প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রকল্প পরিচালক ছাড়াই চলছে কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ

ডেস্ক রিপোর্ট : প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ ছাড়াই চলছে কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ কাজ। নগরীর পতেঙ্গা এলাকায় কনসালটেন্ট প্রতিষ্ঠানের একটি সাইট অফিস নির্মাণ করা হয়েছে মাত্র। পতেঙ্গা ও আনোয়ারায় কেবল জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। সমান করা হচ্ছে জমির মাটি। কিন্তু মূল কাজে এখনও হাত দেয়া হয়নি। এ কারণে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। ৪ বছরের কাজ শেষ করতে ৭ থেকে ৮ বছর লেগে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, কাজ সঠিক গতিতেই চলছে। কোথাও জটিলতা নেই।

সূত্র জানায়, সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী কবির আহমদ অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের তদারকি কাজ করছেন। পরিচালক না থাকায় প্রায় ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের কাজে গতি আসছে না। কাজের গতি নিয়ে আসছে নানা তথ্য।

জানা গেছে, পতেঙ্গা অংশে একটি সাইট অফিস নির্মাণ করা হয়েছে। পতেঙ্গা ও আনোয়ারায় কেবল জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। সমান করা হচ্ছে জমির মাটি। এসব কাজের জন্য কিছু যন্ত্রপাতিও সেখানে রাখা হয়েছে। নগরী থেকে দূরে টানেলের অন্য প্রান্ত আনোয়ারা অংশে কোনো ধরনের কাজ চোখে পড়ছে না। নদীর তলদেশে টানেলের জন্য প্রাক-কারিগরি কাজের কিছুই শুরু হয়নি। প্রকল্পের বড় অংশ অর্থ জোগানাদাতা চীনা প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা নিয়েও চলছে নানা আলোচনা। বলা হচ্ছে, চীন অর্থ ছাড় করতে দেরি করছে। প্রকল্প কাজ পরিদর্শনে আজ চট্টগ্রাম আসছেন সেতু বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। তার সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন। তিনি নগরীর পতেঙ্গা এলাকায় প্রকল্প এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করবেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্পের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী কবির আহমদ  জানান, প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ের বেশকিছু কাজ হয়েছে। তবে মূল কাজ শুরু হয়েছে ৫ ডিসেম্বর। প্রকল্প কাজের সব শেষ করতে ৫ বছর লাগতে পারে। তবে মূল কাজ ৪ বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০২২ সালের মধ্যে শেষ হবে আশা করছি। তিনি জানান, কাজে কোনো ধরনের ধীরগতি নেই এবং অর্থছাড় সংক্রান্ত কোনো জটিলতাও নেই।

উপপ্রকল্প পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) ড. অনুপম কুমার সাহা জানান, টানেলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ইকুইপেন্ট হচ্ছে ‘টানেল বোরিং মেশিন’। চীন থেকে ইকুইপমেন্টটি আসবে আগামী বছর। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পার্টস হিসেবে আসবে। পরে দেশে তা সংযোজন করা হবে। এটির জন্য টানেল মুখের দুই প্রান্তে জেটি নির্মাণ করা হচ্ছে। আগামী বছরের মার্চে জেটি নির্মাণ শেষ হতে পারে। প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের ৮০ ভাগ কাজ শেষ। প্রকল্প কাজ স্বাভাবিকভাবেই এগোচ্ছে।

সেতু মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা জানান, কর্ণফুলী নদী চট্টগ্রাম শহরকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। এক ভাগে রয়েছে নগর ও বন্দর এবং অপর ভাগে রয়েছে ভারি শিল্প এলাকা। কর্ণফুলী নদীর ওপর এরই মধ্যে তিনটি সেতু নির্মিত হয়েছে; যা বিরাজমান বিপুল যানবাহনের জন্য যথেষ্ট নয়। নদীর মরফলজিক্যাল বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কর্ণফুলী নদীর তলদেশে পলি জমা একটি বড় সমস্যা এবং চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যকারিতার জন্য বড় হুমকি। এ পলি জমা সমস্যার মোকাবিলা করার জন্য কর্ণফুলী নদীর ওপর আর কোনো সেতু নির্মাণ না করে এর তলদেশে টানেল নির্মাণ করা প্রয়োজন। এজন্য সরকার চট্টগ্রাম জেলার দুই অংশকে সংযুক্ত করার জন্য কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

চট্টগ্রাম বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং বৃহত্তম বাণিজ্যিক নগরী। কর্ণফুলী নদীর মুখে অবস্থিত চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমেই অধিকাংশ দেশের আমদানি ও রপ্তানি কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। প্রস্তাবিত টানেল চট্টগ্রাম বন্দরনগরীকে কর্ণফুলী নদীর অপর অংশের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করবে এবং পরোক্ষভাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের মাধ্যমে সারা দেশের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। প্রস্তাবিত টানেল সাইটে নদীর প্রস্থ’ ৭০০ মিটার এবং পানির গভীরতা ৯ থেকে ১১ মিটার। প্রস্তাবিত টানেলের দৈর্ঘ্য ৩ হাজার ৪০০ মিটার।

সরেজমিন প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে বহু লেন সড়ক টানেল নির্মাণ প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ শেষে পতেঙ্গা এলাকায় প্রকল্প কার্যালয় তৈরি করা হয়েছে। চীন থেকে এসেছে নির্মাণ সামগ্রীর দুটি বড় জাহাজ। আসবে আরও ছয়টি। মোট ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা (সম্ভাব্য) ব্যয়ে টানেল হবে শাহ আমানত বিমানবন্দর থেকে কর্ণফুলী নদীর ২ কিলোমিটার ভাটির দিকে। টানেলের প্রবেশপথ হবে নেভি কলেজের কাছে। বহির্গমন পথ হবে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ের সিইউএফএল সার কারখানা সংলগ্ন ঘাট। ৯ হাজার ২৬৫ দশমিক ৯৭১ মিটার দৈর্ঘ্যরে এ প্রকল্পের মধ্যে টানেলের দৈর্ঘ্য ৩ হাজার ৫ মিটার। টানেলে থাকবে ৯২০ মিটার দৈর্ঘের দুটি ফ্লাইওভার। এর মধ্যে শহর প্রান্তের ‘অ্যাট গ্রেড সেকশন’ হবে ৪৬০ মিটারের আর দক্ষিণ প্রান্তের ‘অ্যাট গ্রেড সেকশন’ হবে ৪ হাজার ৪০৩ দশমিক ৯৭১ মিটারের। ৪ বছর মেয়াদকালের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি)।

৭ ডিসেম্বর কর্ণফুলী টানেলের নির্মাণ কাজসহ পরবর্তী সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য পতেঙ্গা ও আনোয়ারা অংশে পিডিবির দুটি সাবস্টেশন নির্মাণ শুরু করা হয়েছে মাত্র। পতেঙ্গা এলাকার সাবস্টেশনের নির্মাণ কাজ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধন করেন পিডিবির চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী প্রবীর কুমার সেন।

হালিশহর সাবস্টেশন থেকে পতেঙ্গা টানেল পর্যন্ত নতুন ৫ কিলোমিটার বিদ্যুৎ লাইন এবং নতুন সাবস্টেশন নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ২০ কোটি টাকা। আগামী চার মাসের মধ্যে নতুন সাবস্টেশনের নির্মাণ কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছেন হালিশহর সাবস্টেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী বীরেশ্বর সাহা।

তিনি জানান, পতেঙ্গা এলাকায় যেখান থেকে টানেলের শুরু, তার কাছাকাছি স্থানে নতুন সাবস্টেশনটি নির্মাণ করা হচ্ছে। কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের অধীনে এ সাবস্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে। নির্মাণ কাজের সব টাকা কর্ণফুলী টানেল প্রকল্প থেকে ব্যয় হবে। পিডিবি নির্মাণ কাজ তদারকি করবে। এ সাবস্টেশন থেকে টানেল নির্মাণ কাজে বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি কাজ শেষ হলে টানেলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, টানেলে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য কর্লফুলীর উভয় পাশে দুটি সাবস্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে। পতেঙ্গা এলাকার কাজ শুরু হলেও আনোয়ারা সাইটের নির্মাণ কাজ এখনও শুরু হয়নি। আনোয়ারা সাইটে সিইউএফএলের কাছাকাছি স্থানে সাবস্টেশনের জন্য জায়গা নির্ধারণ করা হচ্ছে। নির্ধারণ কাজ শিগগিরই শেষ হবে। এরপর শুরু হবে নির্মাণ কাজ। সাবস্টেশন নির্মাণে বেশি সময় লাগবে না বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে অক্টোবরে পতেঙ্গায় টানেল প্রকল্পের সাইট পরিদর্শনের সময় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণে চীন থেকে অর্থছাড় নিয়ে কোনো জটিলতা নেই। বিদেশিরা তাদের প্রকল্পে যখন ঋণ দেয়, তাদের অর্থছাড়ে কিছু প্রক্রিয়া থাকে। কাজেই অর্থছাড়ের বিষয়টি তাদের প্রক্রিয়াগত ব্যাপার। আমি যতটুকু জানি, অর্থছাড়ের ব্যাপারে এ মুহূর্তে কোনো জটিলতা নেই। টানেল নির্মাণে অর্থছাড়ের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এতে কোনো প্রক্রিয়াগত ও পদ্ধতিগত বাধা নেই। আলোকিত বাংলাদেশ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত