প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ঘুরে দাঁড়াচ্ছে জাহাজ নির্মাণ শিল্প

ডেস্ক রিপোর্ট : বাংলাদেশে নীরবে গড়ে উঠেছে জাহাজ নির্মাণ শিল্প। টানা চার বছরের মন্দা ভাব কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে জাহাজ নির্মাণ শিল্প। ইদানীং এ-খাতে উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। শিপ বিল্ডিং ইয়ার্ডগুলোতে এখন রয়েছে পর্যাপ্ত অর্ডার। এই শিল্প এখন আশার আলো দেখতে শুরু করেছে। বাংলাদেশে নির্মিত পণ্য এবং যাত্রী বহনকারী জাহাজ দেশের বাইরে ডেনমার্ক, জার্মান, পোল্যান্ডে যাচ্ছে। এসব দেশ ছাড়াও পৃথিবীর অন্যান্য দেশ বাংলাদেশে নির্মিত জাহাজ ক্রয় করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে জাহাজ নির্মাণ শিল্পের সূচনা প্রাচীনকাল থেকেই। ১৫ থেকে ১৭ শতাব্দীর মধ্যে আমাদের দেশে জাহাজ নির্মাণ শিল্পের সূচনা ঘটে। ১৮০৬ সালের দিকে চট্টগ্রাম শিপইয়ার্ড ১০০০ টন পণ্যবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণ করে। একই সময় বৃটিশ নৌবাহিনীর জন্য যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণ করা হয়। তখনকার সময়ে সম্পূর্ণ কাঠের জাহাজ নির্মাণ করা হতো। বর্তমান সময়ে সম্পূর্ণ স্টীলের বডি জাহাজ নির্মাণ করা হচ্ছে।

বর্তমানে পৃথিবীর মধ্যে জাহাজ নির্মাণ শিল্পে চীন সবার শীর্ষে থাকলেও বাংলাদেশ জাহাজ নির্মাণ শিল্পে চীনের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে। জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বাংলাদেশের শ্রমিকদের মজুরি চীন, কোরিয়া এবং জাপানের তুলনায় অনেক কম। কিন্তু দক্ষতার দিক দিয়ে বাংলাদেশের শ্রমিকরা অনেক এগিয়ে আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের নির্মিত জাহাজ নির্মাণ ব্যয় সর্ববৃহত্ জাহাজ নির্মাণকারী দেশ চীনের তুলনায় ১৫% কম। আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজ নির্মাণ শিল্পে ২০০ বিলিয়ন ডলারের শতকরা ২ ভাগ অর্ডার পেলে বাংলাদেশ জাহাজ নির্মাণ শিল্পে অনেক এগিয়ে যাবে। জাহাজ নির্মাণ শিল্পে প্রচুর মূলধনের প্রয়োজন হয়। যা নাকি এদেশে সব শিপইয়ার্ডের কাছ নেই। ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তি ও পরিশোধের নানা কঠিন শর্তের কারণে এখনো অনেক প্রতিষ্ঠান মন্দাভাব কাটিয়ে উঠতে পারছে না। বাংলাদেশে শতকরা ১৬ ভাগ সুদে ব্যাংক ঋণ নিয়ে ব্যবসা করতে হয়। অপরদিকে চীনে মাত্র শতকরা ৬ ভাগ সুদে ব্যাংক ঋণ পায়। শিপইয়ার্ডগুলো বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের জন্য শিপইয়ার্ডের মালিকরা কম সুদে ঋন প্রাপ্তির দাবী জানিয়েছেন। জাহাজ রপ্তানিতে বাংলাদেশের শিপ ইয়ার্ডগুলো মাত্র শতকরা ৫ ভাগ ইনসেনটিভ পায়। ভারতে পায় শতকরা ২৫ ভাগ। শিপইয়ার্ড মালিকদের পক্ষ থেকে এখানে ইনসেনটিভ ৫ ভাগ থেকে ১০ ভাগ উন্নীত করার দাবি জানানো হয়েছে। বর্তমানে দেশে আনুমানিক ১০ হাজার টন ধারণক্ষমতার রপ্তানিমুখী জাহাজ তৈরির ক্ষমতাসম্পন্ন ১০টি শিপ বিল্ডিং ইয়ার্ড রয়েছে। যেখানে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন জাহাজ তৈরি করা হয়। বাংলাদেশ থেকে এ পর্যন্ত ৪২টি জাহাজ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়েছে। এদের মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ১০ হাজার টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজ তৈরি করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। এসব শিপইয়ার্ড তৈরি করছে রপ্তানিমুখী জাহাজ। বর্তমানে বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিকভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে জাহাজ নির্মাণের ব্যাপারে চুক্তিবদ্ধ হচ্ছে। এ পর্যন্ত ২৫০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্ষুদ্র জাহাজ নির্মাণের জন্য ৪০০ বিলিয়ন ডলারের চাহিদা রয়েছে। দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্প যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে দেশের রপ্তানি পণ্য তালিকায় গার্মেন্টস শিল্পের পর জাহাজ নির্মাণ শিল্পের স্থান হবে। বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্পের গত ২৫ বছর ২৫ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। আর জাহাজ নির্মাণ শিল্পে গত ১৩ বছরে তার সমপর্যায়ে আয় করেছে।

২০০৮ সালে জার্মানির স্টেলা শিপিং কোম্পানীর কাছে প্রথম ‘এমভি স্টেলা ম্যারিস’ নামের সমুদ্রগামী বহুমুখী পণ্য পরিবহণের উপযোগী জাহাজ রপ্তানি করে আনন্দ শিপইয়ার্ড। এরপর জাহাজ রপ্তানিতে যুক্ত হয় চট্টগ্রামের ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড। গত আট বছরে বিশ্বের ১১টি দেশে মোট ৪২টি জাহাজ রপ্তানি থেকে প্রায় ১৬৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশে রপ্তানিমুখী জাহাজ নির্মাণশিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড রপ্তানি করেছে ২৭টি জাহাজ, যার মূল্য প্রায় ১৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। অবশিষ্ট জাহাজগুলো রপ্তানি করেছে আনন্দ শিপইয়ার্ড। জাহাজ নির্মাণ শিল্পের সম্প্রসারণ ও উত্কর্ষতা চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে তুলনা করা হচ্ছে এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও বাংলাদেশসহ এশিয়ার অল্প কয়েকটি শিপইয়ার্ড জাহাজ নির্মাণ অর্ডার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে পেরেছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা অ্যাঙ্কটাডের ‘রিভিউ অব মেরিটাইম ট্রান্সপোর্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ২০০৮-০৯ সালের তুলনায় ২০১৫-১৬ সালে ধরনভেদে ৪৬ থেকে ৮২ শতাংশ পর্যন্ত জাহাজের নির্মাণ আদেশ কমেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে বিশ্বে জাহাজ নির্মাণ শিল্পে শীর্ষস্থানটি ছিল চীনের। দ্বিতীয় অবস্থান দক্ষিণ কোরিয়ার, তৃতীয় জাপান। এ তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ২২তম। প্রতিবেশী ভারতের অবস্থান ২০তম। ইত্তেফাক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত