প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এরশাদ হ্যাপি, আওয়ামী লীগ ইজ নট আনহ্যাপি?

আহসান কবির : রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন (সংক্ষেপে ‘রসিক’)। বাংলাদেশের অন্ততঃ দুইটি এলাকা আছে যেখানকার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সময় সংক্ষিপ্তরূপ প্রকাশিত হলে অনেকেই লজ্জা পেতে পারেন! ২০১৭ এর ২১ ডিসেম্বর রসিক অনুষ্ঠিত হয় এর ফল নিয়ে সবচেয়ে ‘হ্যাপি’ আছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি হো. মো. এরশাদ। তার হাসিতে পুরোনো জৌলুস আর রোশনাই ফিরে এসেছে। এই নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের কথার মানে বোঝা ভার। তারা বলছে নির্বাচনে হারলেও গণতন্ত্র বিজয়ী হয়েছে। তাদের ভাবখানা এমন-আওয়ামী লীগ হারিয়া প্রমাণ করিল যে তাদের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব! ভবিষ্যতে এমন সুষ্ঠ নির্বাচন হলে গণতন্ত্রের স্বার্থে কী আওয়ামী লীগ হারতেই থাকবে?

আর বিএনপির সেই একই কথা। কারচুপি ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাদের প্রার্থীকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিএনপির প্রার্থী ছিলেন কাওছার জামান বাবলা। তিনি সম্মানের সঙ্গে তৃতীয় হয়েছেন এবং নির্বাচন প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিয়েছেন। ২০১২ সালের ‘রসিক’ নির্বাচনে এই বাবলা সাহেব এক রকম ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী ছিলেন। তিনি তখন যত ভোট পেয়েছিলেন এইবার ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে তার চেয়ে কম ভোট পেয়েছেন! রংপুরের নদী শুকিয়ে যাচ্ছে এবং দিনকাল অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল হয়েছে বলে নৌকার চলাচল না হয় কমে যাচ্ছে! কিন্তু ‘ধানের শীষ’ কমে গেল কেন?

২০১২ সালের ‘রসিক’ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী ছিলেন তিনজন। পার্টি থেকে একজনকে বহিষ্কারও করা হয়েছিল। এই নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা দ্বিতীয় হয়েছিলেন। তবে জাতীয় পার্টির তিনজনের ভোট যোগ করলে সেটা সেই বছরের বিজয়ী আওয়ামী লীগ প্রার্থী সরফদ্দীন আহমেদ ঝন্টুর ভোটের চেয়ে বেশি ছিল। এবার জাতীয় পার্টিতে বিদ্রোহের ঘটনা ঘটেনি এবং তাদের দলীয় আয়োজন ও নেতা-কর্মীদের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ জাতীয় পার্টিকে বিশাল এক জয় এনে দিয়েছে। মেয়র হতে পেরেছেন গত নির্বাচনে দ্বিতীয় হওয়া সেই মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। ১৯৯১ সাল থেকে বৃহত্তর রংপুরে এরশাদ তথা জাতীয় পার্টির যে জনপ্রিয়তা ছিলো সেটা খুব যে কমেছে তা এখন আর মনে হচ্ছে না। এরশাদের হাসির জৌলুস ফেরার কারণ এটাই। তার ধারণা সাধারণ মানুষ সুখে দুঃখে যাকে কাছে পায় তাকেই নাকি নেতা হিসেবে মেনে নেয়। মোস্তফা সাহেব নাকি তেমন, তাই তিনি মেয়র হতে পেরেছেন। এরশাদ সাহেবকে কারা বেশি কাছে পায় ছেলে না মেয়েরা সেই প্রশ্ন না তুলে এরশাদ সাহেবের আশাবাদটা সবাইকে জানিয়ে রাখা যায়। তিনি বলেছেন আগামী নির্বাচনগুলোতেও নাকি জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা এমন বিজয় ছিনিয়ে আনবে। এমন বিজয় কী শুধুমাত্র রংপুর বা বৃহত্তর রংপুরে হবে? নাকি রংপুরের বাইরেও জাতীয় পার্টির এমন বিজয় আসতে পারে? কবিতা ও গানপ্রিয় এরশাদ সাহেবকে জগজিৎ সিংয়ের গাওয়া একটা বাংলা গান স্মরণ করিয়ে দেয়া যেতে পারে-বেশি কিছু আশা করা ভুল/বুঝলাম আমি এতোদিনে/মুক্তি মেলেনা সহজেই জড়ালে যে হৃদয়ের ঋণে!

হৃদয়ের ঋণে জড়ালে সহজে মুক্তি মেলেনা। ক্ষমতার ভাগাভাগির ঋণ নাকি আরও জটিল এবং ক্ষণে ক্ষণে সেটার দণ্ডি দিতে হয়। জাতীয় পার্টির সাথে আওয়ামী লীগের ভালোবাসা নাকি শুরু থেকেই। এরশাদ সাহেব যেদিন ক্ষমতা দখল করেন (২৪ মার্চ, ১৯৮২) তার পরদিন আওয়ামী লীগের মুখপত্র খ্যাত দৈনিক বাংলার বাণী পত্রিকায় মোনাজাতরত একজনের ছবি ছাপা হয়েছিল এবং এরশাদের আগমন এর ব্যাপারে শেখ হাসিনার মন্তব্য ছিলো-আই অ্যাম নট আনহ্যাপি। দীর্ঘ পথযাত্রায় এরশাদ অবশ্য একবার আওয়ামী লীগ পরক্ষণেই বিএনপির ভালোবাসা নিয়ে ‘হ্যাপি’ থাকতে চেয়েছেন, হয়তো এখনও আছেন। জেলে না থাকার বা না যাওয়ার ‘হ্যাপিনেস’ই আলাদা। তবে আওয়ামী লীগের সাথে এরশাদের হ্যাপিনেস দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসের নির্বাচনে এরশাদ সাহেব তার ‘স্বভাবসুলভ পাল্টি’ দিলে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে। সেটা ছিল তার রাজনৈতিক অসুখ। মানুষ জেনেছিল রাজনৈতিক অসুখের চিকিৎসাও হয় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে। এরশাদের সর্বশেষ এই হ্যাপিনেস কী শেষমেষ আওয়ামী লীগের পরাজয় ডেকে এনেছে নাকি এরশাদের দল জিতেছে বলে আওয়ামী লীগ হ্যাপিলি বলতে পারছে যে গণতন্ত্রের বিজয় হয়েছে?

এরশাদের দলের কাছে পরাজয়ের স্বাদটা কেমন? ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জাতীয় পার্টির কাছে হেরেছিল আওয়ামী লীগ। সেই স্বাদটা কেমন ছিলো? ২০১৭ সালের আওয়ামী লীগ মনে করে তারা প্রশাসনিক ও সাংগঠনিকভাবে অনেক শক্তিশালী। শক্তিশালী সময়ে হেরে যাবার ঘটনাটা এক ধরনের সতর্ক সংকেত। পরাজয়ের কারণ থাকতে পারে একাধিক। হতে পারে শরফদ্দীন আহমেদ ঝন্টু রংপুরের বড় নেতা হলেও আওয়ামী লীগে তার কোনও প্রভাব নেই কিংবা ছিল না। দলের বড় বড় নেতাদের খুব বেশি সক্রিয় দেখা যায়নি রংপুরে। প্রশাসনিক যে ক্ষমতা দিয়ে বিরোধীদের দুর্বল করে রাখা যায় নির্বাচনে, সেই চেষ্টাও দেখা যায়নি এটা আসল সত্য। মোটামুটিভাবে একটা সুন্দর ভোট উৎসব হয়েছে রংপুরে। দলগতভাবে আওয়ামী লীগ কী তাহলে অবহেলা করলো ঝন্টুকে? নাকি দলের নীরব নির্দেশ ছিল যে সুষ্ঠ নির্বাচন দেখানোর স্বার্থে প্রয়োজনে বলি হয়ে যাক ঝন্টু! আওয়ামী লীগের হাই কমান্ডের নির্দেশেই যদি এটা হয়, যদি জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজশাহী, বরিশাল, খুলনা, সিলেট, গাজীপুর ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিরোধী দল বিশেষ করে বিএনপিকে আনার কৌশলও যদি এটা হয়, তাহলেও আওয়ামী লীগের জন্য এটা ইমেজ সংকট বয়ে আনবে। সাধারণ মানুষ ধারণা করতে পারে যে আওয়ামী লীগ ক্রমশঃ অজনপ্রিয় হচ্ছে। ২০১২ সালে ঝন্টু সাহেব এক লাখের মতো ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০১৭ সালে পেয়েছেন বাষট্টি হাজার ভোট। কয়েক মাসের মধ্যে যে সমস্ত সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচন হবে সেখানে সুষ্ঠ নির্বাচন আয়োজন এবং আওয়ামী লীগের জিতে আসা সমান্তরালভাবে পথ হাটবে কিনা সেটা জানতে বা দেখতে আমাদের আরো কিছুদিন অপেক্ষাই করতে হবে! তবে রংপুরে জাতীয় পার্টির সিমপ্যাথি ভোট বেশি বলেই হয়তো জিতেছে তারা কিন্তু আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে তারা তৃতীয় শক্তি বা ‘বিকল্প’ হয়ে উঠতে পারবেনা বলেই মনে হয়েছে সব সময়ে।

বিএনপি এই ভোট যতই প্রত্যাখ্যান করুক জাতীয় পার্টির মতো হ্যাপিনেস বা আওয়ামী লীগের মতো দীর্ঘশ্বাস যুক্ত হ্যাপিনেসও তাদের নেই। তারা যে কোনও বিচারেই হেরেছে। স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করে কাওসার জামান বাবলা যত ভোট পেয়েছিলেন ধানের শীষ প্রতীক নিয়েও পেয়েছেন তার চেয়ে কম ভোট। বিএনপির জন্য এটা একটা বড় ধাক্কা বলেই অনুমিত হয়। যে কোন কারণেই হোক না কেন সাংগঠনিকভাবে বিএনপি সম্ভবত স্মরণকালের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় দিনাতিপাত করছে। যদিও দলগত ভাবে বিএনপি দাবি করেছে যে রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোট সন্ত্রাস ও ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাধ্যমে সরকার তাদের পছন্দের প্রার্থীকেই জয়ী করেছে। বিএনপির মতে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। এই দুই দলই গণতন্ত্র রক্ষায় বিএনপির বিকল্প নয়!

বিশেষ দ্রষ্টব্য: ‘রসিক’ নির্বাচনে জেতার জন্য এরশাদ ও জাতীয় পার্টিকে ধন্যবাদ, ধন্যবাদ মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফাকে। তবে জাতীয় পার্টি যেমন তৃতীয় শক্তি বা ‘বিকল্প’ কিছু না তেমনি নাকি গণতন্ত্রের জন্য আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি বিএনপির ‘বিকল্প’ না। সুতরাং ‘বিকল্প’ নিয়ে একটা গল্প বলে বিদায় নেওয়া যাক।

বড়সড় এক মুদি দোকানে নতুন এক কর্মচারি জয়েন করেছে। এক ভদ্রমহিলা তার কাছে এসে একটা ডেটল সাবান চাইলো। খুঁজে না পেয়ে ঐ নতুন দোকানি মহিলাকে বললো- ডেটল সাবান তো নাই। মহিলা চলে যাবার পর দোকানের মালিক বললো-ডেটল সাবান নেইতো কী হয়েছে? তুই বলতে পারতিস না যে কেমি, কেয়া, লাক্স, ডাভসহ আরও অনেক সাবান আছে। বিকল্প হিসাবে ব্যবহার কইরা দেখতে পারেন? নতুন দোকানি জানালো সে আর এই ভুল করবে না।

কিছুক্ষণ পর এক লোক এসে বললো-টয়লেটে ব্যবহারের জন্য মোলায়েম সুন্দর টিস্যু হবে? নতুন দোকানি অনেক খুঁজলো। না পেয়ে লোকটিকে বললো-মোলায়েম টয়লেট টিস্যু নাই তাতে কী হইছে? সুন্দর জাতের সিরিষ কাগজ আছে। ‘বিকল্প’ হিসেবে ব্যবহার কইরা দেখতে পারেন!

লেখক: রম্যলেখক। বাংলাট্রিবিউন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত