প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

স্বজনপ্রীতি ও পদ-বাণিজ্যের ঘেরে ঢাকা মহানগর আ.লীগ

ডেস্ক রিপোর্ট : ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের থানা-ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পূর্ণাঙ্গ কমিটি ব্যাপক অভিযোগের কারণে অনেক আগেই আটকে দিয়েছে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর মূল কারণ ছিল ওই কমিটিতে অনুপ্রবেশকারী, স্বজনপ্রীতি আর পদ-বাণিজ্যের একাধিক অভিযোগ।

অন্যদিকে মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের থানা-ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের কাজ শেষ। এরমধ্যে ওই কমিটির চূড়ান্ত সকল কাগজ-পত্রাদি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কাছে জমা পড়েছে বলে জানা গেছে। উত্তর আওয়ামী লীগের আটকে থাকা ওই কমিটি থেকে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে দক্ষিণ আওয়ামী লীগ। তবে এসব কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারকরা সংবাদকর্মীদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথোপকথনে নিজেদের ফ্রেস বলে দাবী করলেও, খোদ তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে। তাদের দাবি, কমিটি প্রকাশ হওয়ার আগেই অনুপ্রবেশকারী, স্বজনপ্রীতি আর পদ বাণিজ্যের মত একাধিক ঘটনা রয়েছে দক্ষিণ আওয়ামী লীগে।

জানা গেছে, মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগ ১৩ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটিতে চলছে পদ-বাণিজ্য। স্বজনপ্রীতি আর অর্থের বিনিময়ে ঢোকানো হচ্ছে বিএনপি ঘরোয়া লোকদের। পল্টন থানা আওয়ামী লীগের দলীয় এক সূত্রে জানা গেছে, ওই ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটিতে যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক পদে শরিফুল হকের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। এমনকি কমিটির চূড়ান্ত তালিকায় তার নাম রয়েছে। শরিফুল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল । সূত্রে আরও জানা গেছে, শরিফুলের ভাই আরিফুল হক আরিফ পল্টন থানা ছাত্রদলের সভাপতি ও পেট্রল বোমার আসামি। অত্র এলাকার সকল বোমার সাথে জড়িত।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পল্টন থানা আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা বলেন, কমিটি গঠন কার্যক্রম নিয়ে নানা অভিযোগ বিভিন্ন স্থান থেকে উঠেছে। তবে এই অভিযোগ সব রাজনৈতিক দলেই আছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শুনেছি এ মাসে কমিটি প্রকাশ হতে পারে। এদিকে একাদশ জাতীয় নির্বাচন ঘিরে এখন চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। আগামী ওই নির্বাচনে পুনরায় সরকার গঠন করতে মরিয়াও দলটি। লক্ষ্য বাস্তবায়নে দলে বাড়াচ্ছেও গতিশীলতা। স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় এমপি ও নেতাদের মধ্যে দূরত্ব ঘোচনে ইতিবাচক দিকে ক্ষমতাসীন দলটি।

দেশব্যাপী সংগঠনকে নির্বাচনমুখী করতে ব্যাপক উদ্যোগ চললেও খোদ ঢাকাতেই বেহাল অবস্থায় আওয়ামী লীগ। সম্মেলনের পর চার বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ করা হয়নি ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন শাখাগুলো। তবে আটকে থাকা দীর্ঘ দিনের ওই কমিটির গঠন কার্যক্রম নিয়ে জটলায় পড়েছে দলটি। এমন পরিস্থিতিতে অনুপ্রবেশকারী, স্বজনপ্রীতি আর পদ-বাণিজ্যের জালে আটকে গেছে এ সব কমিটি। সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোরও একই অবস্থা।

এছাড়া সম্মেলন হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগ ও মহানগর যুব মহিলা লীগে। এ দুই সংগঠনের থানা-ওয়ার্ডেও মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি। ১১ বছর আগে হয়েছিল ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলন। এরপর আর হয়নি। মহানগর কৃষক লীগের কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও নতুন সম্মেলনের উদ্যোগ নেই। মহানগর ছাত্রলীগের কমিটিও মেয়াদোত্তীর্ণ। এক সময় আন্দোলন-সংগ্রামে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও বর্তমানে সাংগঠনিক অবস্থা করুণ। নির্বাচনের দেড় বছর বাকি থাকলেও খোদ রাজধানীতেই এমন বেহাল অবস্থায় আওয়ামী লীগকে নতুন করে ভাবনায় ফেলেছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ১০ এপ্রিল ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর-দক্ষিণ, ৪৫টি থানা এবং ১০০টি ওয়ার্ড ও ইউনিয়নের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের নাম ঘোষণা করা হয়। এরপর গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। তবে মহানগর উত্তর-দক্ষিণের অন্তর্গত থানা, ওয়ার্ড এবং ইউনিয়নে এখনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়নি। এর মধ্যে মহানগর উত্তরের অন্তর্গত কয়েকটি থানা-ওয়ার্ডের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হলেও ব্যাপক অভিযোগ ওঠায় পরে তা বাতিল করা হয়।

কমিটি ঘোষণার পরেই নানামুখী তোপের মুখে পড়ে মহানগর উত্তরের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক। কমিটি ঘোষণার পরই পদবঞ্চিতরা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে কমিটি গঠনে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ করেন। এর পরিপেক্ষিতে এক ঘণ্টার মধ্যে ওই ঘোষিত কমিটি স্থগিত করে দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। বাতিলকৃত কমিটিগুলোতে অবৈধ আর্থিক লেনদেন, পছন্দের লোকদের দিয়ে পকেট কমিটি গঠন এবং বিএনপি-জামায়াতসহ বিতর্কিতদের কমিটিতে স্থান করে দেওয়ার মতো গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ ছিল।

উত্তর আওয়ামী লীগের জেষ্ঠ্য এক নেতা জানিয়েছেন, নগরের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত স্থগিত কমিটি দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কাছে জমা আছে। তিনি আরও জানান, দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরেছেন যে কোন সময় স্থগিত কমিটির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। কাফরুল থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ৪নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর (ডিএনসিসি) জামাল মোস্তফা বলেন, স্থগিত কমিটির বিষয়টি নগরের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ইখতিয়ার।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, যেহুত আমাদের হাতে ক্ষমতা নেই তাই কমিটি সম্পর্কে মন্তব্য করতে ইচ্ছুক নই। এদিকে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন দীর্ঘদিন ঝুলে থাকায় পদপ্রত্যাশী নেতাকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর হতাশা বাড়ছে। আর এতে সাংগঠনিক কর্মকা- ঝিমিয়ে পড়ছে। মহানগরের উত্তর ও দক্ষিণের একাধিক নেতা জানান, দুই কারণে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা যাচ্ছে না। একদিকে ত্যাগী-নিবেদিতরা টাকা দিয়ে পদ-পদবি কিনবেন না। অন্যদিকে কমিটি গঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বাণিজ্য ছাড়া পূর্ণাঙ্গ কমিটি করবেন না। তাই ত্যাগীদের মূল্যায়ন এবং পদ-পদবির বাণিজ্যের সমন্বয় না হওয়ায় বার বার কমিটি আটকে যাচ্ছে।

জানা গেছে, আগে থানা-ওয়ার্ডের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হতো সংশ্লিষ্ট নেতাদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে। থানা-ওয়ার্ডের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক যাচাই-বাছাই করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের জন্য কেন্দ্রে সুপারিশ পাঠাতেন। এবার মহানগর আওয়ামী লীগ হাঁটছে উল্টো পথে। থানা-ওয়ার্ড নেতাদের উপেক্ষা করে পদপ্রত্যাশীদের নামের তালিকা ও বায়োডাটা মহানগর দফতরে জমা নেওয়া হয়েছে। মহানগর আওয়ামী লীগ যাচাই-বাছাই করে তাদের ইচ্ছানুযায়ী পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করবে।

এতে কিছু থানা ও ওয়ার্ডে এমপি-মন্ত্রীদের চাপের মুখে ‘হাইব্রিড নেতারা’ কমিটিতে পদ পেতে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ বলেন, মহানগর দক্ষিণের অন্তর্গত ৮টি সংসদীয় আসনে ৮টি টিমের সুপারিশের ভিত্তিতে থানা-ওয়ার্ডের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেত্রীর দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এ কমিটি হবে একাদশ নির্বাচনের জন্য উপযোগী।

কাউন্সিলের এক বছর পর ২০১৩ সালের মে মাসের শেষের দিকে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ যুবলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ঢাকা মহানগরে তাদের তিন বছর মেয়াদের এই কমিটি পার করেছে ৪ বছরের অধিক সময়। সম্মেলনের মাধ্যমে কবে নতুন নেতৃত্ব আসবে যুবলীগের কেউই তা বলতে পারছেন না। স্বেচ্ছাসেবক লীগ ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের সর্বশেষ সম্মেলন হয়েছিল ২০০৬ সালের ৩১ মে। উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোবাশ্বের চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক ফরিদুর রহমান খান বর্তমানে সিটি করপোরেশন উত্তরের কাউন্সিলর। এখন তারা নিজ এলাকা নিয়েই বেশি ব্যস্ত।

ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক লীগের বেশ কিছু থানা চলছে আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে। আবার অনেক থানা কমিটির মেয়াদ ১০ বছরের বেশি। এমনকি মহানগরের দুই শাখার পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে ব্যর্থ হয়েছে বর্তমান নেতৃত্ব। দীর্ঘদিন পরে সম্মেলন হলেও এখনো অগোছাল আওয়ামী লীগের তিন সহযোগী সংগঠন মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগ এবং তাঁতী লীগ। একই অবস্থা তাদের মহানগর কমিটির ক্ষেত্রেও। মহিলা লীগ প্রায় ১৪ বছর পর নতুন নেতৃত্ব পেয়েছে। কিন্তু থানা-ওয়ার্ডে এখনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই।

যুব মহিলা লীগের প্রায় ১৩ বছর পরে ১১ মার্চ দ্বিতীয় জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতি পদে নাজমা আক্তার এবং সাধারণ সম্পাদক পদে অপু উকিল পুনর্নিবাচিত হন। সম্মেলনে সাবিনা আক্তার তুহিনকে ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি ও তাহেরা খাতুন লুৎফাকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণের সভাপতি হন ফরিদা ইয়াসমিন ঝুমা এবং সাধারণ সম্পাদকের পদ দেওয়া হয় নীলুফা রহমানকে। তবে এখনো থানা-ওয়ার্ডে পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে পারেনি যুব মহিলা লীগ।

এবিষয়ে যুব মহিলা লীগের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, থানা ও ওয়ার্ড কমিটি গঠন কার্যক্রম চলছে। শোকের মাস আগস্ট জুরেই এর কার্যক্রম বন্ধ ছিল। তিনি বলেন, যে কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে সেখানে গঠনের কাজ চলছে। তবে এক সঙ্গে কমিটি ঘোষণা করা সম্ভব হবে না। এক প্রশ্নের উত্তরে নাজমা বলেন, দেরি হবে না। আগামী ৬ মাসের মধ্যে থানা ও ওয়ার্ডের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের কাজ শেষ হবে। েভোরের পাতা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ