প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সাংবাদিক উৎপলের বর্ণনা : নির্জন জঙ্গলে অন্ধকার ঘরে আটকে রাখা হয়

ডেস্ক রিপোর্ট :টানা ২ মাস ১০ দিন রহস্যজনক অন্তর্ধানের পর সাংবাদিক উৎপল দাস (২৯) সবাইকে অনেকটা অবাক করে বাড়ি ফিরলেও অনেক প্রশ্নের জবাব মিলছে না। পুরো বিষয়টি এখনো রহস্যঘেরা। অনলাইন নিউজ পোর্টাল পূর্বপশ্চিমবিডি ডট নিউজের সিনিয়র রিপোর্টার উৎপল গত ১০ অক্টোবর দুপুরে মতিঝিলের অফিস থেকে বের হওয়ার পর থেকে নিখোঁজ ছিলেন। গত মঙ্গলবার মধ্যরাতে তাকে পাওয়া যায় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের রাস্তার পাশে। এরপর তার নিখোঁজ এবং ফিরে আসা নিয়ে সর্বত্র ফের আলোচনা শুরু হয়।

নরসিংদীর রায়পুরা থানাহাটির বাসায় ফেরা উৎপল দাস গতকাল বুধবার দুপুরে ভোরের কাগজের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় দুঃসহ স্মৃতিচারণ করে বলেন, গত ১০ অক্টোবর সন্ধ্যার পর তিনি ধানমন্ডি এলাকায় যান। রাত ৮টার কিছু সময় পর স্টার কাবাবের পাশে একটি চা দোকানে বসে এক বন্ধুর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন তিনি। অপরপ্রান্তের বন্ধুর কাছে ৫ লাখ টাকায় একটি কাজের ডিলের আলাপ করেন। এরপর কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ৪-৫ জন ব্যক্তি মুহূর্তে তাকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেয়। তার চোখ-মুখ কালো কাপড় দিয়ে বাঁধার পর সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা গাড়ি চলে। এরপর তাকে নির্জন জঙ্গলের ভেতর একটি টিনশেড ঘরে নেয়া হয়। স্যাঁতসেঁতের ঘরের ভেতর হাত ও চোখের বাঁধন খুলে দেয়া হলেও দরজা ছিল বাইরে থেকে বন্ধ। মুখোশ পরা লোক ঘরে ঢুকে কখনো কখনো বাতি জ্বালালেও বেশির ভাগ সময় থাকত অন্ধকার। ওই সময়গুলো দুর্বিষহ, অবর্ণনীয় কষ্টের। কখন দিন কখন রাত বোঝার উপায় ছিল না। উৎপল বলেন, সেখানে তিনি শিয়ালের ডাক শুনতে পেতেন। তিন বেলা তাকে দরজার নিচ থেকে নরমাল খাবার দেয়া হতো। মাইক্রোবাসে তোলার পর তাকে চড়-থাপ্পড় দিয়ে টাকা দাবি করে বলা হয়, ‘তোর কাছে তো অনেক টাকা-আমাদের কিছু টাকা দে’- বারবার একই কথা বলা হয়। প্রথমে কয়েক দিন চড়-থাপ্পড় দেয়া হলেও পরে আর কোনো দুর্ব্যবহার করেনি কেউ। সুঠাম দেহের ৩-৪ জন ব্যক্তি অনেক সময় ওই ঘরে ঢুকলেও মুখে মুখোশ থাকায় তাদের চেনা যায়নি বলে দাবি করেন উৎপল। এক কাপড়ে দুই মাসের বেশি সময় থাকা উৎপল দাবি করেন, ঘরে চৌকি বা খাট ছিল না, ফ্লোরে থাকতে হতো। ওই ঘরের সঙ্গে একটা বাথরুম ছিল। সেখানে গোসল করতেন তিনি।

কেন তুলে নেয়া হয়েছিল এবং কোন পরিস্থিতিতে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে উৎপল বলেন, তুলে নেয়ার কারণ তিনি এখনো বুঝতে পারছেন না। আর মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর দরজার বাইরে ওরা কয়েকজন আলাপ করে, এই স্থানে ওকে আর রাখা ঠিক হবে না, পুলিশ-র‌্যাব জায়গা চিনে ফেলেছে। এর কিছু সময় পরই ৩-৪ জন ঘরে ঢুকে তার চোখ-মুখ বেঁধে ফেলে। গাড়িতে তোলার পর ৩-৪ ঘণ্টা গাড়ি চলে, মঙ্গলবার রাত পৌনে ১২টার দিকে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার গাউছিয়ায় আধুরিয়া শাহজালাল সিএনজি ফিলিং স্টেশনে একটি মাইক্রোবাস থেকে তাকে নামিয়ে দেয়া হয়। নানা মাধ্যমে খবর পেয়ে সেখান থেকে পুলিশ তাকে নিয়ে যায় ভুলতা ফাঁড়িতে। উৎপলের ফোন পেয়ে রাত আড়াইটার দিকে সেখান থেকে তাকে নিয়ে নরসিংদীর রায়পুরার পথে রওনা হন পরিবারের সদস্যরা। উৎপল বলেন, আমাকে নামিয়ে দেয়ার সময় চোখের বাঁধন খুলে দিয়ে তারা বলে, আমরা যখন গাড়ি টান দেব তখন তুই চোখ খুলবি। ছেড়ে দেয়ার সময় তার মোবাইল ফোন ফেরত দেয় অপহরণকারীরা। সেই ফোন দিয়ে তিনি স্বজন, কয়েকজন সহকর্মী ও সুতপা জলি নামে এক বান্ধবীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করে উৎপলের বাবা চিত্ত রঞ্জন দাস ভোরের কাগজকে বলেন, তার ছেলে কিছুটা দুর্বল, এমনিতে শারীরিকভাবে সুস্থ আছে। বাসায় বিশ্রাম করছে। উৎপলের মধ্যে এখন কোনো আতঙ্ক বা ভীতি নেই উল্লেখ করে চিত্তরঞ্জন বলেন, তার ছেলেকে অপহরণ করা হয়েছিল। আবার অপহরণকারীরাই ফিরিয়ে দিয়ে গেছে বলে উৎপল তাদের জানিয়েছে। নরসিংদীর রায়পুরা থানার অদূরে তাদের বাড়ি। বাড়ি ফেরার পর থানা পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার লোক এবং গণমাধ্যমকর্মীরা বাড়িতে ভিড় করে বলে জানান চিত্তরঞ্জন।

চার ভাইবোনের মধ্যে উৎপল সবার ছোট ও আদরের। তার বড় বোন বিনিতা রানী দাস বলেন, অপহরণকারীদের ব্যাপারে উৎপল কিছু জানে না। কেন কারা তাকে তুলে নিয়েছিল তাও সে বুঝতে পারছে না। নিখোঁজের পর তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে ২৩ অক্টোবর থানায় জিডি করা হয়। তখন উৎপলের ফোন থেকে কল করে এক লোক ১ লাখ টাকা দাবি করে। পরদিন সে আবার টাকা চায়। তখন বাবা (চিত্তরঞ্জন দাস) বলেন, তিনি টাকা দেবেন, কিন্তু কোথায় দেবেন, কীভাবে দেবেন? আগে উৎপলের সঙ্গে কথা বলিয়ে দিতে বলেন। কিন্তু তারপর আর কোনো ফোন আসেনি। এরপর ৪ নভেম্বর তাকে টাঙ্গাইলে পাওয়া যাওয়ার খবর রটলেও তা ছিল ভুয়া।ভোরেরকাগজ।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত