প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রোহিঙ্গার ভারে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবেশ

ড. নূরজাহান সরকার : লেখাটি শুরু করছি গল্প দিয়ে- এক ইংরেজ বাংলায় পিএইচডি করেছেন। একদিন তিনি বাঙালি এক বন্ধুকে নিয়ে নদীর তীরে সূর্যাস্ত দেখতে গেলেন। ইংরেজ বন্ধুটি বললেন, ‘জানিস, আমি বাংলা এখন এতটাই জানি যে আমাকে বাংলা ভাষায় পণ্ডিত বলতে তুই বাধ্য’। বাঙালি বন্ধু বললেন, ‘তাহলে তুই নদী দিয়ে নৌকা বেয়ে যাওয়া মাঝিকে তীরে নৌকা ভিড়াতে বল’। ইংরেজ বললের, ‘ওহে কর্ণধার, তরী তটে সংলগ্ন কর, ওহে কর্ণধার তরী তটে সংলগ্ন কর’। মাঝি শুধু ইংরেজের হাত ইশারার দিকে তাকাচ্ছে; কিন্তু কথা না বুঝে নাও বেয়েই চলছে। তখন বাঙালি বন্ধু বললেন, ‘কই, মাঝি তো তোর কথায় নৌকা নিয়ে কূলের দিকে আসছে না। তাহলে তুই বাংলায় পণ্ডিত হলি কী করে?’ ইংরেজ বন্ধু বললেন, ‘মাঝি হয়তো কানে শোনে না’। বাঙালি বন্ধু বললেন, ‘তা হলে দেখ ও কালা কিনা’, বলেই মাঝিকে ডাক দিলেন, ‘এই ব্যাটা, নৌকা কূলে নিয়ে আয়’। মাঝি নৌকা নিয়ে কূলে এল। লেখার শুরুতে গল্পটা উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হল- মিয়ানমার তাদের এক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর বিশাল বহর আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদির কারণে অর্থাৎ মানবিক বিচারে আমরা তাদের আপাতত গ্রহণ করছি। তাদের খাদ্য, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ইত্যাদির ব্যবস্থা করছি। এ আমাদের মানবতা। পুরো বিশ্ব দেখছে আমাদের মানবতার জ্বলন্ত উদাহরণ। মানবতার দিক থেকে অবশ্যই আমরা শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। অথচ এত বড় বোঝা নেয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই। রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আমরা যতই মিয়ানমারের সঙ্গে সমঝোতায় আসার চেষ্টা করছি ততই মিয়ানমার সরকার এ কথা ও কথা বলে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এমনও বলছে যে, আমরাই ওদের মিয়ানমারে ফিরতে দিচ্ছি না। আবার বলছে, ওরা বাংলাদেশি মুসলমান, মিয়ানমারের নাগরিক নয়। এমনকি জাতিসংঘে রোহিঙ্গা সমস্যা উপস্থাপন করায় তারা নাখোশ। এ যেন মাছে কোচ তাড়ানোর অবস্থা। জাতিসংঘ থেকে বিশ্বের অনেক দেশ রোহিঙ্গা সমস্যা বিবেচনায় এনেছে। সমাধানের জন্য বৈঠকের পর বৈঠক করছে। অন্যদিকে মিয়ানমার Bilatereal চুক্তির ধুয়া তুলে জাতিসংঘের সমালোচনা করছে। অং সাং সুচি এখন চিত্র শিল্পের রূপ ধারণ করেছেন। ইদানীং তাকে অনিষ্টের মূল বলে অভিহিত করছে। একে একে ফিরিয়ে নেয়া হচ্ছে তার সম্মামনা। তাহলে কী তিনি চান বাংলাদেশ তথা বিশ্ব তাকে ‘ওহে কর্ণধার, তরী তটে সংলগ্ন কর, ওহে কর্ণধার তরী তটে সংলগ্ন কর’ না বলে এটা বলবে যে, ‘এই ব্যাটা নৌকা কূলে নিয়ে আয়’। আমার তো মনে হয় তাই। বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে এমন আচরণ শুরু করা দরকার। তখন বিশ্ব বাধ্য হবে- ‘যেমন কুকুর তেমন মুগুড়’-এর ব্যবস্থা নেয়ার। বাংলাদেশ যদি হুঙ্কার তোলে, বিশ্ব হুঙ্কর দেবে, কেননা কথায় বলে, না কাঁদলে মা-ই নাকি দুধ দেয় না, তাহলে বিশ্ব কেন কাঁদবে আমাদের জন্য।

আমার অভিজ্ঞতা এই বলে যে- ‘সংকট যখন প্রকট, সমাধান তখন নিকট’। আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় বাংলাদেশের এখন হুঙ্কার দেয়ার সময় এসেছে। কোনো Bilatereal চুক্তি নয়, চুক্তি Multilateral. তা না হলে এমনও হয়তো হবে অদূর ভবিষ্যতে রোহিঙ্গারাই তাদের ন্যায্য অধিকার বুঝে নেবে। রক্ত ক্ষয়ের মাধ্যমে, আমরা যেমন রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি। তবে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধীর সহায়তা বাঙালি জাতি কখনও ভুলবে না।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপস্থিতির কারণে পাহাড়ের বুনো হাতিদের বহুবিধ সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। রোহিঙ্গাদের স্থান করে দিতে গিয়ে আমরা হাতির আবাস ব্যবহার করেছি। হাতি ক্ষিপ্ত হয়ে মানুষও মেরেছে আবার হাতিও মরেছে। পৃথিবীতে দুটি প্রজাতির হাতি রয়েছে। আফ্রিকান হাতি (Loxodonta africana) এবং এশিয়ান হাতি (Elepahus maximus). আমাদের সৌভাগ্য যে এশিয়ান হাতি আমাদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় ভারাক্রান্ত এ দেশটিতে এখনও টিকে আছে। হাতি স্থলজ প্রাণীর মাঝে সবচেয়ে বড়। এদের টিকে থাকা মানে আমাদের পরিবেশের এক বড় শক্তি ও সুস্বাস্থ্যের পরিচয়। যদিও এক সময় আমাদের দেশের সব জায়গাতে হাতি দেখা যেত, এমনকি জনবহুল ঢাকা শহরেও। এজন্য ঢাকায় রয়েছে- হাতিরঝিল, হাতিরপুল, এলিফ্যান্ট রোড ইত্যাদি। এখন শুধুই চট্টগ্রাম, চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল, সিলেট ছাড়া আর কোথাও হাতির অস্তিত্ব নেই। শেরপুরে কিছু হাতি migratory, আসে আবার চলে যায়। সর্বসাকুল্যে আমাদের বনাঞ্চলে প্রায় ১৫০টির মতো হাতি রয়েছে।

হাতি যে কোনো পরিবেশে থাকতে পারে না। হাতির জন্য চাই বন-জঙ্গল, বড় বড় ঘাস, বাঁশ, গাছ ইত্যাদি। প্রয়োজন আয়তনে বড় বনভূমি। চলাচলের জন্য দরকার করিডোর। প্রয়োজন প্রচুর খাদ্য ও পানি। প্রতিদিন একটি হাতির জন্য দরকার একশ’ কেজি কলাগাছ, ঘাস ও গাছের ডাল-পাতা, তেমনি দরকার ১০০ থেকে ১৫০ লিটার পানি। জলকেলির জন্য প্রচুর পানি প্রয়োজন হয় যার প্রায় সবই আছে চট্টগ্রামের পাহাড়ি বনে। বনের ছড়ায় হাতির জলকেলি অপূর্ব এক দৃশ্য। পাহাড় থেকে ভ্যালিতে নামার কী চৌকস কৌশল! মাতৃতান্ত্রিক হাতির দলে সবচেয়ে সুস্থ ও শক্তিশালী হস্তিনীর নেতৃত্বের কী অপরিসীম বৃদ্ধিমত্তা! ৫ থেকে ১০টির দলকে নিয়ে সুকৌশল এদের চলাচল। দলের বাচ্চাকে পরম মমতায় আগলে রেখে পথ চলে মা।

হাতির বসতি আজ মানুষ দখল করেছে। তাই মানুষের বসতিতে হাতি হানা দেবে এটাই স্বাভাবিক। রোহিঙ্গাদের আবাসের কারণে আমরা হাতির আবাস ধ্বংস করছি। রোহিঙ্গারাও নিজেদের প্রয়োজনের তাগিদে আশপাশের বন উজাড় করে কাঠ বিক্রি করে ব্যবসা করছে। পরিণতিতে অনেক এলাকা বনশূন্য হয়েছে। বিধ্বস্ত বিপর্যস্ত হয়েছে পরিবেশ, হাতির আবাসস্থল শেষ। ইতিমধ্যেই দেশের প্রভাবশালী মহল পাহাড় কেটে ব্যবসা ফেঁদে বিবর্ণ করেছে পাহাড়ের সবুজ বনাঞ্চল। পাহাড় ধসে মৃত্যুর মিছিলে আজ অসহায় মানুষের আর্তনাদ!

রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে জাগ্রত হোক বিশ্ব বিবেক। পরিবেশে আসুক সুস্থতা।

লেখক : বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর থেকে নেওয়া।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত