প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘নিজের জন্য বাঁচা নিজেকে নিয়ে’

চিররঞ্জন সরকার : আমরা এক নতুন পৃথিবীর দিকে যাত্রা করেছি। মৌসুমী ভৌমিকের গানের ভাষায় বলা যায়- ‘নিজের জন্য বাঁচা নিজেকে নিয়ে।’ নিজের জন্য বাঁচতে হবে। নিজের সুখের জন্য প্রাণপাত করতে হবে। নিজের ভোগের পাত্র পূর্ণ করতে হবে যে কোনো মূল্যে। নিজেকে ভালোবাসতে হবে। আর যা চাই, তা কিনতে পারার নামই নিজেকে ভালোবাসা। কেনা, ভোগ করা, আনন্দবিলাসে দিন কাটানোটাই হচ্ছে জীবনের লক্ষ্য। কনজিউমারিজম যার শিক্ষাগুরু। সেই মোকামেই আমাদের সম্মিলিত যাত্রা। কাজেই, কী ভাবে ভালোবাসতে হয়, সেই পাঠটিও আমরা বিলক্ষণ ভোগবাদের পাঠশালাতেই শিখেছি। ভালোবাসার প্রধানতম— সম্ভবত একমাত্র— প্রকাশ হল কিনে দিতে পারা। বউকে হিরের আংটি, বৃদ্ধ বাপ-মাকে ডিসনিল্যান্ডের টিকিট, বাচ্চাকে টুথপেস্ট থেকে স্পেসশিপ, সব কিছু। টিভির যে কোনও চ্যানেল চালিয়ে আধ ঘণ্টা দেখলেই দিব্যজ্ঞান লাভ হবে। বাপ মা ভাই বোন বেয়াই বোনাই জগাই মাধাই, সবার চেয়ে মানুষ যাকে বেশি ভালোবাসে, সেই নিজেকে ভালোবাসার পথটিও অতএব কিনে দিতে পারা দিয়েই যায়। নিজের যা চাই, যখন চাই, সেটা কিনে দিতে পারলেই ভালোবাসা যায় নিজেকে।
উৎসব এলেই আমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ে যাই কেনা-কাটায়। সামর্থ্য-প্রয়োজন বিবেচনার সময় নেই। আমাদের কিনতে হবে, কিনে দিতে হবে। হাসি ফোটাতে হবে। নিজেকেও কিনে দিতে পারার গর্বের হাসি হাসতে হবে। ফুর্তি হবে খুব। আর, ফুর্তি মানেই তো ভালো থাকা, নিজেকে ভালোবাসা।

যদি বলেন, বোধের অভাব, পাল্টা বলব, এ এক অন্য বোধ। ভোগবাদের বোধ। ভোগবাদের দর্শনে ক্রেতাই সব। তার ভালো থাকাই শেষ কথা, তার পছন্দই শ্রেষ্ঠ। এই দর্শন শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবতে শেখায়। না হলে যে মুশকিল। মানুষ যদি নিজেকে ছাপিয়ে ভাবতে আরম্ভ করে পরিবেশ নিয়ে, তা হলে কি বিক্রি হবে কোটি কোটি গাড়ি আর এয়ার কন্ডিশনার? ক্রেতা যদি মার্বেলের মেঝেতে দেখতে পান সিলিকোসিসে ভোগা শ্রমিকদের মুখচ্ছবি, হাতের মুঠোয় ধরা মোবাইল ফোনে ভেসে ওঠে চিনের কোনও এক সোয়েটশপে অমানুষিক পরিশ্রম করতে থাকা মানুষের চেহারা, যদি ঠান্ডা পানীয়র বোতল খোলার সঙ্গে সঙ্গে জলের অভাবে ফুটিফাটা খেত আর হেরে যাওয়া কৃষকের গল্প ভসভসিয়ে বেরিয়ে আসতে থাকে, ধাক্কা খাবে না ভোগবাদ? কাজেই, নিজের বাইরে দেখতে পারার ক্ষমতাটাকে একেবারে পিষে মেরে ফেলা ভোগবাদের বেঁচে থাকার জন্য খুব জরুরি। ভালো থাকা মানে যে শুধু নিজে ভালো থাকা, এই কথাটা তাই আধুনিক সভ্যতার মনে গেঁথে দিয়েছে পুঁজি। বিপণন। আর, মানুন অথবা না-ই মানুন, স্বার্থপরতা মানুষের মৌলিক ধর্ম। সমাজ যদি সেই ধর্মটাকে স্বীকৃতি দেয়, তা হলে আর পিছন ফিরে দেখার দরকার পড়ে না। স্বার্থপর হওয়া ভালো, তাতে কোনও লজ্জা নেই— পুঁজিবাদ নিজের স্বার্থে এই কথাটা শিখিয়েছিল। আর, এই কথাটার জন্যই তা গোটা দুনিয়ার সার্বভৌম দর্শন হয়ে উঠতে পেরেছে।

 

স্বার্থপরতার দর্শনটি শুধু বাজারের পরিসরে আটকে থাকে না। শুধু নিজের কথা ভাবতে পারার স্বাধীনতার এমনই টান যে তাতে ঢুকে যায় গোটা দুনিয়া। আমার ভালো লাগার চেয়ে, বস্তুত আমার চেয়ে, গুরুত্বপূর্ণ যে আর কিছু হতে পারে, সে কথাটাই উবে যায় মন থেকে। অবশ্য, রাষ্ট্রের একটা দায় থেকে যায় এখানে। এই বেলাগাম আত্মসর্বস্বতাকে যে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, আর যে রাষ্ট্র পারে না— দুটো ভিন্ন পথে চলতে থাকে। গুরুত্বপূর্ণ পথ। যে রাষ্ট্র মানুষকে অন্যের কথা ভাবতে বাধ্য করতে পারে, সেখানে এক সময় আর বাধ্যতার প্রয়োজন থাকে না, মানুষ নিজের অভ্যাসেই গাড়ি থামিয়ে রাস্তা ছেড়ে দেয় পথচারীকে, ময়লা ফেলার জন্য নির্দিষ্ট গা়ড়ি আসার অপেক্ষা করে।

 

সামাজিক পরিসরে স্বার্থপরতা কি তৃতীয় বিশ্বের কিছু দেশের নিজস্ব গল্প? যেখানে, অন্যের কথা না ভাবার মধ্যে নিজের ক্ষমতা জাহির করার আখ্যানও লুকিয়ে থাকে? প্রশ্নটা ভেবে দেখাই যায়। উঠতি বড়লোকের বাচ্চারা যে প্রচণ্ড গতিতে বাইক চালায়, বিকট শব্দে রেসিং কার ড্রাইভ করে, তাঁদের আনন্দ কি শুধু সেই শব্দ আর গতিটুকুতেই? না কি, তার পিছনে থাকা অন্য এক প্রদর্শনীতে— আমি এতটাই ক্ষমতাবান যে পুলিশের, প্রশাসনের সাধ্য নেই আমায় নিয়ম মানতে বাধ্য করতে পারার? পুলিশ আমায় শাসন করতে এলে আমার ক্ষমতা আছে থানার কর্মকর্তাকে সেই ফোনটা করানোর, যার পরে আমার দিকে চোখ তুলে কথা বলার সাহস পুলিশের থাকবে না। অথবা, আমার বাড়ির আবর্জনা পাশের বাড়ির দরজায় ফেলে এলে সেই পড়শির ক্ষমতা হবে না আমায় প্রশ্ন করার। নিজেকে ভালোবাসার সম্ভবত এটাও একটা উপায়— প্রতি মুহূর্তে নিজেকে মুগ্ধ করে রাখা নিজের ক্ষমতায়।

 

নিজেকে ভালোবাসা আর সম্মান করা কি এক? লোকের সমীহ অথবা ভীতি আদায় করে নেওয়া নয়, একান্ত মুহূর্তে নিজের চোখে চোখ রাখতে পারার ক্ষমতাটুকু কি এই পথে অর্জন করা যায়? না কি, বাতাসে তীব্র কার্বন মনোক্সাইড মিশিয়ে দেওয়া গাড়িতে লং ড্রাইভে যাওয়ার পথে, ব্যবহার করা পলিথিনের প্যাকেট নর্দমার মুখে জমা হওয়ার সময়, প্রতি মুহূর্তে, সেই আত্মসম্মান ক্ষয়ে যেতে থাকে? শেষ অবধি তার অস্তিত্ব মিলিয়ে যায় হাওয়ায়? কারণ, নিজেদের তুমুল ভালোবাসতে বাসতেও আমরা জানি, কোনও একটা চোখে আমার জন্য ঘৃণা রয়েছে। যে পথশিশুটিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে পার্কে নিজের সন্তানের জন্য দোলনা খালি করে দিয়েছি, সেই শিশুটির চোখ আমায় দেখছে। বলছে, তোমার ক্ষমতা থাকতে পারে, কিন্তু সম্মানের যোগ্য তুমি নও।

 

সামাজিক পরিসরে, যেখানে এই মানুষগুলোর মুখ দেখা যায় প্রত্যক্ষ ভাবে, সেখানে তবুও দ্রুত দেখতে পাওয়া যায় আহত চোখগুলোকে। কিন্তু, যেখানে বাজার আড়াল তৈরি করে রাখে? যেখানে চমৎকার জামা হাতে নিলেও দেখতে পাওয়া যায় না তার পিছনে থাকা বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম বা লাওস-এর দিনে আঠারো ঘণ্টা পরিশ্রম করতে বাধ্য হওয়া শ্রমিকের মুখ? তার সপ্রশ্ন দৃষ্টি?

 

প্রশ্নগুলো থাকবে। কিন্তু আমরা ভাবব না। ভাবতে আরম্ভ করলেই নিজেকে ভালোবাসার কাজটা জটিল হয়ে যাবে, শুধু সে কারণে নয়। এই কথাগুলো ভাবার ক্ষমতা বেশির ভাগই হারিয়ে ফেলেছি, সেই কারণে। ‘এ-পলিটিকাল’ হওয়ার তাগিদে এই প্রশ্নগুলো করার মতো রাজনীতিকে মনে ঠাঁই দিইনি। সেই কারণে। নিজেকে অতিক্রম করে ভাবার প্রয়োজনের কথা আমরা শিখিনি, সে কারণেও।

 

সেদিন কোথায় যেন দেখলাম একজন প্রশ্ন তুলেছেন, সন্তানের পড়াশোনার জন্য বাবা-মা যে খরচ করেন, সেটা অনুদান না বিনিয়োগ? ব্যাপারটাকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখলে তাতে বাজার ঢুকে পড়বে, ঝুঁকির প্রশ্ন উঠবে, এমনকী পরিস্থিতি-বিশেষে পুরো লগ্নিটাই জলে যেতে পারে।

 

স্বাস্থ্য-ক্ষেত্রের কতটা সরকারের আওতায় থাকবে আর কতটাই বা যাবে বেসরকারি পুঁজির হাতে, সেই বিতর্কে গোটা পৃথিবীটাই আড়াআড়ি বিভাজিত হয়ে গিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘ওবামাকেয়ার’ বাতিল করে দিতে তৎপর ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর পেছনে কি পুরোটাই ট্রাম্পের আগমার্কা স্বেচ্ছাচারিতা, না কি বাজারের চাপও আছে? অন্য দিকে, চিনও স্বাস্থ্য-বিষয়ে এখন পাবলিক-প্রাইভেট-পার্টনারশিপ নীতিতে আস্থা রাখছে। সবার উপর বাজার সত্য? নোয়াম চমস্কিকে উদ্ধৃত করে বলা যায়, আমরা যদি ভেবে থাকি যে, আমাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা আমাদের শাসন করেন, তা হলে আমরা মূর্খের স্বর্গে বাস করছি। পৃথিবীটা আসলে তারাই শাসন করছে যাদের উৎপাদিত পণ্য আমরা নিয়মিত ক্রয় করি।

 

‘স্বাস্থ্য-সচেতনতা’ আর ‘অকারণ রোগ-ভীতি’ এক জিনিস নয়। চিকিৎসার বিরাট বাজার আমাদের মানসিক সুস্থতাকেই সর্বক্ষণ চ্যালেঞ্জ করে চলেছে। শহর-জোড়া বেসরকারি হাসপাতালের ঢাউস ঢাউস বিলবোর্ড আর বিজ্ঞাপনী প্রচারে তো সেই বহুবিধ ‘কাল্পনিক অসুস্থতার’ই মহিমা-কীর্তন। শ্রবণ-যন্ত্র থেকে হাঁটু প্রতিস্থাপন, অ্যাঞ্জিয়োপ্লাস্টি থেকে প্লাস্টিক সার্জারি—সবই আজ বাজারের মহিমায় ‘প্যাকেজে’ পরিবেশিত। ইনস্টলমেন্টেরও সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে।

 

আজ আমাদের দেশের প্রত্যন্ততম অঞ্চলের মানুষও মোবাইলে দৈনিক কমপক্ষে দশ টাকা রিচার্জ করে থাকেন। বছরে হাজার তিনেক টাকার স্বাস্থ্যবিমা করাতে তাঁর খুব একটা সমস্যা থাকার কথা নয়। সেই টাকা বাজারে খাটিয়েই তো সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজা সম্ভব!

 

কিন্তু বাজার কি তা হতে দেবে? আর সরকারও কি বাজারের বাইরে বেরোতে চাইবে? কাজেই জীবনের মটো হচ্ছে, যে কোনো উপায়ে বড়লোক হও, টাকা কামাই কর, তারপর ভোগ কর। আর জীবনের গান এখন একটাই-‘ নিজের জন্য বাঁচা নিজেকে নিয়ে…!’ বাংলাট্রিবিউন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত