প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শরীয়তের দৃষ্টিতে নিকাব

মুফতি আখতার ফয়জী : নামাজ রোজা হজ্ব যাকাত যেমন ফরজ ইবাদত ঠিক তেমনই পর্দা ফরজ ইবাদত। আল্লাহর আদেশ মানার ক্ষেত্রে বিকৃতি সাধন করা মানুষের সাধ্যের বাহিলে। তাই বিধান অনুযায়ি জীবন যাপনেই নিহিত রয়েছে কল্যাণ, নিহিত রয়েছে ইহকালীন ও পরকালীন অনন্ত সুখ আর শান্তি। পর্দা বিষয়ে আল্লাহ আল্লাহর রাসুল (সা.) এর বিবিদের সামনে রেখে গোটা মুসলিম উম্মাহকে লক্ষ্য করে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের, আপনার কন্যাদের ও মুমিনদের নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের জিলবাবের একাংশ নিজেদের (মুখের) উপর নামিয়ে দেয়। (সূরা আহযাব-৫৯)‘জিলবাব’ অর্থ বড় চাদর, যা দ্বারা মুখমন্ডল ও পূর্ণ দেহ আবৃত করা যায়। (আলজামি লিআহকামিল কুরআন, কুরতুবী ১৪/২৪৩)

ইমাম আবু বকর রাযী আলজাসসাস রাহ. লিখেছেন-‘এই আয়াত থেকে প্রমাণ হয়, বাইরে বের হওয়ার সময় পরপুরুষের দৃষ্টি থেকে নারীর মুখমন্ডল আবৃত রাখা এবং পর্দানশীন পবিত্র নারীর বেশ গ্রহণ করা অপরিহার্য, যাতে দুষ্ট লোকেরা তাদের প্রতি উৎসাহী না হয়।’(আহকামুল কুরআন, জাসসাস ৩/৩৭২, তাফসীরে বায়যাবী-২/২৮০, তাফসীরে জালালাইন ৫৬০)

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘ইহরাম গ্রহণকারী নারী যেন নেকাব ও হাতমোজা পরিধান না করে।’ (বুখারী-১৮৩৮) এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, নবী সা. এর যুগে মেয়েরা তাদের হাত ও মুখমন্ডল আবৃত রাখতেন। এ কারণে ইহরামের সময় নেকাব ও দস্তানা না পরার আদেশ করতে হয়েছে। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. আল্লাহর রাসূল সা.এর সাথে তাঁর হজ্বের বিবরণে বলেছেন, ‘ইহরামের কারণে তারা নেকাব খোলা রাখতেন, কিন্তু যখন পুরুষেরা নিকট দিয়ে অতিক্রম করত তখন তারা মুখমন্ডল আবৃত করে ফেলতেন। তারা চলে যাওয়ার পর নেকাব তুলে ফেলতেন।’ (মুসনাদে আহমদ, আবু দাউদ-১৮৩৩,সুনানে ইবনে মাজাহ হাদীস-১৭৫৭) আসমা বিনতে আবু বকর রা. বলেন, ‘আমরা পুরুষদের সামনে মুখমন্ডল আবৃত রাখতাম। (মুসতাদরাক হাকিম ১/৪৫৪) ফাতিমা বিনতুল মুনযির রাহ. বলেন, ‘আমরা আসমা বিনতে আবু বকর রা.এর সাথে ইহরাম অবস্থায় থাকাকালে আমাদের মুখমন্ডল ঢেকে রাখতাম।’ (মুয়াত্তা, ইমাম মালেক-১/৩২৮) হযরত আয়েশা রা. ইফ্কের দীর্ঘ হাদীসে বলেছেন-‘আমি আমার স্থানে বসে ছিলাম। একসময় আমি ঘুমিয়ে পড়ি। সফওয়ান ইবনে মুয়াত্তাল আসসুলামী ছিল বাহিনীর পিছনে। সে যখন এখানে পৌঁছল তখন একজন ঘুমন্ত মানুষের আকৃতি দেখতে পেল। এরপর সে আমার নিকট এলে আমাকে চিনে ফেলল। কারণ পর্দা বিধান অবতীর্ণ হওয়ার আগে সে আমাকে দেখেছিল। তখন সে ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন বলে ওঠে, যার দরুণ আমি ঘুম থেকে জেগে উঠি এবং ওড়না দিয়ে নিজেকে আবৃত করে ফেলি। অন্য রেওয়ায়েতে আছে, ‘আমি ওড়না দিয়ে আমার চেহারা ঢেকে ফেলি।’ (বুখারী-৫/৩২০, মুসলিম-২৭৭০, তিরমিযী-৩১৭৯)

চার মাজহাবের ইমামগণও নেকাবের ব্যাপারে একমত। চার মাযহাবের কিছু বিখ্যাত গ্রন্থের নাম উল্লেখ করছি, যেগুলোতে চেহারা আবৃত রাখার বিধান পরিষ্কার ভাষায় উল্লেখ হয়েছে। হানাফী মাযহাব, আহকামুল কুরআন, আলজাসসাস ৩/৩৭১-৩৭২, ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৪০৭, আদ্দুররুল মুখতার (রদ্দুল মুহতারের সাথে-৬/৩৭০,রদ্দুল মুহতার (ফতওয়া শামী) ১/৪০৬, আলবাহরুর রাইক ২/২৭০। মালেকী মাযহাব, আহকামুল কুরআন, ইবনুল আরাবী ৩/১৫৭৯, আলজামি লিআহকামিল কুরআন, কুরতুবী ১২/১১৫, আকরাবুল মাসালিক, আহমদ দরদীর ১/২৮৯, আরিজাতুল আহওয়াযী, ইবনুল আরাবী ৪/৫৬; মাওয়াহিবুল জলীল, হাত্তাব ২/১৮১, হাশিয়াতুদ দুসূকী, মুহাম্মাদ আদ দুসূকী ১/২১৪। শাফেয়ী মাযহাব, রওযাতুত তালেবীন ৭/২১, হাওয়াশিশ শিরওয়ানী ২/৩৩৩। হাম্বলী মাযহাব, আল আদাবুশ শরইয়্যা, ইবনু মুফলিহ ১/২৯৭, আলমুগনী, ইবনে কুদামা ২/৩২৮, আলইনসাফ, মারদাভী ১/৪৫২। কেউ কেউ পরপুরুষকে মুখমন্ডল ‘প্রদর্শন করা যাবে’ প্রমাণের জন্য সূরা নূরের ৩১ নং আয়াতের তরজমা পেশ করে থাকেন। এ ব্যাপারে ইলমি অগভীরতা ও সাহাবীদের ব্যাখ্যাকে ভুল ভাবে পেশ করা ছাড়া আর কিছুই নয়। লেখক: প্রধান মুফতি, জামিয়া মাদানিয়া রওজাতুল উলূম,কুমিল্লা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত