প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অস্তিত্ব সংকটের মুখে দেশীয় উড়োজাহাজ কোম্পানি

ডেস্ক রিপোর্ট : উড়োজাহাজের ল্যান্ডিং ও পার্কিং চার্জ এবং অত্যধিক জ্বালানিমূল্যের কারণে ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছে দেশি এয়ারলাইন্সগুলো; প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না বিদেশিগুলোর সঙ্গে।

দেশে গত দুই যুগে অনুমোদন পাওয়া ৯ বেসরকারি এয়ারলাইন্সের মধ্যে ৬টি বন্ধ হয়ে গেছে। বিদ্যমান তিন প্রতিষ্ঠান আছে বেকায়দায়। সিভিল অ্যাভিয়েশন নির্ধারিত বিভিন্ন চার্জ তো রয়েছেই, উপরন্তু পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় জেট ফুয়েলের দামও অনেক বেশি। তাই মুনাফা দূরের কথা, আয়ের চেয়ে ব্যয় হচ্ছে বেশি। এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত এয়ারলাইন্স বিমান বাংলাদেশের অবস্থাও নাজুক; আগের অর্থবছরের তুলনায় কমেছে মুনাফা। এদিকে জানুয়ারির ১ তারিখ থেকে বিমানকে বাকিতে জেট ফুয়েল সরবরাহ না করার ঘোষণা দিয়ে চিঠি দিয়েছে পদ্মা অয়েল কোম্পানি।

দেশে ৯টি বেসরকারি উড়োজাহাজ সংস্থা অ্যাভিয়েশন ব্যবসা শুরু করেছিল। ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ৬টি। বাজারে থাকা ৩টি প্রতিষ্ঠানÑ ইউএস বাংলা, নভোএয়ার এবং রিজেন্ট এয়ারের অবস্থাও সংকটাপন্ন। বৃহৎ পুঁজির এ ব্যবসা এখন লোকসানের মুখে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এয়ারলাইন্সগুলোর রয়েছে ভৌত অবকাঠামোগত সমস্যা। বিমানবন্দরের ভেতরে (এয়ার সাইড) ফ্লাইট অপারেশন, মেইনটেন্যান্স শপ, গ্রাউন্ড অপারেশন এবং মেইনটেন্যান্স হ্যাঙ্গার দরকার, যা বাংলাদেশ বিমান ছাড়া অন্য এয়ারলাইন্সের নেই। এতে এয়ারক্রাফটের রক্ষণাবেক্ষণ কঠিন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া যন্ত্রাংশ আমদানি ও কাস্টমস জটিলতাও রয়েছে। উড়োজাহাজ সচল রাখতে যন্ত্রাংশ আমদানি এবং মেরামতে দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ায় পড়তে হয়। আর যন্ত্রাংশ আমদানির জন্য প্রচলিত লেটার অব ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি অন্য বিক্রেতা দেশের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। অথচ মানি ট্রান্সফার বা টিটি এবং অনলাইন ট্রান্সফার পদ্ধতি এখনো চালু হয়নি দেশে। আছে শুল্কায়ন জটিলতা। এ নিয়ে প্রায়ই বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। এ ছাড়া অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জের ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাটের বিষয়েও আপত্তি আছে এয়ারলাইন্স কোম্পানিগুলোর। সর্বোপরি, এক বছরে জেট ফুয়েলের দাম ৪ দফা বৃদ্ধি মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে উড়োজাহাজ ব্যবসার ওপর। এসবের প্রভাব পড়ছে যাত্রীদের টিকিটেও। বিশেষ করে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সারচার্জ ‘তুলনামূলক বেশি’ উল্লেখ করে তা প্রত্যাহার করতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে এয়ারলাইন্স কোম্পানিগুলো।

অবশ্য এ নিয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটির (বেবিচক) আয়ের প্রধান উৎস উড়োজাহাজের ল্যান্ডিং ও পার্কিং চার্জ। এসব দিয়েই বিমানবন্দর মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন কার্যক্রম চলে। তাই বেবিচকের চার্জ মওকুফ বা কমানো হলে ব্যয় বহন কঠিন হয়ে পড়বে।

জানা গেছে, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ বন্ধ হয়েছে প্রায় ২ বছর আগে। প্রতিষ্ঠানটির কাছে বেবিচকের বিভিন্ন চার্জ বাবদ এখনো পাওনা দেড়শ কোটি টাকার বেশি। এই টাকা মওকুফে প্রতিষ্ঠানটি চিঠি দিলে এখন এ নিয়ে চলছে ফাইল চালাচালি।

এদিকে গত বুধবার বাংলাদেশ বিমানের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিমানের নিট মুনাফা হয়েছে ৪৭ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরে (২০১৫-১৬) ছিল ২৩৫ কোটি টাকা। এরও আগের বছর বিমানের নিট মুনাফা ছিল ৩২৪ কোটি টাকা। আগের তুলনায় মুনাফা কমে যাওয়ার ব্যাখ্যায় বিশ্ববাজারের তুলনায় বাংলাদেশে জেট ফুয়েলের তুলনামূলক বাড়তি মূল্য, কার্গো পরিবহনে যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা এবং এশীয় অ্যাভিয়েশন মার্কেটে এয়ারলাইন্সগুলোর মধ্যে ভাড়া নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতাকে দায়ী করেছে বিমান কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, বিমানের কাছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) পাওনা ১ হাজার ৬৪২ কোটি ১১ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও বকেয়া পরিশোধ না করায় আগামী ১ জানুয়ারি থেকে বিমানকে বাকিতে জেট ফুয়েল সরবরাহ না করার ঘোষণা দিয়ে চিঠি দিয়েছে পদ্মা অয়েল কোম্পানি। গত ছয় মাসে চার দফায় উড়োজাহাজের জ্বালানি জেট ফুয়েলের দাম বাড়িয়েছে বিপিসি। আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জেট ফুয়েলের দাম পড়বে প্রতিলিটার ৬৪ সেন্ট (৫৩ টাকা ৪৭ পয়সা)। আর চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পড়বে ৬৩ সেন্ট (৫২ টাকা ৬৪ পয়সা)। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দেশি-বিদেশি উড়োজাহাজে জেট এ-১ ফুয়েল সরবরাহ করে পদ্মা অয়েল। সব দেশি-বিদেশি কোম্পানি নগদ মূল্যে জ্বালানি সংগ্রহ করলেও বিমান বাকিতে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে। সর্বশেষ গত অক্টোবর পর্যন্ত বিমানের কাছে পদ্মা অয়েলের বকেয়ার পরিমাণ ১ হাজার ৬৫০ কোটি ১৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা।

আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত জেট ফুয়েল বিক্রি হয়। এর বেশি সুফল পাচ্ছে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো। কারণ বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোই বেশি ফ্লাইট পরিচালনা করছে। দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোকে অভ্যন্তরীণ রুটের ফ্লাইটের ক্ষেত্রে বেশি দামে জেট ফুয়েল কিনতে হচ্ছে। এর ফলে এয়ারলাইন্সগুলো যাত্রীদের টিকিটের দাম বেশি নিচ্ছে। যদিও প্রতিবেশী দেশ ভারতে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের ক্ষেত্রে এয়ারলাইন্সগুলো আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের তুলনায় বিশেষ কর সুবিধা পায়। এ ছাড়া আশপাশের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে অ্যারোনটিক্যাল চার্জ বেশি। প্রতিবার আন্তর্জাতিক ফ্লাইট শেষে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যে কোনো বিমানবন্দরে ল্যান্ডিংয়ের জন্য একটি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজকে ৩৩ হাজার ৯২৪, এটিআর ৭২-কে ৪৬ হাজার ৩১৫, এমব্রয়ার ১৪৫-কে ৪৬ হাজার ৮৩২, বোয়িং ৭৩৭-কে ১ লাখ ১২ হাজার ৩৪০, এমডি ৮৩-কে ১ লাখ ২০ হাজার ৪১৮ ও এয়ারবাস ৩১০-কে ২ লাখ ৮০ হাজার ৫০৮ টাকা চার্জ দিতে হয়। আর প্রতিবার অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট শেষে ল্যান্ডিংয়ের জন্য একটি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে ২ হাজার ৪০৩ টাকা চার্জ দিতে হয়। একইভাবে এটিআর ৭২-কে ৩ হাজার ৯২২, এমব্রয়ার ১৪৫-কে ৪ হাজার ১৭৫, বোয়িং ৭৩৭-কে ১৮ হাজার ৬১৯, এমডি ৮৩-কে ১৯ হাজার ১৪৬, এয়ারবাস ৩১০-কে ৫২ হাজার ৩৩১ টাকা চার্জ গুনতে হয়।

অ্যাভিয়েশন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নানা কারণে আকাশপথ এখন যাত্রীদের কাক্সিক্ষত মাধ্যম। তাই দেশীয় এয়ারলাইন্সকে টিকিয়ে রাখতে বিশেষ নজর দিতে হবে। জ্বালানির মূল্য এবং বেবিচকের চার্জ সহনীয় পর্যায়ে আনা যেমন জরুরি, তেমনি দরকার সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন। রোধ করতে হবে যন্ত্রাংশ আমদানির জটিলতাও। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে থাকা দরকার ইলেকট্রনিক ট্রান্সফার পদ্ধতি।

সূত্র : আমাদের সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত