প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্যারাডাইস পেপারস
এবার ‘নাইকো বাংলাদেশে’র নাম এলো

ডেস্ক রিপোর্ট : কোম্পানির নামের সঙ্গে বাংলাদেশ থাকলেও এর ঠিকানা ‘বারবাডোস’ নামে ক্যারিবীয় অঞ্চলের ছোট একটি দ্বীপ রাষ্ট্রে। কোম্পানিটির নাম নাইকো রিসোর্সেস বাংলাদেশ লিমিটেড। কানাডাভিত্তিক এই গ্যাস কোম্পানি বাংলাদেশে বড় ধরনের দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত। অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক জোট আইসিআইজে গতকাল ‘প্যারাডাইস পেপারস’ নামে ফাঁস করা নথির সর্বশেষ ১ লাখ ৬০ হাজার অফশোর কোম্পানির তথ্য প্রকাশ করেছে। এতে নাইকো বাংলাদেশের নাম রয়েছে।

আইসিআইজের ডাটাবেজ অনুযায়ী ১৯৯৭ সালের ৪ সেপ্টেম্বর বারবাডোসে নিবন্ধিত হয় নাইকো রিসোর্সেস বাংলাদেশ লিমিটেড। তবে কোম্পানির ঠিকানা এবং সংযুক্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নাম নেই। দুটি ঠিকানা রয়েছে বারবাডোসে, যার একটি পোস্ট বক্স নম্বর। মূল কোম্পানির ওয়েবসাইটে অবশ্য নাইকো বাংলাদেশ লিমিটেডের ঠিকানা ঢাকার বনানী ১১ নম্বর রোডের একটি বাড়ির।

কাজ পেতে ঘুষ প্রদান, অবহেলার কারণে গ্যাসক্ষেত্রে দুর্ঘটনাসহ দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত এ কোম্পানি কয়েক বছর ধরে বেশ আলোচিত। নাইকো দুর্নীতি মামলার অন্যতম আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। গত ২৪ আগস্ট নাইকোর সঙ্গে বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার চুক্তি বাতিল করেন আদালত। আগামী ১৫ জানুয়ারি মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।

নাইকোর বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপুটসে (আইসিএসআইডি) বিরোধ নিষ্পত্তির একটি মামলা চলছে। এ মামলায় বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার মঈন গনি গতকাল বলেন, কোম্পানির নাম দেখে বাংলাদেশি মনে হলেও তারা এখানে নিবন্ধন করেনি। বাংলাদেশে শাখা অফিস খুলে তারা ব্যবসা করেছে। বারবাডোসে নিবন্ধিত কোম্পানি মানি লন্ডারিংয়ের কাজে ব্যবহূত হয়েছে। তারা এ কোম্পানিকে বাংলাদেশে ঘুষের টাকা দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে।

এনবিআরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার কাছে মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, খুবই কম কর কিংবা তদারকি নেই এমন ছোট ছোট দ্বীপে যারা কোম্পানি নিবন্ধন করেন তাদের অনেকের উদ্দেশ্য থাকে কর ফাঁকি অথবা মানি লন্ডারিং। নাইকো বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা হয়েছে কি-না জানতে হলে অনুসন্ধান করতে হবে।

এ বিষয়ে নাইকো বাংলাদেশের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। বাপেক্স সূত্রে জানা যায়, নাইকোর নামে বাংলাদেশে অফিস থাকলেও তাদের কার্যক্রম এখন বন্ধ রয়েছে। নাইকো বাংলাদেশের পরিচালক উইলিয়াম হর্নেডে মামলা উপলক্ষে মাঝে মধ্যে বাংলাদেশে আসেন। বারবাডোসে নিবন্ধিত কোম্পানির সর্বশেষ পরিচালক হিসেবে হর্নেডের নাম রয়েছে।

বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর তেজগাঁও থানায় নাইকো দুর্নীতি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০০৮ সালের ৫ মে খালেদা জিয়াসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে এ মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। মামলায় অভিযোগে বলা হয়, ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনটি গ্যাসক্ষেত্র পরিত্যক্ত দেখিয়ে কানাডীয় কোম্পানি নাইকোর হাতে ‘তুলে দেওয়ার’ মাধ্যমে আসামিরা রাষ্ট্রের প্রায় ১৩ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকার ক্ষতি করেছেন। মামলার অন্য আসামিরা হলেন- মওদুদ আহমদ, সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব খন্দকার শহীদুল ইসলাম, সাবেক সিনিয়র সহকারী সচিব সি এম ইউছুফ হোসাইন, বাপেক্সের সাবেক মহাব্যবস্থাপক মীর ময়নুল হক, বাপেক্সের সাবেক সচিব মো. শফিউর রহমান, ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন আল মামুন, বাগেরহাটের সাবেক সাংসদ এম এ এইচ সেলিম এবং নাইকোর দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট কাশেম শরীফ।

২০০৩ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে ছাতক ও ফেনী গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নে বাপেক্সের সঙ্গে চুক্তি করে নাইকো। ২০০৫ সালের ৮ জানুয়ারি ছাতক গ্যাসক্ষেত্রে বড় দুর্ঘটনা ঘটে, যার জন্য নাইকোর অবহেলাকে দায়ী করা হয়। ওই বছরের মে মাসে তৎকালীন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেনকে দামি গাড়ি উপহার দেয় নাইকো। জুন মাসে তিনি নাইকোর অর্থে কানাডায় ভ্রমণ করেন। এ ঘটনা জানাজানি হলে মন্ত্রী পদত্যাগে বাধ্য হন। একই মাসে ছাতক গ্যাসক্ষেত্রে আবার দুর্ঘটনা ঘটে। ২০১১ সালের জুন মাসে কানাডার আদালতে মোশাররফ হোসেনকে ঘুষ দেওয়ার দায়ে নাইকো দোষী সাব্যস্ত হয়। কোম্পানিটিকে সাড়ে ৯ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়।

গত ৪ নভেম্বর আইসিআইজে আন্তর্জাতিক আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আপেলবি থেকে ফাঁস হওয়া নথি প্রকাশ করে। এর নাম দেওয়া হয় ‘প্যারাডাইস পেপারস’। আপেলবির ১ কোটি ৩৪ লাখ নথির প্রথম কিস্তি প্রকাশ করা হয় যেখানে কোনো বাংলাদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল না। দ্বিতীয় কিস্তি প্রকাশ করা হয় গত ১৭ নভেম্বর। এ কিস্তিতে বিভিন্ন দেশে কোম্পানি নিবন্ধনের যে তালিকা প্রকাশ করা হয় তাতে বাংলাদেশ সম্পর্কিত ২১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম পাওয়া যায়। এর মধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু ও তার পরিবারের সদস্যরা রয়েছেন। মেঘনাঘাট পাওয়ারের সাবেক সিইও ফয়সাল চৌধুরী, ইউনোকল বাংলাদেশ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি ব্রামার অ্যান্ড পার্টনারসসহ আরও কয়েক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে তালিকায়। একটি প্রতিষ্ঠান বাদে সবাই বারমুডা দ্বীপে কোম্পানি খুলেছেন। গতকাল প্রকাশিত হলো তৃতীয় কিস্তি যেখানে শুধু নাইকো বাংলাদেশের নাম রয়েছে।

এ পর্যন্ত আইসিআইজের এ সম্পর্কে ডাটাবেজে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হিসেবে ৬৭ ব্যক্তির নাম রয়েছে। বাংলাদেশের ৫১টি ঠিকানা রয়েছে। অন্যদিকে নামের সঙ্গে ‘বাংলাদেশ’ রয়েছে কিন্তু সংযুক্ত দেশ হিসেবে অন্য দেশের নাম রয়েছে এমন কোম্পানির সংখ্যা ১৮টি। আইসিআইজে বলেছে, এখানে সবাই বেআইনি কাজ করেছেন তা বলা যাবে না। তবে বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া বাংলাদেশি নাগরিকরা এখানকার অর্থ দেশের বাইরে বিনিয়োগ করতে পারেন না। এর আগে পানামার আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মোসাক ফনসেকা থেকে আইসিআইজের ফাঁস করা তথ্যেও বাংলাদেশিদের নাম ছিল। এ ছাড়া ২০১৩ সালে অফশোর কোম্পানির উদ্যোক্তাদের যে তালিকা প্রকাশ করেছিল, সেখানেও ৩২ বাংলাদেশির নাম রয়েছে। সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত