প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গ্লোবাল ভিলেজ স্পেসের বিশ্লেষণ
নেপালের পর মালদ্বীপেও ভারতের প্রভাব খর্ব হচ্ছে

মাছুম বিল্লাহ : অতি কাছের প্রতিবেশি নেপালে চীনপন্থী রাজনৈতিক বাম জোট নির্বাচিত হয়েছে। এ কারণে নেপালে ভারতের প্রভাব একেবারে হ্রাস পাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এ ঘটনার কয়েকদিনের মাথায় চীনের সঙ্গে বড় ধরণের বাণিজ্যিক চুক্তি করেছে মালদ্বীপ। এরপর থেকেই দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নেপালের পর মালদ্বীপেও ভারতীয় প্রভাব খর্ব হতে যাচ্ছে।

গ্লোবাল ভিলেজ স্পেসের এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। পত্রিকাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মালদ্বীপের একটি সংবাদপত্রে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে সমালোচনা করে সম্পাদকীয় প্রকাশের পর তা নিয়ে রাজনৈতিক ঝড় উঠেছে। দক্ষিণ এশিয়ার ছোট্ট এই দেশটির উপর ভারতের প্রভাব যে কমে যাচ্ছে, এটা তার সাম্প্রতিক উদাহরণ।

স্থানীয় ধিভেহি ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রটিতে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি ভারতকে মালদ্বীপের সবচেয়ে বড় শত্রু এবং নরেন্দ্র মোদিকে মুসলিম-বিদ্বেষী চরমপন্থী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংবাদপত্রটিকে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট আবদুল্লা ইয়ামিনের মুখপাত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এর আগে একটি বিশেষ ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্বের কারণে অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের বিরাগভাজন হয়েছে। এখন তারা নতুন করে রাজনৈতিক ঝড়ের মুখে পড়তে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। ইয়ামিনপন্থী একটি পত্রিকা তাদের সম্পাদকীয়তে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ‘হিন্দু চরমপন্থী নেতা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। সম্পাদকীয়তে তাকে ‘মুসলিম-বিদ্বেষী’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।

মোদির সমালোচনা করে সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ভারত তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। এতে বলা হয়, চীনের দিকে হাত বাড়ানোর মাধ্যমে নতুন ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ পেয়েছে মালদ্বীপ। সম্পাদকীয়তে এমনকি ইয়ামিন সরকারের বিরুদ্ধে একটি ক্যু প্রচেষ্টায় ভারত জড়িত ছিল বলেও অভিযোগ করা হয়।

এতে বলা হয়েছে, কাশ্মীরে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে ভারত। শ্রীলঙ্কায় তামিল সন্ত্রাসীদের অস্ত্র সরবরাহের জন্যও ভারতকে দায়ী করা হয় সম্পাদকীয়তে।

প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে মালদ্বীপই একমাত্র দেশ যেখানে এখনও সফর করেননি মোদি। প্রধানমন্ত্রী মোদির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনায় ভারতীয় কর্মকর্তারা খানিকটা হতচকিত হলেও এ বিষয়ে তারা কোন মন্তব্য করেননি।
‘অসংযত’ ভারত-বিদ্বেষী সম্পাদকীয়র বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছে মালদ্বীপের বিরোধী দলগুলো।

ভারতপন্থী বিরোধী দল মালদ্বীভিয়ান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এমডিপি) বলেছে, এই ধরনের আচরণ ভারতকে সতর্ক করে দেবে যাতে তারা ইয়ামিন প্রশাসনকে অতিরিক্ত প্রশ্রয় না দেয়। এমডিপি নেতা ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেদ নাসিম টাইমস অব ইন্ডিয়াকে বলেন, ভারতের বেশ কিছু পদক্ষেপ ভারত ও মালদ্বীপ দুই দেশের জন্যেই ইতিবাচক হবে। সেখানে এ ধরনের আত্মতুষ্টিকর কথাবার্তায় কোন সঙ্কটের সমাধান হবে না।

তামিল সন্ত্রাসীদের প্রসঙ্গটি এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীলঙ্কার ইসলামাবাদ-ঘেঁষা নীতি নয়াদিল্লির কাছে ছিল খুবই কষ্টকর। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে জ্বালানি সরবরাহ করেছিল তারা। ইন্দিরা গান্ধীর সময়ে ভারত শ্রীলঙ্কায় তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেছিল। ফলে বিভিন্ন তামিল গ্রুপ গড়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত তামিল টাইগার সংগঠনের জন্ম হয়। এ কারণে, ১৯৮৭ সালে ইন্দো-শ্রীলঙ্কা চুক্তি করতে বাধ্য হয় শ্রীলঙ্কা। যে চুক্তির অধীনে শ্রীলঙ্কায় ঘাঁটি স্থাপন করে ইন্ডিয়ান পিস-কিপিং-ফোর্স (আইপিকেএফ)।

১৯৮৮ সালের নভেম্বরে পিপলস লিবারেশান অর্গানাইজেশান অব তামিল ইলামের ৮০ জন সশস্ত্র জঙ্গি স্পিডবোটে করে মালদ্বিপের উপকূলে হাজির হয়। সেখানে আগে থেকে দেশের ভেতরে ছড়িয়ে থাকা বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে সরকার দখলের প্রক্রিয়া শুরু করে তারা। ওই ষড়যন্ত্র হয়েছিল শ্রীলঙ্কায়। মনে করা হয়, ওই ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত ছিল মালদ্বীপের ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং মামুন আব্দুল গাইয়ুমের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো।

স্থানীয়রা চেয়েছিল রাজনৈতিক পট পরিবর্তন আর তামিলরা খুঁজছিল তাদের কর্মকা- চালানোর জন্য একটা নিরাপদ জায়গা।

মালদ্বীপ সরকারকে সাহায্য করার জন্য তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ১৬০০ সেনা পাঠান। ‘অপারেশান ক্যাকটাস’ নামে পরিচিত ওই অভিযানে ১২ ঘন্টার মধ্যে মালদ্বীপ পৌঁছায় ভারতীয় সেনারা। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ক্যু প্রচেষ্টা প্রতিহত করে তারা মালদ্বীপের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। অভিযানে ১৯ তামিল যোদ্ধা নিহত হয়। আহত হয় একজন মাত্র ভারতীয় সেনা।

ওই অভিযানকে পররাষ্ট্র সম্পর্কের জন্য বড় বিজয় হিসেবে বিবেচনা করে ভারত। তবে সে সময় শ্রীলঙ্কার একটি সংবাদপত্রে মন্তব্য করা হয়, ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদ সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে একদিকে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে সুযোগ সুবিধা দেয়া, অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষুদ্র জাতিগুলোর ভীতিকে এড়িয়ে যাওয়া হবে উটপাখী-সুলভ আচরণ।’

আবদুল্লা ইয়ামিনের নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে ইন্দো-মালদ্বীপ সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়েছে। ভারত মাত্র গত সপ্তাহে মালে’কে তার ‘ইন্ডিয়া ফার্স্ট’ নীতি সম্পর্কে সচেতন করেছে। এমইএ মুখপাত্র রাভিশ কুমার বলেছেন, ভারত প্রত্যাশা করে, তাদের উদ্বেগের ব্যাপারে মালদ্বীপ যত্নবান হবে।

চীনের সাথে মালে এফটিএ স্বাক্ষরের পর এবং বিরোধীদের মত উপেক্ষা করে সংসদে এটা পাশ করার পর ভারতের পক্ষ থেকে এ মন্তব্য করা হলো। এর কয়েকদিন পরেই ভারতীয় রাষ্ট্রদূত অখিলেশ মিশ্র’র সাথে ‘অননুমোদিত’ বৈঠকে অংশ নেয়ার দায়ে তিনজন কাউন্সিলরকে বরখাস্থ করা হয়।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত