প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মধ্যপ্রাচ্যই ভরসা, নতুন শ্রমবাজার মিলছে না

ডেস্ক রিপোর্ট : প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় নানান উদ্যোগের কথা বললেও নতুন শ্রমবাজার খুলছে না বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য। ইউরোপ, আমেরিকা, রাশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোর দুয়ার এখনও বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য বন্ধ। চলতি বছরে বিদেশগামী ১০ লাখ কর্মীর ৯০ শতাংশেরই গন্তব্য পুরনো বাজার মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে।

বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানে গত দুই বছরে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী নুরুল ইসলামের নেতৃত্বে কর্মকর্তারা অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, রাশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ কয়েকটি দেশ সফর করেছেন। মন্ত্রণালয়ের তথ্য মোতাবেক, ১৬৫ দেশে বাংলাদেশি কর্মীরা যাচ্ছেন। গত ১৯ নভেম্বর জাতীয় সংসদে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী জানান, প্রচলিত শ্রমবাজারের পাশাপাশি সরকার নতুন নতুন বাজার অনুসন্ধান করছে। ফলে নতুন শ্রমবাজার হিসেবে পোল্যান্ড, সুইডেন, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা ও রাশিয়ায় কর্মী পাঠানো সম্ভব হচ্ছে।

মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানেই দেখা যায়, পুরনো মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের বাজার এখনও ভরসা, ইউরোপে জনশক্তি রফতানি বরং কমেছে। ইউরোপ এখন ইরাক-সিরিয়া-লেবাননের শরণার্থীর চাপ সামলাতে ব্যস্ততার কারণে সেখানকার শ্রমবাজারের প্রবেশপথও সরু হয়ে গেছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর ইতালিতে চাকরি নিয়ে গেছেন মাত্র একজন বাংলাদেশি কর্মী। যুক্তরাজ্যে গেছেন ৬ জন। অথচ ২০০৬ সালে ১০ হাজার ৯৫০ জন কর্মী ইতালি যান কাজ নিয়ে। ২০১২ সালে যান ৯ হাজার ২৮০ জন। চলতি বছর জাপানে গেছেন ১১০ জন। দক্ষিণ কোরিয়ায় ১ হাজার ৬০ জন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্প্রতি দাবি করেছে, ‘৮২ হাজার বাংলাদেশি’ ইউরোপে অবৈধভাবে রয়েছেন। তাদের ফেরত পাঠাতে চেয়ে চাপও দিচ্ছে। ফেরত নিতে হলে অবশ্য অবৈধ অভিবাসীদের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হতে হবে।

অভিবাসন বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রামরুর প্রধান অধ্যাপক ড. সি আর আবরার বলেন, বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা বছর বছর বাড়ছে, এতেই আমরা সন্তুষ্ট থাকি। তারা যেসব দেশে যাচ্ছেন সেখানে শ্রম আইন কতটা মানা হয়, শ্রমিকের অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকে তা সরকার ও জনশক্তি রফতানিকারক কেউ চিন্তা করে না। ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানে শ্রমিকের অধিকার রক্ষার সুনাম আছে। সেটা মধ্যপ্রাচ্যে নেই। বাংলাদেশি শ্রমিকরা প্রবাসে প্রতারণা, হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হন। উন্নত দেশে অভিবাসনের সুবিধা হলো- সেখানে বেতন ভালো, নির্যাতনের শঙ্কাও কম।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের গবেষণার তথ্যানুযায়ী, ২০১৬ সালে ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর চাকরিজীবীদের মধ্যে ১ কোটি ৫৮ লাখ ৮৫ হাজার ৩০০ জন ছিলেন প্রবাসী শ্রমিক। ৭ দশমিক ১৫ শতাংশ শ্রমিকই বিদেশি। সেখানে ভারত, চীন ও মেক্সিকোর বড় দখল থাকলেও বাংলাদেশ নেই। দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজারে নেপালের বিপুলসংখ্যক কর্মী থাকলেও বাংলাদেশির সংখ্যা একেবারেই কম।

চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ৯ লাখ ৩১ হাজার ৮৩২ জন কর্মী কাজ নিয়ে বিদেশে গেছেন। তাদের মধ্যে ৫ লাখ ১৩ হাজার ৮৬২ গেছেন সৌদি আরবে। ওমানে ৮৩ হাজার ১৬ জন, কাতারে ৭৭ হাজার ১৪৫, কুয়েতে ৪৬ হাজার ১৭৪, জর্ডানে ১৯ হাজার ৫১৬ ও বাহরাইনে ১৮ হাজার ৯৮৪ জন গেছেন। বিদেশগামী কর্মীদের শতকরা ৭৫ ভাগই মধ্যপ্রাচ্যে গেছেন। ১৯৮০-র দশক থেকেই এ দেশগুলো বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার।

নব্বইয়ের দশক থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বড় দুই শ্রমবাজার মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর। চলতি বছরে মালয়েশিয়া ৮৩ হাজার ১৬৯ ও সিঙ্গাপুরে ৩৭ হাজার ৬৭০ জন কর্মী গেছেন। ব্রুনাই, মরিশাসগামী কর্মীর সংখ্যায়ও আগের বছরগুলোর ধারা অব্যাহত রয়েছে।

জনশক্তি রফতানি বিশ্নেষক হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ জানিয়েছেন- মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি কর্মীরা কম বেতনে ‘থ্রি-ডি জব’ করে। মানে নোংরা পরিবেশে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেন। দেশে কর্মসংস্থানের সংকট থাকায় কর্মীরা যেখানে সুযোগ পান সেখানেই যান। উন্নত দেশগুলোর বাজার উন্মুক্ত না থাকায় তারা বাধ্য হয়েই এমন দেশেগুলোতে যান, যেখানে শ্রমিকের অধিকার রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পায় না।

নারীকর্মীদের গন্তব্যও মধ্যপ্রাচ্য। চলতি বছরে ১ লাখ ১৩ হাজার নারীকর্মী বিদেশে গেছেন। তাদের মধ্যে মাত্র ৮৩৩ জন ছাড়া বাকি সবার গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্য। সৌদি আরবেই গেছেন ৭৬ হাজার ৪১০ জন। মধ্যপ্রাচ্যে নারীকর্মীদের নিরাপত্তাহীনতা ও নির্যাতনের অহরহ অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু মরিশাস বা হংকংয়ে এ অভিযোগ নেই।

বাংলাদেশি অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশনের (বমসা) পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম বলেন- ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় নারীকর্মীরা যে পরিবেশে কাজ করেন, তার চেয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিবেশ ভিন্ন। উন্নত দেশে অভিবাসনের সুযোগ থাকলে নারীরা আরও নিরাপদ পরিবেশে কাজ করার সুযোগ পেতেন।

উন্নত দেশগুলোর শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের কাজের সুযোগ সৃষ্টির দায়িত্ব কার? এ প্রশ্নে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আজহারুল হক বলেন, এক সময় রফতানিকারকরা বিদেশ থেকে কর্মীর চাহিদাপত্র আনত। তারাই বাজার অনুসন্ধান করত। সরকার সহায়তা করত মাত্র।

মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব বদরুল আরেফীন (শ্রমবাজার গবেষণা) জানান, কোন দেশে কত সংখ্যক বিদেশি কর্মীর চাহিদা রয়েছে, কীভাবে সেখানে বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায় সে বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে চেষ্টা করা হয়। কিন্তু কর্মীর চাহিদাপত্র রফতানিকারকদের আনতে হবে।

জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বায়রার সভাপতি বেনজির আহমেদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ যেসব দেশে বাংলাদেশি কর্মীরা কাজ করছেন, সেগুলো রফতানিকারকদের সৃষ্টি করা বাজার। সত্তরের দশক থেকে রফতানিকারকরা দেশে দেশে ঘুরে চাহিদাপত্র এনে কর্মী পাঠিয়েছে। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে কর্মী পাঠাতে হয়। নতুন বাজার অনুসন্ধানের দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত