প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কচুরিপানার কাগজে তৈরি হচ্ছে বাহারি হস্তশিল্প

ডেস্ক রিপোর্ট : বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ডোবা ও মজাপুকুরের কচুরিপানার কাগজ দিয়ে নারীদের তৈরি করা বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্প যাচ্ছে ইউরোপ ও আমেরিকার ২০টির বেশি দেশে। বিদেশে এর চাহিদা বাড়ার কারণে দিনে দিনে এর প্রসার বেড়েই চলছে। বিশেষ করে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ক্রিস্টমাস ডে বা বড়দিনের ‘ট্রে’ সাজাতে এসব পণ্যের বেশ কদর বেড়েছে। এখানে কচুরিপানার কাগজের সাথে শন, সুতা, কেয়া পাতা, তালপাতা, পাট দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে অ্যালবাম, নোটবুক, গহনা ঝুড়ি, গিফট বক্স, শুভেচ্ছা কার্ড, মালা, সুতলীর ব্যাগ, পার্স, বক্স, খেলনা, ওয়ালম্যাট, সাইড ব্যাগসহ ৩০ হাজার উপহার সামগ্রী। আর এ কাজ করে স্বাবলম্বী হয়েছে এখানকার প্রায় ২ হাজার পরিবার।

জানা গেছে, অসহায় নারীদের স্বাবলম্বী ও আর্থিকভাবে সচ্ছল করতে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা মেনোনাইট সেন্ট্রাল কমিটির (এমসিসি) উদ্যোগে উপজেলার পাঁচটি কেন্দ্রে প্রথমে কাজ শুরু হয়। বর্তমানে ‘প্রকৃতি বাংলাদেশ’ এর আওতায় এলাকার দুস্থ ও বিধবা নারীরা  কচুরিপানার কাগজে তৈরি করছেন বড় দিনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য নানা উপহার সামগ্রী।

যেভাবে শুরু: ১৯৮৪ সালে কচুরিপানাকে ঘিরে এলাকায় গড়ে ওঠে এমসিসির জোবারপাড় এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রকল্প। এ প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত অসহায় নারীরা শুধু ডোবা ও মজাপুকুর থেকে কচুরিপানা সংগ্রহ করেন। কচুরিপানার সঙ্গে পাট, ব্যবহূত কাগজ ও সিল্ক কাপড় দিয়ে মণ্ড তৈরি করা হয়। এরপর তাতে রং দিয়ে রোদে শুকানোর পর তৈরি হয় কাগজ। এভাবে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে ৩ হাজার পিস কচুরিপানার কাগজ। সেই কাগজ দিয়ে তৈরি করা হয় হস্তজাত উপহার সামগ্রী। ঐ উপহার সামগ্রীতে বিভিন্ন ধরনের কাঁচা ফুলও ব্যবহার করা হয়। অল্প সময়ের মধ্যে অসহায় নারীদের হাতে তৈরি পণ্য বিদেশের বাজার দখল করে নেয়। একই বছর উপজেলার বাগধায় বাগধা এন্টারপ্রাইজ নামে আরো একটি প্রকল্প চালু করা হয়। এ দুটি প্রকল্পের সাফল্যের পর ১৯৮৭ সালে গড়ে ওঠে কেয়াপাম হ্যান্ডিক্রাফট নামের আরো একটি প্রকল্প। এরপর ১৯৯৩ সালে আগৈলঝাড়ায় বিবর্তন নামের আরো একটি প্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু করে।

জানা গেছে, কচুরিপানার কাগজ দিয়ে তৈরি উপহার সামগ্রী পাঠানো হচ্ছে কানাডা, ডেনমার্ক, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, হল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট, রাশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। প্রতিবছরই ঐ সব দেশে এ উপহার সামগ্রীর চাহিদা বাড়ছে। বিশেষ করে বড়দিনের উত্সব থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এর চাহিদা থাকে সবচেয়ে বেশি।

উপজেলার জোবারপার এন্টারপ্রাইজে গিয়ে কথা হয় ঐ গ্রামের মনিমালার (৪৮) সাথে। কচুরিপানা আর বড়দিন এবার বিধবা মনিমালার জীবনে আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। মনিমালা কচুরিপানার কাগজ দিয়ে তৈরি করা বড়দিনের সান্তা ক্লজসহ বিভিন্ন উপহার সামগ্রী তৈরির সুনিপুণ কারিগরদের একজন। মনিমালার ন্যায় ঐ এলাকার দু’হাজার অসহায় ও দুস্থ নারী এমসিসি’র আগৈলঝাড়ার ৫টি কেন্দ্রে কাজ করে সংসারের স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছেন।

মনিমালা জানান, অভাবের সংসারে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে কোনোমতে খেয়ে না খেয়ে বেঁচেছিলাম। দু’বছর পূর্বে এমসিসি’র তত্ত্বাবধানে আমি কচুরিপানা দিয়ে কাগজ বানিয়ে বাহারী উপহার ও খেলনা সামগ্রী তৈরি করে আজ তিনবেলা ভাত খেতে পারছি। মনিমালার আরেক সঙ্গী বিধবা বিনা হালদার (৫০) ও বিধবা শিউলী বেগম (৪৭) জানান, আমরা যেসব জিনিস তৈরি করছি, সেগুলো দিয়ে দীর্ঘদিন থেকে দেশ-বিদেশের খ্রিষ্টীয় সম্প্রদায়ের লোকজন শুভ বড়দিন পালন করে আসছেন। প্রতিদিন একেকজন নারী শ্রমিক এখানে ৩ থেকে সাড়ে তিনশ’ টাকা আয় করছেন।

এমসিসি’র জোবারপাড় এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার পাপড়ী মণ্ডল জানান, বর্তমানে প্রকল্পের ৫টি কেন্দ্রে প্রায় দুই হাজার নারী শ্রমিক কাজ করছেন। এদের মধ্যে অধিকাংশই স্বামী পরিত্যক্তা, বিধবা কিংবা অসহায় ও দুস্থ।

আগৈলঝাড়ার বিবর্তনের ম্যানেজার সজল দত্ত জানান, সম্পূর্ণ দেশিয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে টেকসই পণ্য তৈরি করা হয় এসব প্রতিষ্ঠানে। এখানকার পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের ফেয়ার ট্রেড কোম্পানি সবচেয়ে বেশি ক্রয় করে থাকে। এ ছাড়া জাপানের পিপল ট্রি লি. ও ইতালির সিটিএমসহ ২০টি দেশের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কোম্পানি তাদের পণ্য ক্রয় করে সেসব দেশে বাজারজাত করছে।

সম্প্রতি ‘প্রকৃতি বাংলাদেশ’ এর মাদার প্রকল্প ‘এমসিসি আমেরিকা’র কান্ট্রি প্রতিনিধি মি. জর্জ আগৈলঝাড়ায় এক অনুষ্ঠানে জানান, ১৯৮৭ সালে আগৈলঝাড়ায় কেয়াপাম হ্যান্ডিক্রাফট্স মাত্র ৭ জন নারী কর্মী নিয়ে ৬ লাখ ডলার মূল্যের রপ্তানি বাজারে প্রবেশ করে। আর এখন ইংল্যান্ডসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে এখান থেকে ২০ লাখ মার্কিন ডলারের হস্তশিল্প রপ্তানি হচ্ছে। ইত্তেফাক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত