প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাজবাড়ী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল
চালুর অপেক্ষায় ২৪ বছর!

ডেস্ক রিপোর্ট : প্রায় ২৪ বছর আগে রাজবাড়ীর শ্রীপুরে পৌনে দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় ‘রাজবাড়ী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল’।

কালের কণ্ঠের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে শুরুতে এই টার্মিনালের মালিক ও পরিচালনার দায়িত্বে ছিল ‘রাজবাড়ী জেলা পরিষদ’। পরে মালিকানা ঠিক রেখে রাজবাড়ী পৌরসভার কাছে ইজারা দেওয়া হয় টার্মিনাল। তবে টার্মিনালের আর কোনো উন্নতি হয়নি। এটি চালুও হয়নি। বর্তমানে বিশাল আয়তনের টার্মিনালটি একটি ‘গাড়ি মেরামতের কারখানায়’ পরিণত হয়েছে। চুক্তির প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা বাকি ফেলেছে পৌরসভা। আর রাজস্ব আয় না পেয়ে ইজারা বাতিল চায় জেলা পরিষদ, তবে দুই দপ্তরের টানাটানির বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নিয়েছেন জেলা প্রশাসক।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, টার্মিনালটি একটি বাস-ট্রাক মেরামত কারখানায় পরিণত হয়েছে। টার্মিনাল ভবনের কিছু কিছু কক্ষ দখল করে রেখেছে বিভিন্ন পরিবহন শ্রমিক সংগঠন ও প্রভাবশালীরা।

তারা ইচ্ছামতো কক্ষগুলোতে ট্রাক ও বাস মেরামতের সরঞ্জাম রেখে ব্যবহার করছে। টার্মিনাল ভবনের একটি কক্ষ ও প্রবেশপথটি ‘নামাজের ঘর’-এর নামে দখল হয়েছে। দুই পাশে ইট দিয়ে দেয়াল তুলে বন্ধ করা হয়েছে প্রবেশপথটি। টার্মিনালের দরজা-জানালাগুলো ভাঙা। টার্মিনালে কোনো বাস আসে না, এখান থেকে ছেড়েও যায় না। পরিচর্যার অভাবে ময়লা-আবর্জনায় ভরে আছে টার্মিনাল। অনেক স্থানে পাথর, বালু রেখে ব্যবসা করছেন বহিরাগতরা। কোথাও আবার রাখা হয়েছে বিদ্যুতের খুঁটি।

স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান, রাজবাড়ী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে বাস না এসে শহরে যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো হয়। সে কারণে হরহামেশাই তৈরি হয় যানজট। যেসব বাস শহরের নতুন বাজার এলাকায় গিয়ে থামে সেগুলো এ টার্মিনাল থেকে পরিচালনা করলে ধীরে ধীরে জমজমাট হয়ে উঠত টার্মিনালটি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি বলেন, টার্মিনালটি বন্ধ থাকায় নামাজের জন্য প্রবেশপথ ইট গেঁথে আটকানো হয়েছে। টার্মিনালের ১০-১২টি কক্ষ বিভিন্ন বাস, ট্রাক ও গ্যারেজ মালিকরা ইচ্ছামতো ব্যবহার করছেন। কক্ষগুলোয় পরিত্যক্ত সিটসহ নানা মালপত্র রাখা হয়েছে। তবে টার্মিনাটি চালু হলেই কক্ষগুলোর দখল দখলদাররা ছেড়ে দেবে বলে জানা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন, যখন রাজবাড়ী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল তৈরি করা হয় তখন এটি শহরের বাইরে ছিল। এখন শহরের বিস্তৃতি ঘটেছে। শহরের প্রধান সড়কটিও শিগগিরই ফোর লেন হবে। ফলে টার্মিনালটি সচল করা জরুরি।

টার্মিনালের তিন পাশেই রয়েছে শতাধিক দোকান। এসব দোকান মালিক পৌরসভা থেকে জায়গা লিজ নিয়ে ঘর তুলে ব্যবসা করছেন। দোকানি আবুল হোসেন বলেন, অনেক আশা নিয়ে তিনি এ টার্মিনালে রেস্তোরাঁ (খাবার হোটেল) গড়ে তুলেছেন। তবে দীর্ঘদিনেও টার্মিনাল চালু না হওয়ায় রেস্তোরাঁটি লাভের মুখ দেখেনি। একই অবস্থা টার্মিনালের অন্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেরও। তবে ভালো অবস্থায় আছে বাস ও ট্রাক ‘মেরামত কারখানাগুলো’। তারা পুরোদমে ব্যবসা করছে।

রাজবাড়ী জেলা পরিষদ সূত্র জানায়, জেলা পরিষদের জমিতে এক কোটি ৭৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত টার্মিনালটি ১৯৯৪ সালের ১১ এপ্রিল তৎকালীন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী জাহানারা বেগম উদ্বোধন করেন। পরে রাজবাড়ী পৌর এলাকা বর্ধিত হলে টার্মিনাল পৌরসভার আওতায় চলে যায়। তাই ২০০০ সালে তা শর্ত সাপেক্ষে পৌরসভার কাছে ইজারা চুক্তির মাধ্যমে হস্তান্তর করে জেলা পরিষদ। শর্ত অনুযায়ী পৌরসভা প্রথম পাঁচ বছর এক লাখ টাকা করে এবং তার পর থেকে প্রতিবছর দুই লাখ টাকা করে জেলা পরিষদকে দেবে। কিন্তু দীর্ঘ ১৮ বছরে তারা জেলা পরিষদকে মাত্র এক লাখ টাকা দিয়েছে। বর্তমানে পৌরসভার কাছে জেলা পরিষদের পাওনা এক কোটি ৭২ লাখ ৫০ হাজার ৩৮৫ টাকা।

রাজবাড়ী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফকির আব্দুল জব্বার বলেন, ২০০২ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত নিরীক্ষা প্রতিবেদনে জেলা পরিষদের ইজারার টাকা অনাদায়ের জন্য গুরুতর আর্থিক অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত করে অডিট আপত্তি উত্থাপন করে অডিট অধিদপ্তর। ২০১২ সালেও টাকা পরিশোধের জন্য পৌরসভাকে চিঠি দেওয়া হয়। সম্প্রতি জেলা পরিষদের নির্বাচিত কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পৌর কর্তৃপক্ষকে ইজারার টাকা পরিশোধের জন্য বলা হয়। তবে পৌরসভা এ নির্দেশনা মানছে না। অথচ পৌরসভা প্রতিবছর টার্মিনাল ইজারা দিয়ে প্রচুর রাজস্ব আয় (দোকান বরাদ্দ ও টার্মিনালের সামনে দিয়ে যাওয়া গাড়ি ইত্যাদি থেকে) করছে। গত ৩১ মে বিষয়টি জানিয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবকে চিঠি দেওয়া হয়। তাতে টার্মিনালটি ফের জেলা পরিষদের অধীনে হস্তান্তর করা অথবা ইজারার টাকা পরিশোধের কথা বলা হয়েছে। চেয়ারম্যান জানান, বিষয়টি নিয়ে গত মঙ্গলবার জেলা প্রশাসকের অফিসকক্ষে তাঁরা পৌর মেয়রসহ মতবিনিময়সভায় বসেছিলেন। সভায় তিনি বলেছেন, নিয়মিত টাকা পরিশোধ করতে হবে নতুবা টার্মিনালের দখল ছেড়ে দিতে হবে।

রাজবাড়ী পৌরসভার মেয়র মহম্মদ আলী চৌধুরী জানান, জেলা প্রশাসকের মধ্যস্থতায় তাঁরা আগামী বছরের জুন মাস পর্যন্ত ইজারার টাকা পরিশোধের সময় নিয়েছেন জেলা পরিষদের কাছ থেকে। তিনি বলেন, টার্মিনালটি এখনো চালু করা যায়নি। এটি চালু করতে জেলা প্রশাসকের কাছে তাঁরা দাবি জানিয়েছেন।

জেলা প্রশাসক শওকত আলী জানান, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জেলা পরিষদকে ইজারার টাকা পরিশোধ না করলে পৌরসভাকে টার্মিনালটি ছেড়ে দিতে হবে। তা ছাড়া টার্মিনাল চালু করার দায়িত্ব পৌরসভার। তারা সহযোগিতা চাইলে করা হবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত