প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গাড়ি চোরের ভয়ংকর সিন্ডিকেট

ডেস্ক রিপোর্ট : প্রতীকী ছবি ‘ভাই, হুনেন এই লাইনে কিছু খারাপ লোক চলে আসছে! এজন্য আমাদের বদনাম হচ্ছে। গাড়ির মালিকরা অনেকে আমাদের বিশ্বাস করতে চায় না। টাকা দেয়ার পর যে গাড়ি ফেরত পাবে- এই ভরসা পায় না। কিন্তু আমরা এরকম না। এক জবান আমাদের। টাকা দিবেন গাড়ি ফেরত পাবেন।

কোনো চিন্তা কইরেন না। টাকা পাঠায়া দেন।’ গাড়ি চুরি করে নিয়ে যাওয়ার পর মালিকের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে মোবাইল ফোনে এভাবেই কথা বলছিল চোরচক্রের একজন। গাড়ির মালিক দুশ্চিন্তায়। টাকা দিয়েও যদি গাড়ি ফেরত না পান। বিশ্বাস রেখে টাকা পাঠাতে বলেছে চোরচক্রের সদস্য। দাবিকৃত টাকা পেলে ফেরত দেয়া হয় গাড়ি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও ঘটে। সমপ্রতি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে গাড়ি চোরচক্র। খোদ রাজধানীতে প্রতি মাসে শতাধিক গাড়ি চুরির ঘটনা ঘটছে। চারদিকে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা। রয়েছে নিরাপত্তাকর্মীও। তার পরও মুহূর্তের মধ্যেই পার্কিং থেকে হাওয়া হয়ে যাচ্ছে গাড়ি। এমনকি চালককে অজ্ঞান করে, মারধর করে গাড়ি নিয়ে যায় চক্রটি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার মধ্যেই ঘটছে এসব ঘটনা। চুরির তুলনায় গাড়ি উদ্ধারের সংখ্যা খুবই কম। চোরচক্র নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করছে। যে কারণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পেরে উঠছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তাই সাধারণত থানা-পুলিশমুখো হতে চান না চুরি যাওয়া গাড়ির মালিকরা। বরং চুরি যাওয়া নিজের গাড়িটি টাকার বিনিময়ে ফিরিয়ে নেন চোরের কাছ থেকে। এক্ষেত্রে চোরেরাই কৌশলে যোগাযোগ করে। রয়েছে চোরের দালালপক্ষ। চোরের কাছ থেকে কমিশনের বিনিময়ে তারা মালিক ও চোরের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে। গত ৫ই ডিসেম্বর। রাত সাড়ে ৯টা। অটোরিকশা থামিয়ে মহাখালীর আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে চা পান করছিলেন চালক রফিক বেপারি।

এ সময় গুলশান-২ এলাকায় যাওয়ার জন্য দরদাম করছিলেন তিন যাত্রী। ৩০০ টাকা ভাড়ায় যাত্রী নিয়ে যাত্রা করেন রফিক। বনানী রেল ত্রুসিং যাওয়ার পর অজ্ঞান হয়ে যান চালক। বিষয়টি গাড়ির মালিক শাহ জামাল জানতে পারেন রাত ১১টায়। চালকের মোবাইলফোন থেকে তার ফোনে কল করে বলা হয়, ‘ভাইজান আপনের গাড়ি আমাদের কাছে। ড্রাইভার বনানী রেলক্রসিং এলাকায় পড়ে আছে। গাড়ি নিতে চাইলে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা রেডি করেন।’ টাকার অঙ্ক নিয়ে দুদিন রফা দফা শেষে ৭৫ হাজার টাকায় গাড়ি দেয়ার সম্মতি মিলে। পুরো টাকাই তিনটি পারসোন্যাল বিকাশ নাম্বারে নেয় চোর চত্রু। টাকা দেয়ার তিন-চার ঘণ্টা পর ফোনে মালিককে বলা হয়, টঙ্গী স্টেশন রোডে যেতে। এভাবে তিনটি স্থান পরিবর্তন করে রাত ৯টার দিকে গাজীপুর এলাকাতেই পাওয়া যায় গাড়িটি।

গাড়ি পাওয়া গেলেও অনেকক্ষেত্রে ঘটে ব্যতিক্রম। গত বছরের ১লা জানুয়ারি চুরি হয়েছিল মনোয়ারা বেগমের প্রাইভেট কার (ঢাকা মেট্টো-গ-১৫-২৫২১)। আজ পর্যন্ত তা ফিরে পাননি তিনি। মনোয়ারা বেগম জানান, পার্কিংয়ে প্রাইভেট কারটি রেখে উত্তরার রাজলক্ষ্মী মার্কেটে ঢুকেছিলেন তার ছেলে মেজবাহ। কাজ শেষে সাত-আট মিনিটের মধ্যেই ফিরে এসে দেখেন, পার্কিংয়ে রাখা গাড়িটি হাওয়া। অল্প সময়েই মধ্যেই গাড়িটি নিয়ে যায় চোরচক্র। এ ঘটনায় উত্তরা পূর্ব থানায় জিডি করা হয়েছে। তদন্ত করছে থানা পুলিশ। কিন্তু গাড়ির হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে চোর সনাক্তের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

পুলিশের হিসেবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় গাড়ি চুরির মামলা হয়েছে ৩৪৭টি। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২৫০ জন। নভেম্বরে ৩৫টি গাড়ি চুরি হয়। এরমধ্যে ২৩টি মোটরসাইকেল ও একটি মাইক্রোবাস রয়েছে। উদ্ধারের তালিকায় কোনো মাইক্রোবাস নেই। মোটরসাইকেল উদ্ধার হয়েছে ১৪টি। গেল বছরে ডিএমপির বিভিন্ন থানায় গাড়ি চুরির অভিযোগ এসেছে ৫৮২টি। অথচ গাড়ি উদ্ধার হয়েছে ১ হাজার ১৬৬টি। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, গাড়ি চুরির তুলনায় খুব কমই অভিযোগ পান তারা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চোর চক্রের ভয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা নিতে চান না। এর কারণ সম্পর্কে ভুক্তভোগী মালিকরা জানান, চোরচক্র গাড়ি চুরির পর টাকার বিনিময়ে ফেরত দিতে চায়। কিন্তু পুলিশমুখো হলে গাড়ি গায়েব করে ফেলে। অবশ্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গাড়ি উদ্ধারে সক্ষম হন। এমনকি চোরচক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তারও করা হয়।

কিন্তু গাড়ির মালিকদের মধ্যে ভয় কাজ করে। তারা মনে করেন আবারও চোররা টার্গেট করে গাড়ি চুরি করতে পারে। তবে গাড়ি চুরি প্রতিরোধ টিমের গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, সুযোগ পেলে যে কোনো গাড়িই চুরি করে চোরেরা। এখানে টার্গেট বলতে কিছু নেই। ডিএমপি’র গোয়েন্দা উত্তর বিভাগের গাড়ি চুরি প্রতিরোধ টিমের সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার নিশাত রহমান মিথুন জানান, অভিযোগ পেলে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে গাড়ি উদ্ধার ও চোরদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করি আমরা। চোরদের গ্রেপ্তারের পর জামিন নিয়ে ফের সক্রিয় হয়ে উঠে তারা। তাদের অনেকেই তথ্য-প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতন। নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানায় তাদের পাওয়া দুষ্কর। তারপরও আমরা প্রতি মাসেই অনেক গাড়ি উদ্ধার করছি। সেসঙ্গে চোরদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। চুরি প্রতিরোধে চালক ও মালিকদের সচেতন থাকার আহবান জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।

সিনিয়র এসি নিশাত রহমান মিথুনের নেতৃত্বে গত মাসে পাঁচটি গাড়ি উদ্ধার হয়েছে। চালক ও মালিকরা জানান, চোর সম্পর্কে এখন অনেক চালকরাই সচেতন। তার পরও ঘটছে চুরি। অনেক ক্ষেত্রে হিংস্র হয়ে উঠছে চোররা।

১০ই ডিসেম্বর। সকাল সাড়ে ৮টা। লালবাগ থেকে চালক মোক্তার হোসেনের সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করে বনশ্রী নিয়ে যান তিন ব্যক্তি। পথিমধ্যে দুবার চালককে চা পান ও কলা খেতে বলেন তারা। চালক রাজি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বার্গার খাওয়ার কথা বলেন। তাতেও রাজি হননি চালক মোক্তার। শেষ পর্যন্ত বনশ্রী যাওয়ার পর আরও ভেতরে নিয়ে যেতে বলেন তিন যাত্রী। মূল রাস্তা থেকে নিয়ে ভেতরে প্রায় ১০ মিনিটের রাস্তা ঘুরানো হয়। একপর্যায়ে নির্জন এক গলিতে থামিয়ে চালককে ১ হাজার টাকা নোট দেন তারা। চালক মোক্তার জানান, ভাঙতি নাই। গাড়ি থেকে নেমে ভাঙতি করাতে বলেন যাত্রীরা। চালক রাজি না। ঠিক তখনই যাত্রীবেশী ছিনতাইকারীর রূপ প্রকাশ করে। গাড়ির সামনের গ্লাস ভেঙ্গে চালকের কাছ থেকে চাবি নেয়ার চেষ্টা করে। চালক চিৎকার করলে আশপাশের লোকজন এগিয়ে গেলে ছিনতাইকারীরা পালিয়ে যায়।

সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার মিথুন জানান, মাঠ পর্যায়ে ছড়িয়ে থাকে চোরচক্রের সদস্যরা। সিএনজি অটোরিকশা ছাড়া অন্যান্য গাড়ির ক্ষেত্রে এক ধরনের মাস্টার লক ব্যবহার করে। গাড়ি চুরি করে তাদের সর্দারের নিকট জড়ো করে। চক্রের কিছু সদস্য থাকে যাদের কাজ ফোনে গাড়ির মালিকের সঙ্গে কথা বলে টাকা আদায় করা। চক্রের আরও কিছু সদস্য দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে থাকে। যে গাড়িগুলো মালিকপক্ষ টাকার অঙ্কের কারণে বা অন্যান্য কারণে নেন না অথবা মালিককে দেয়া সম্ভব হয় না। সে গাড়িগুলো বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করে দেয় এ সদস্যরা। আবার যেসব গাড়ি বিক্রি করা হয় না, তা ওই চক্র মাদক পরিবহন ও ছিনতাইয়ের কাজে ব্যবহার করে। গত ৭ই নভেম্বর ডেমরা থেকে ৫৯০ বোতল ফেনসিডিলসহ এ রকম একটি পিকআপ জব্দ করেছে গোয়েন্দা উত্তর বিভাগের গাড়ি চুরি প্রতিরোধ টিম। গ্রেপ্তার করা হয়েছে তিনজনকে। এছাড়া চোরাই গাড়ির চেসিস নম্বর ঘষে বা উপরে নতুন নম্বর দিয়ে ও নকল নম্বর প্লেট ব্যবহার করে এসব গাড়ি বিক্রি করা হয়। এই চক্রের সঙ্গে অটো ওয়ার্কসপের কিছু শ্রমিকও জড়িত বলে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান। মানবজমিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত