাসার পাশের রাস্তায় ফুটপাথ ধরে হাটছি। হঠাৎ শুনি সেই বাঁশির সুর, দূরে কোথাও থেকে ভেসে আসছে। আমি যতই এগুচ্ছি সুর ততই স্পষ্ট হচ্ছে। কিছুক্ষণ পর দেখলাম কে একজন বাঁশি বাজিয়ে এদিকেই আসছে। আমার কাছাকাছি আসতেই দেখলাম, একজন লোক গলায় একটি কার্ড ঝুলানো, তাতে লিখা ‘ভাই আমি অন্ধ আমাকে সাহায্য করুন’। হাতের সাদা ছড়িটি দিয়ে পথ ঠাওরে নিয়ে, অবারও বাঁশিতে সুর তুলছে।

কখনো বাংলা ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়’। কখনো হিন্দি ‘দুনিয়াকা মজা লেলো দুনিয়া তুমারি হেয়, দুনিয়া তুমারি হেয়, দুনিয়াকা লাথ মার, দুনিয়া সালাম কর…’। গলায় ঝুলানো থলেতে কিছু টাকা রেখে, মুগ্ধ হয়ে শুনছি তার বাঁশির সুর আর পিছু পিছু হাটছি। কিছুক্ষণ পর আমার বাসার গলির মুখে এসে থেমে গেলাম। বংশি বাদক সামনের দিকে চলে গেল। আমি দাঁড়িয়ে থেকে বাঁশির সুর শুনছিলাম।
কিছুদূর গিয়ে, সে আমার প্রিয় একটি হিন্দি গানের সুর তুলল ‘বাচপান কি মুহব্বত কো দিলছে না জুদা কারনা, যবে ইয়াদ আয়া মেরে মিলনে ছে দোয়া কারনা…। অর্থ যতটা বুঝেছি (?).. (ছেলেবেলার ভালবাসা মন থেকে মুছে ফেলোনা, যখন আমায় মনে পড়বে দেখা হউক করি এ প্রার্থনা)। সেই সুর আমায় মোহিত করল। অপলক নেত্রে তাকিয়ে থাকলাম বাঁশি ওয়ালার চলার পথের দিকে। সুরের আবেশে তৃপ্ত হতে থাকল প্রাণ।

হঠাৎ একটি গাড়ির কাল ধূয়া আচ্ছন্ন করে ফেলল চারিদিক। বাঁশিওয়ালা মিলিয়ে গেল কাল ধূয়া আর হাজারো লোকের ভিড়ে। কান ফাটানো হর্নের শব্দে, মিলিয়ে গেল তার মোহনীয় সুর। আমি হাটতে লাগলাম আমার গন্তব্যের দিকে। স্মৃতির পাখিটি ডানা মেলে উড়ে গেল, ‘বাচপানকি (ছেলেবেলার) মেরে গ্রামছে (আমার সেই গ্রামে)। যেখানে আছে গান, আছে হাসি, আছে মফিজদের মোহনীয় বাঁশি।…
পরিচিতি : কৃষি বিশেষজ্ঞ/ ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত