প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কেন এমন ভুতুড়ে, ধোঁয়াশে?

প্রতীক ইজাজ : সহকর্মী উৎপল ফিরেছে, স্বস্তির, আনন্দের। কিন্তু এই যে হঠাৎ উধাও, কেউ কিছুই বলতে পারে না, অস্বস্তি উদ্বেগ উৎকন্ঠা, তারপর একদিন হঠাৎ প্রত্যার্পন, মুখ চুপ, কেউ কিছু বলে নাÑ এই সংস্কৃতির কী হবে? আমরা কি এভাবেই এমন যন্ত্রণাকাতর জীবন পার করব? নাকি এর কোনো প্রতিকার আছে? কে দেখবে, কার দেখার দায়িত্ব, কিছুই স্পষ্ট নয়। রাষ্ট্র, সরকার, নাগরিক, সংবিধান- কত নিরাপত্তা, অধিকার, মানবিকতা। তা হলে কি এসবই কাগুজে, দেখানো, নাকি কেবল বড় বড় আইন প্রণয়ণে। আইন যদি প্রয়োগই না হয়, দরকার কি প্রণয়নের।

আমরা জানি না। বোঝার চেষ্টা করি। মাথায় ঢোকে না। বন্ধ সব। চারদিক অন্ধ, জটিল। অস্পষ্ট। কেউ মুখ খোলে না। যে উধাও সে-ও না। কোথায় থাকে, কিভাবে থাকে, কিছুই জানা হয় না আমাদের। এখানে গল্পও নেই। কান্না আছে। ক্ষোভ আছে। কষ্ট আছে। মা কাঁদে, বাবা কাঁদে। সজল চোখে পথের দিকে তাকিয়ে থাকে বোন, ভাই, সন্তানেরা। মাঝরাতে প্রিয়তমা স্ত্রীর ফুপিয়ে কান্না জাগায় রাতকে।
আমরাও জেগে থাকি। এ জাগা নয়। চোখে মেলে থাকা। জেগে থাকলে কথা বলতে ইচ্ছে করে। কারণ জানতে ইচ্ছে করে। রাস্তায় দাঁড়াই। ফেস্টুন ব্যানার ঝুলাই। মিছিল করি। স্লোগান দিই। ফল মেলে না। উদ্বেগ ঘিরে ধরে। পেছনে তাকাই। কেউ নেই। দেশ ঘুমিয়ে। অন্ধকার লাগে। ভাবি, কাল থেকে আর এটুকুও নয়। চোখকে বলি চোখÑ তুমি ঘুমিয়ে যাও।

উৎপল নিজেই বলেছে, কে বা কারা তাকে ধানমন্ডি থেকে নিয়ে যায়। মাঝখানে দুই মাস ১০ দিন এক স্যাঁতসেতে মেঝেতে। দরজার ফাঁক দিয়ে তিনবেলা খাবার। সংলগ্ন বাথরুমে স্নান। অবশেষে ১৯ ডিসেম্বর ২০১৭ মঙ্গলবার রাতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থেকে উদ্ধার। এর আগে চোখ বেধে তিন-চার ঘণ্টা একটা গাড়িতে করে ঘোরানো। এর বেশি কিছু জানে না ছেলেটি। কারা তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল, ও বলতে পারে না। যেদিন দুপুরে ধানমন্ডির স্টার কাবাবের সামনে থেকে ওকে তুলে নেওয়া হয়, হতভাগ্য উপৎল সে সময় কাউকে দেখতে পায়নি। তবে এটুকু বলেছে, অপহরণকারীরা তার কাছে টাকা দাবি করেছে।

উৎপল বলতে গেলে কিছুই জানে না। জানার কথাও না। আগে প্রাণ, বেঁচে থাকা। এত বড় রাষ্ট্র, শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, হাজারো প্রকল্প নিয়ে ব্যস্ত এত বড় মন্ত্রণালয়, এরাই যখন জানতে পারে না, জানে না, সেখানে উৎপল তো নস্যি।
আমরা খুব সতর্ক। সতর্ক ব্যক্তি গোষ্ঠী, প্রতিষ্ঠান বুঝে। কাছের মানুষকে কত শক্ত কথা বলি, পরে মনে মনে কাঁদি। যে সংকট সর্বজনীন, সামস্টিকতার, সেখানে কিছু বলতে পারি না। বলি না। ইচ্ছে করে। মনে মনে ফুঁসি। ক্ষুব্ধ হই। চায়ের টেবিলে, সিগারেটের ধোয়ায়, তর্কে-বিতর্কে কত ভাবনা উড়িয়ে দেই শূন্যে। শব্দ করি না। বেরুয় না। হাঁটতে হাঁটতে ভাবি, একটা আশ্রয় দরকার আমাদের। শক্ত আশ্রয়। যেখানে অকপটে সব কথা বলতে পারব। বলা হবে।

মঙ্গলবার রাতে ঘুমুতে পারিনি। আমি একা নই, অনেকেই। বলতে গেলে গোটা গণমাধ্যম। ফেসবুক, অনলাইন খোলা ছিল। উৎপলের ফেরার গল্প বলছিল ওরা। তথ্য জানাচ্ছিল। রুপগঞ্জের ভুলতা সিএনজি স্টেশন থেকে নরসিংদির রায়পুরা- দীর্ঘ পথ, দীর্ঘ যাত্রা। দীর্ঘই বটে। কেননা হারানো ছেলেকে ফিরে পাওয়ার যে সময়, মা-বাবা, স্বজনের কাছে তার যাত্রা দীর্ঘ, লম্বা। কতজন কত কি মন্তব্য করছিল। অভিনন্দন, শুভ কামনা। শঙ্কা, অস্বস্তিও ছিল।

আমার কেবলই ছেলেটার লালসিঁদুরে মার মুখ মনে পড়ছিল। ক্লান্ত মুখে আনন্দ ঝিলিক দিচ্ছিল। কিন্তু হাসি নেই মুখে। কেন নেই- জানতে ইচ্ছে করছিল। ছেলে তো ফিরেছে, ঝক্কি-ঝামেলা শেষ, হাসবে না কেন মা? তা হলে কি এখনো কোন শঙ্কা তাড়া করছে তাকে? নাকি ডুবে যাওয়া শঙ্কা থেকে ওঠায় হয়নি? উৎপলকে ঘিরে অনেক প্রশ্ন। ফিরে আসা, উধাও হওয়া, মাঝখানের সময়। কোথায় ছিল, কারা নিয়ে গেল, অপহরণকারীরা কি চায়, কেনইবা নিল- অনেক প্রশ্ন। নাকি বেখেয়ালি উৎপল নিজেই হারিয়ে গিয়েছিল বাউলিয়ানায়। পেশাই কি কাল হয়েছিল ওর? নাকি অন্য কোন কারণ, যা আমরা জানি না। ওর পরিবার, কোন আত্মীয়, বা এমন কোন ঘটনা, যেটা উৎপলও জানে না। কী এমন রহস্য এর নেপথ্যে? কেনইবা এমন ভুতুড়ে, ধোয়াশে?

আমাদের একটি সংবিধান আছে। রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ আইন। মুল নিয়ামক। সেখানে সমাজের যে ক্ষুদ্রতর ব্যক্তি বা ঘটনা, তারও নিরাপত্তা নিশ্চিতের নির্দেশ রয়েছে। ‘অনুচ্ছেদ- ২৭: আইনের দৃষ্টিতে সমতা’য় স্পষ্ট বলা আছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ এই সংবিধান ব্যক্তি স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের কথাও বলেছে। আর সে দায়িত্ব রাষ্ট্রের, রাষ্ট্র পরিচালনায় ক্ষমতাসীন সরকারের। অর্থাৎ এই যে অপহরণের ঘটনা ঘটছে, মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে, একটি অসাধু চক্র যে কোন কারণেই হোক এমন অপরাধ করছে, আইনের বাইরে আইন প্রয়োগ করছে, এর প্রতিকার সরকারকেই করতে হবে। অপরাধীদের ধরতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণায়কে উদ্যোগ নিতে হবে। প্রত্যেকটি ঘটনার সুরাহা হতে হবে। প্রকাশ করতে হবে। যে বা যারাই জড়িত থাক না কেন, আইনের হাতে সোপর্দ করতে হবে। তবেই মিলবে ভবিষ্যত সংকটের সমাধান।

এই যে এমন দাবি নাগরিকদের, এ নিছক দাবি নয়। কিংবা কেবল সংবিধানের নির্দেশই নয়। একটি সভ্য সুন্দর শোভন সমাজ ও মানবিক রাষ্ট্রের জন্য এমন দাবি সর্বজনগ্রাহ্য, সর্বময় মানুষের। একজন নাগরিক, হোক সে দুর্বল, কালো, দরিদ্র, কিংবা ভবঘুরে; এই রাষ্ট্র, সরকার, রাষ্ট্রের সবকিছুর অংশীদার সে-ও। তার নির্বিঘ্ন জীবন চাই, শঙ্কামুক্ত সময়। ভয় নিয়ে, ভীতির সাথে চলতে ভাল লাগে না। কাজে মন বসে না। ভুলে যাই সব। মন খারাপ থাকে। সোজা কাজটাও কঠিন লাগে। ঘর বাহির সব সমান মনে হয়। সুরগুলো গান হয় না। গান সুরে লাগে না। ভেতরে যে শব্দ, তাতে গীতি হয় না। যে শিশু খেলবে বলে রমনার আব্দার ধরে, তাকে নিয়ে যাওয়া হয় না আমাদের। ক্ষমতার রাজনীতি, প্রতাপময় সময়ের কাছে নতজানু হই আমরা। আর আমরা মানেই তো দেশ, স্বদেশ, স্বভূমি।
লেখক: সাংবাদিক, কবি ও সংস্কৃতিকর্মী

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত