প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘জিন্দা লাশ’ মোশাররফ

ডেস্ক রিপোর্ট : কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল থেকে ১৯ দিন পর গত বুধবার ছাড়া পেলেন মোশাররফ। তখন সকাল গড়িয়ে দুপুর।

হাসপাতালের সামনে ভিড়। রোগী, তাদের স্বজন ও চিকিৎসকদের ব্যস্ততা। যানবাহনে ঠাসা হাসপাতালের সামনের রাস্তা। আরোগ্য লাভ করে যারা ছাড়া পেয়েছে, তারা ছুটছে বাড়ির দিকে। কিন্তু রাজমিস্ত্রি মোশাররফের কোনো তাড়া নেই। ঘাড়ের ক্ষতটা ভালোভাবে শুকায়নি। একটু এদিক-ওদিক করলেই চিনচিনে ব্যথাটা টের পান। ভাবছিলেন, বাড়ি ফিরে কী হবে! যাদের জন্য বাড়ি ফেরা, তারাই তো কেউ নেই। স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে সবাই তাঁকে রেখে পরপারে চলে গেছে। তবু ভাগ্যজোরে বেঁচে যাওয়া বড় মেয়ে মেহোনার টানে বিকেলে বাড়ি ফিরলেন তিনি।

বাড়িতে কথা হচ্ছিল কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের তারাকান্দি গ্রামের রাজমিস্ত্রি মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে। গত ২ ডিসেম্বর জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে ভাতিজা আব্দুল কবির মবিনের হাতে নির্মমভাবে খুন হয় তাঁর স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তান। ভাতিজা তাঁর সাজানো সংসার তছনছ করে দেয়। যে বাড়িটি ছিল প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর, তা আজ যেন মৃত্যুপুরী। চারদিকে শূন্যতা। বাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে; কিন্তু মানুষগুলো নেই। সব হারিয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছেন তিনি। শুধু বেঁচে যাওয়া মেয়েটিই এখন তাঁর একমাত্র অবলম্বন।

বুধবার কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও মোশাররফের অস্থিরতা দেখে লোকজন ভয় পেয়ে যায়। একবার কবরস্থান ও একবার বাড়ি—এ সবই করছিলেন বেশ কিছুক্ষণ। পরে লোকজন সান্ত্বনা দিয়ে তাঁকে শান্ত করে।

মোশাররফের চাচা স্কুলশিক্ষক মকবুল হোসেন বলেন, ‘এই বিপর্যয়ে তাকে কী সান্ত্বনা দেব আমরা। ওই দিনের ঘটনার কথা মনে হলে আমার নিজেরই হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়। গলা শুকিয়ে যায়। ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। এখন ওর (মোশাররফের) ভেতরটা কেমন করছে, তার যন্ত্রণা ও কষ্ট আমরা কেউ তাঁর মতো বুঝতে পারব না। যার গেছে শুধু সে-ই বোঝে, কতটা দুঃখ সে পেয়েছে। ’

বাড়ির সামনেই দাফন করা হয়েছে স্ত্রী তাসলিমা বেগম (৩০), ছেলে নিলয় (৯) ও মেয়ে রাইসাকে (৭)। প্রতিবেশীরা জানায়, বিকেলে বাড়ি ফিরে তাদের কবরের পাশে গিয়ে হাউমাউ করে কাঁদছেন মোশাররফ। স্ত্রী-সন্তানদের জামাকাপড় বুকে জড়িয়ে তাদের নাম ধরে ডেকেছেন। বেঁচে যাওয়া মেহোনাকে বুকে জড়িয়ে চোখের জলে ভেসেছেন।

শুধু মোশাররফ নন, তাঁর গোটা পরিবার, এমনকি আত্মীয়স্বজনও ওই হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা ভুলে স্বাভাবিক হতে পারেনি। মোশাররফের মা ফাতেমা খাতুন তো শয্যাশায়ী হয়েছেন ঘটনার পর থেকে। তিনি এখন কথা বলাও বন্ধ করে দিয়েছেন।

মোশাররফ জানান, ছোট মেয়েটির কথা বারবার মনে পড়ছে তাঁর। এলাকার সবার প্রিয় ছিল সে। ওই দিনের ঘটনা বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘আমি হেই সময় ঘুমাইয়া আছলাম। হঠাৎ কানো ধুমধুম আওয়াজ ফাইলাম। ধরফরাইয়া বাইরে গিয়া দেহি আমার বউ ও ফুতের লাশ রক্তে ভাসতাছে। ছুডু ছেরিডা মা ও ভাইয়ের লাশের উফরে দিয়া ফালাতে ছাইচিন। কিন্তু আমার সামনেই ছেরিডারে কুব দিয়া ফালায়া দ্যায় মবিন্যা। কী করবাম কুনু চিন্তা না কইরা লাফ দিয়া দাউয়ের কুব খাইয়া মবিনরে ধইরালাই আমি। ফরে মানুষ আইয়া তারে রশি দিয়া বান্দে।’ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বলেন, ‘অহন এইতা কইয়া কী অইব, আমার তো সব শেষ। সব আরাইয়া আমি এহন বাইচ্যা থাইক্যাও মরা মরা, একটা জিন্দা লাশ।’ কথাগুলো বলে পাশে বসা মেয়ে মেহোনাকে বুকে টেনে নিয়ে আবার কান্নায় ভেঙে পড়েন মোশাররফ।

মোশাররফ আরো জানান, মবিন তাঁর বড় ভাই শামসুল আলমের ছেলে। বড় ভাই কাতার থাকেন; কিন্তু আজ পর্যন্ত তাঁকে একটা ফোন পর্যন্ত দেননি। সামান্য একটু জায়গার জন্য ছেলেকে তিনি লেলিয়ে দিয়েছেন। তাঁর জীবনটা শেষ করে দিয়েছেন। আক্ষেপ করে মোশাররফ বলেন, ‘আমার বউ আর দুইডা ফেরশতার মতো ফুলাপান কী ফাপ করছিন। ফাইভে ফরীক্ষা দিয়া নানার বাড়িত গেছিন বড় ছেড়ি মেহোনা। নাইলে তো এরেও মরণ লাগল অইলে। ’

ছোট্ট মেহোনা জানায়, মা আর ছোট ভাই-বোনের কথা মনে হলে সে গিয়ে কবরগুলো দেখে আসে। রাতে খুব ভয় লাগে। ঘুম আসে না।

স্থানীয় ইউপি সদস্য শাহরিয়ার মানিক বলেন, ঘটনার পর সরকার বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারটির কোনো খোঁজ নেওয়া হয়নি। স্থানীয় এমপিও মোশাররফকে দেখার প্রয়োজন বোধ করেননি।

মোশাররফের ছোট ভাই ওয়াসিমও রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘বড় ভাইয়ের চিকিৎসা, লাশের দাফনসহ এ পর্যন্ত লাখ খানেক টাকা খরচ হয়েছে। আর সবই হয়েছে ধারকর্জ করে। বড় ভাই হয়তো আগামী দু-তিন মাসেও কাজে যোগ দিতে পারবেন না। সামনের দিনগুলো কিভাবে চলবে, কে জানে!’

মবিন বর্তমানে কিশোরগঞ্জ কারাগারে রয়েছে। এ ঘটনায় ওই দিন রাতেই নিহত তাসলিমার ভাই মো. বাতেন বাদী হয়ে মবিনকে আসামি করে পাকুন্দিয়া থানায় মামলা করেন।

পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, মৃত মুর্শেদ মিয়ার পাঁচ ছেলে। ঘাতক মবিনের বাবা শামসুল আলম কাতারপ্রবাসী। আরেক ভাই সিমন থাকেন দুবাই। মোশাররফ, ওয়াসিম ও লিয়ন এলাকায় রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। মোশাররফ পরিবার নিয়ে গ্রামেই থাকতেন। মবিনরা থাকত কিশোরগঞ্জে। বাড়িতে তাদের সামান্য একটু জমির সীমানা নিয়ে ভাইদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল।

সূত্র : কালের কণ্ঠ

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত