প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দুঃসহ সেই ঘটনা ভুলতে পারছেন না তারা

ডেস্ক রিপোর্ট : চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের আইসিইউর চার নম্বর বেডে চিকিৎসা চলছে সুনীল নাথের। ৩৫ বছর বয়সী এই মানুষটির পুরো মাথায় ব্যান্ডেজ, শ্বাসনালিতে কৃত্রিম নল। পদদলিত হয়ে প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছেন মাথায়। দুর্ঘটনার পর থেকে এখনও অচেতন।

তার পাশের পাঁচ নম্বর বেডে শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন আরেকজন- ইন্দ্রজিৎ বৈদ্য। মানুষের পায়ের চাপে থেঁতলে গেছে তার মুখের বামপাশ।

এদিকে আইসিইউর ১০ নম্বর বেডে শুয়ে ছটফট করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যান রিসোর্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র অর্পণ বিশ্বাস। ১০-১২ বন্ধু একত্র হয়ে তারা গিয়েছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরীর মেজবানে। সেখান থেকে অর্পণের ঠিকানা হয়েছে এখন চমেক হাসপাতাল। আর সঙ্গে থাকা বন্ধু রাহুল চলে গেছেন না-ফেরার দেশে। দুঃসহ সেই স্মৃতি এখনও তাড়া করছে তাকে। তিনি বলেন, ‘একসঙ্গেই ছিলাম সবাই। হঠাৎ পেছন থেকে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লাম। এখন শুনছি বেঁচে নেই রাহুল। দুঃসহ সেই স্মৃতি ভুলতে পারছি না আমি।’

আইসিইউতে থাকা শুধু এই তিনজনই নয়; চমেক হাসপাতালে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন থাকা অন্য ১০ জনের স্মৃতিতেও ভাসছে ভয়ঙ্কর সেই ঘটনা। তাড়া করছে তা নিহত ১০ জনের স্বজনকেও। মঙ্গলবার রাতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনদের বুঝিয়ে দেওয়া হয় নিহতদের লাশ। তিনজনকে নগরীর বলুয়ারদীঘি মহাশ্মশানে দাহ করা হয়। প্রকৌশলী সত্যব্রত ভট্টাচার্য পংকজকে দাহ করা হয় রাঙামাটি শহরের আসামবস্তি শ্মশানে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় উপ-সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছিলেন তিনি। খাস্তগীর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে মেয়ের পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তির বিষয়ে চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন তিনি, সেখান থেকে মেজবানে।

বাকি ছয়জনের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় বাঁশখালী, কাট্টলী, সীতাকুণ্ড, আনোয়ারা, কক্সবাজারের চকরিয়া ও রংপুরে। নিহত ঝন্টু দাশের ছোট ভাই টিঙ্কু দাশ বলেন, ‘মেজবান খেতে গিয়ে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে আমার ভাই। এখন মেজবানের নাম শুনলেই আতঙ্ক ভেসে ওঠে মনে।’

আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মনোজ বড়ূয়া অপু বলেন, ‘দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও মনে ছিল আনন্দ। মানুষের চাপে ভেতরে ১০ হাত সামনের দিকে যাওয়ার পর আটকা পড়ি। একপর্যায়ে মানুষের ধাক্কাধাক্কিতে লুটিয়ে পড়ি মাটিতে। এর মধ্যেই অজ্ঞান হয়ে যাই। জ্ঞান ফিরলে দেখি আমি হাসপাতালে।’

দুঃসহ এমন স্মৃতি ও পুরো শরীরের যন্ত্রণা নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন মনোজ বড়ূয়া অপু। আর ছেলেকে নিয়ে প্রিয় নেতার মেজবানে গিয়ে বুকের হাড় ভেঙেছেন আশীষ বড়ূয়া। রক্তও জমে গেছে সেখানে। ছেলেকে কোনোভাবে মানুষের ভিড় থেকে রক্ষা করতে পারলেও নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি তিনি।

আশীষ বড়ূয়ার স্ত্রী বীথি বড়ূয়া বলেন, আগে থেকেই মহিউদ্দিন চৌধুরীর মেজবানে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল তার। ছোট ছেলে অর্নয়কে সঙ্গে নিয়ে স্কুল থেকে দু’জনই বাসায় আসে। তারপর রীমা কমিউনিটি সেন্টারে চলে যায় তারা। হাসিমুখে বাসা থেকে বের হলেও আশীষকে রক্তাক্ত অবস্থায় ভর্তি হতে হয়েছে হাসপাতালে।

হাড় ভাঙা বুকে ঠিকভাবে কথা বলতে পারছেন না আশীষ বড়ূয়া। অনেক কষ্ট করে তিনি বলেন, ‘রীমা কমিউনিটি সেন্টারের সামনের রাস্তায় হাজারো মানুষ দেখে খুব খুশি হয়েছিলাম। ভেতরে প্রবেশের উদ্দেশ্যে ছেলেকে নিয়ে রাস্তায় অপেক্ষায় থাকি দীর্ঘক্ষণ। একসময় পেছন থেকে হঠাৎ আসা মানুষের ধাক্কায় পড়ে যাই ছেলেকে নিয়ে। তাকে বুকে নিয়ে কিছুক্ষণ পড়েও থাকি। অনেক কষ্টে তাকে ঠেলে পাশে বের করতে পারলেও আমি বের হতে পারিনি। অনেক মানুষ আমার বুকের ওপর দিয়ে চলে যায়। এতে বুক, পেট, মুখসহ পুরো শরীরেই আঘাতপ্রাপ্ত হই। পুরো শরীরে ব্যথা আর ব্যথা।’

অপু ও আশীষের মতো প্রিয় নেতার কুলখানির মেজবানে গিয়ে আহত হয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন আরও ১১ জন। তাদের মধ্যে সুনীল কান্তি নাথের অবস্থা আশঙ্কাজনক। কৃত্রিম শ্বাসনালি দিয়ে চিকিৎসাধীন আছেন তিনি। পুরো শরীরে সবার চেয়ে বেশি আঘাত পাওয়ায় এখনও জ্ঞান ফিরে আসেনি তার। তবে অর্পণ ও প্রিয়জিতের অবস্থা আগের চেয়ে ভালো। অপু ও আশীষের সঙ্গে ক্যাজুয়ালিতে চিকিৎসাধীন উজ্জল চৌধুরী, সুমন দাশ, আবু তাহের, মো. হারুন ও মো. জামাল। তাদের মধ্যে অপু ও আশীষের অবস্থা কিছুটা খারাপ। অন্যদিকে হাসপাতালের ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রবিন দাশ, বাসুক সিংহ ও রামদুলাল।

আইসিইউর বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বে থাকা প্রফেসর ডা. রঞ্জন কুমার নাথ বলেন, ‘তিনজনের মধ্যে সুনীলের অবস্থা তেমন ভালো নয়। বাকি দুইজনের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। আহতরা পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছুই বলতে পারছি না।’

ক্যাজুয়ালটি বিভাগীয় প্রধান ডা. ঋভুরাজ চক্রবর্তী বলেন, ‘এ বিভাগে থাকা আহত সাতজনের মধ্যে দুইজনের অবস্থা গুরুতর। বাকি পাঁচজনের অবস্থা আগের চেয়ে কিছুটা ভালো। পুরোপুরি সুস্থ হতে হলে ভয়ঙ্কর সেই স্মৃতি ভোলার চেষ্টা করতে হবে তাদের।’

অথচ তাদের চোখে কেবল জলই নয়, আতঙ্কের ভীতিজাগানিয়া ছায়া ভেসে বেড়াচ্ছে অবিরত।

নকশা অনুমোদন নেই রীমা কমিউনিটি সেন্টারের :জামালখানের রীমা কমিউনিটি সেন্টার থেকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) দূরত্ব মাত্র দুই কিলোমিটার। অথচ কোনো অনুমোদন ছাড়া এতদিন হরদম ব্যবসা করছিল কমিউনিটি সেন্টারটি। পাহাড়ের ঢালুতে দুয়েক বছর আগে এটাকে আরও সম্প্রসারণ করা হয়, বাড়ানো হয় ধারণক্ষমতাও। কোনো নিয়ম-কানুন না মেনে এভাবে পুরনো ভবন ভেঙে নতুন ভবন করা হলেও এতদিন ঘুমিয়ে ছিল সিডিএ। আর এখানেই মহিউদ্দিন চৌধুরীর মেজবানের আয়োজন করে হারাতে হয়েছে ১০টি প্রাণ।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ শাহীনুল ইসলাম খান বলেন, ‘কমিউনিটি সেন্টারটির নকশা অনুমোদন নেই। অনুমোদন ছাড়া বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রাথমিকভাবে ধারণ ক্ষমতার কয়েকগুণ মানুষ জড়ো হওয়া ও ঢালু প্রবেশপথের কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।’

২০১৬ সালের ২ মার্চ নকশা অনুমোদন না নেওয়ায় অভিযান চালিয়েছিল সিডিএ। নকশা অনুমোদন নিতে ১৫ দিনের সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এরপর আর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি তারা।

এ প্রসঙ্গে সিডিএর অথরাইজড কর্মকর্তা মোহাম্মদ শামীম বলেন, ‘ভবনটির অনুমোদন না থাকায় নোটিশ করা হয়েছিল, কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট না থাকায় পরে অভিযান চালানো যায়নি।’ সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত