প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নেপালের নির্বাচনে ভারতপন্থীদের ভরাডুবি

আনিস আলমগীর : ভারতের এবং চীনের মধ্যবর্তী দেশ নেপাল। জাতিগত ভাবে নেপালীরা হিন্দু। এক সময়ে নেপালকে বলা হতো বিশ্বের একমাত্র হিন্দু রাষ্ট্র। নেপালে আইন ছিলো গো-হত্যা করলে মৃত্যুদণ্ড হবে। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশটাকে আগের নামে কেউ ডাকে না।

দীর্ঘদিন পর নেপালের ফেডারেল পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। দুই দফায় অনুষ্ঠিত নেপালে এবারের কেন্দ্রীয় সংসদ নির্বাচনে কমিউনিস্ট জোট সিপিএন এবং ইউএমএল পেয়েছে ৮০ আসন। মাওবাদী দল মাওয়িস্ট সেন্টার দখলে নিয়েছে ৩৬টি আসন। ক্ষমতাসীন কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ২৩ আসন। ভারতপন্থী দল রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেপি)পেয়েছে ১১টি আসন, তাও মাধিসি অঞ্চলে। ভারতের বিহার রাজ্য সংলগ্ন নেপালের উত্তর-দক্ষিণ প্রলম্বিত সমতল অঞ্চলটিকে বলে মাধিসি। এখানে ভারতের বিহার এবং উত্তর প্রদেশের লোকজনের বসবাস বেশি।

নেপালের পার্লামেন্টে আসন সংখ্যা ২৭৫ টি। ১৬৫ আসনের ফলাফল নির্ধারিত হয় প্রত্যেক্ষ ভোটে আর ১১০ আসনের ফলাফল নির্ধারিত হয় আনুপাতিক হারে। শাসনতন্ত্র রচনা ও প্রদেশ বিন্যাসের সময় ভারত চেয়েছিলো মাধিসিকে একটা প্রদেশের মর্যাদা দেওয়া হউক। কিন্তু নেপালের রাজনৈতিক দলগুলো একহাট্টা হয়ে ভারতের এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলো।

মাধিসিতে ভারতীয় মানুষের বসবাস হওয়ায় এটা স্বতন্ত্র রাজ্যের মর্যাদা পেলে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে- সে কারণে সম্ভবতো নেপালিরা সম্মত হয়নি। মাধিসিকে চার ভাগে বিভক্ত করে চার প্রদেশের সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্তে পৌঁছতে নেপালকে বহু দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল। নেপাল স্থলভূমি দ্বারা পরিবেষ্ঠিত দেশ। দীর্ঘ চারমাস ভারত আর মাধিসির লোকজন নেপালকে অবরোধ করে রেখেছিলো। নেপালের অভ্যন্তরে কিছুই পৌঁছতে পারেনি।

প্লেনে করে মালামাল নিয়ে একটা দেশ চালানো তো সহজ নয়। বাংলাদেশ নেপালকে তার মালামাল নেওয়ার জন্য সৈয়দপুর বিমানবন্দর ছেড়ে দিয়েছিলো। চীন ও অকাতরে সাহায্য করেছিলো। চীনের সঙ্গে নেপালের রোড কালেকশনও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভবিষ্যতে ভারত অবরোধ বসালে আর কঠিন কোনও দুর্যোগে পড়তে হবে না।

রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় সস্ত্রীক নেপাল সফরে গিয়েছিলেন। কাঠমাণ্ডুর বিখ্যাত পশুপতিনাথ মন্দির দেখতে চেয়েছিলেন সোনিয়া গান্ধী। কিন্তু সোনিয়া গান্ধী হিন্দু না হওয়ায় পুরোহিতেরা তাকে মন্দিরে প্রবেশ করার অনুমতি দেয়নি। এ অভিমানে রাজীব ভারতে এসে যোগাযোগের সব ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলেন। এ অবরোধ দীর্ঘ চার মাস স্থায়ী ছিলো। যে কারণে তেলের অভাবে নেপালে গাড়ি-ঘোড়া পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজিব গান্ধীর সময়ে প্রথমবার এবং নরেন্দ্র মোদির সময়ে দ্বিতীয়বার এই অবরোধের কারণে নেপালের জনগোষ্ঠী প্রচণ্ড ভারত বিরোধী। অথচ বৃটিশেরা যখন ভারত ত্যাগ করে যাচ্ছিল তখন নেপালের রাজা ছিলেন ত্রিভুবন বীর বিক্রম শাহ। নেপালীরাও বৃটিশকে একটা বার্ষিক কর প্রদান করতেন সত্য তবে ভারতের দেশীয় রাজ্যগুলোর চেয়ে তার মর্যাদা পৃথক ছিল। রাজা ত্রিভুবনের রাজদরবারে বৃটিশের কোনও রিজেন্ট ছিলো না। স্বাধীনভাবে রাজা ত্রিভুবন রাজ্য পরিচালনা করতেন।

রাজা ত্রিভুবন নেপালের দেশ রক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয়ের দায়িত্ব ভূটানের মতো ভারতের হাতে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু বলেছিলেন, ‘আপনি স্বতন্ত্র স্বাধীন সত্ত্বা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করুন।’ প্রথম ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী বল্লভভাই প্যাটেল বলেছিলেন, বিশ্বে আরেকটি হিন্দু রাষ্ট্র থাকুক তা আমরা কামনা করি। অথচ নেহরু-প্যাটেলের পর নেপালকে ভারতীয় শাসকরা কেউই স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা দিতে চাননি। স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র বলে নেপালকে কাবু করা খুবই সহজ। অথচ স্থলবেষ্টিত দেশে চলাচলের পথ দেওয়া আন্তর্জাতিক বিধান। ভারত সে বিধান তোয়াক্কা করেনি।

রাষ্ট্রীয় জনতা পার্টি এখন নেপালে ভারতপন্থী একমাত্র দল। মাধিসিতে তারা ১১টি আসন পেয়েছে আর একটি প্রদেশে যৌথভাবে সরকার গঠন করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। রাষ্ট্রীয় জনতা পার্টি প্রথমে নির্বাচন বয়কটের কথা বললেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। ভারতও চেয়েছিলো নির্বাচনটা স্থগিত হউক। রাষ্ট্রীয় জনতা পার্টি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে নেপাল কংগ্রেসও নির্বাচন পেছানোর সুযোগ পেত। কংগ্রেসইতো এখন ক্ষমতায়। তখন নেপালে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হতো।

এখন নেপালের মিডিয়াগুলোতে বিজয়ী বামশক্তির যেমন প্রশংসা চলছে রাষ্ট্রীয় জনতা পার্টি’র নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিচক্ষণতারও প্রশংসা চলছে। আবার কংগ্রেস ক্ষমতাসীন দল হিসেবে নির্বাচন অনুষ্ঠান, শাসনতন্ত্র ও গণতন্ত্রের প্রতি যে নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছে তারও প্রশংসা চলছে। কংগ্রেস নেপালের রাজনীতিতে প্রাচীন দল এবং নেপালে রাজতন্ত্রের দিন শেষ করে প্রজাতান্ত্রিক সরকার গঠনে তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টার জন্য উজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছে।

নেপালে গত ১০ বছরে ৯ বার সরকার গঠিত হয়েছিলো। দুইবার সংবিধান রচনার জন্য গণপরিষদের নির্বাচন হয়েছে। এখন সংবিধান রচনার কাজও সম্পন্ন হয়েছে আর জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদগুলোর নির্বাচনও শেষ হয়েছে। ২০১৭ সাল নেপালের নির্বাচনী বছর বলা যায়। স্থানীয় আঞ্চলিক কেন্দ্রীয় সব নির্বাচন হয়েছে।

গত ২৬ নভেম্বর ও ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনে নিজের পরাজয়ের কথা আন্দাজ করতে পেরেও নির্বাচন নিরপেক্ষ করার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ছিলো কংগ্রেসের। কংগ্রেসের কৈরালা পরিবারের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন রাষ্ট্র্রীয় ক্ষমতায় থেকে রাজা মহেন্দ্র, রাজা বীরেন্দ্রের সময় রাজতন্ত্রের অনুগত দল হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। নানা প্রক্রিয়ার মাঝে নেপালে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম হয়েছে।

রাজা মহেন্দ্র ১৯৬২ সালের দিকে নেপালে কন্ট্রোল ডেমোক্রেসি চালু করেছিলো। স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হতো আর স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরাই জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচন করতো। রাজা মহেন্দ্রের আগে এমনই নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করেছিলেন পাকিস্তানে প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খান। আইয়ুব খান তার নাম দিয়েছিলেন বেসিক ডেমোক্রেসি। তখন পাকিস্তান এবং নেপালে প্রায় একই রকম নির্বাচন ব্যবস্থা ছিলো।

নেপাল কংগ্রেসের বিরুদ্ধেও ভারত প্রীতির অভিযোগ ছিলো। রাষ্ট্রীয় জনতা পার্টি তো ভারতপন্থী দল নামে পরিচিতি পেয়েছে। অবশ্য আরজেপির ভিত্তি মাধিসি অঞ্চলে। গত অবরোধই কংগ্রেসকে দুর্বল করে ফেলেছে, না হয় দেশের সর্বত্র তার সংগঠন রয়েছে। প্রাচীন দল হিসেবে নেপাল শাসনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাও রয়েছে। অবশ্য সমালোচকরা বলছেন, নির্বাচনের সময় তারা কোনও গঠনমূলক কর্মসূচি পেশ করেনি। কমিউনিস্টদের বিরোধিতাকে সম্বল করে প্রচারণা চালিয়েছে।

কমিউনিস্ট জোট ও মাওবাদীরা নেপালে সরকার গঠন করছে। এর মধ্যে তারা ঘোষণাও দিয়েছে -এখন এক সংগঠন হয়ে যাবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি ওলি হবেন প্রধানমন্ত্রী। নানা মত-ভিন্নতা থাকার পরও শাসনতন্ত্র রচনায় এবং নেপাল কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবার নেতৃত্বে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে সফলভাবে নির্বাচন করার বিষয়ে নেপালের রাজনৈতিক দলগুলো মহান দেশ-প্রেমিকের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

নেপাল দারিদ্রপীড়িত দেশ। দেশটার ১৬ শতাংশ জমি আবাদযোগ্য। অবশিষ্ট ভূমি পাহাড় ও জঙ্গল, ৮৫ শতাংশ লোক থাকে গ্রামে, ৮০ শতাংশ লোক কৃষক। মাথাপিছু কৃষি জমি আছে আধা হেক্টরেরও কম। ১৫ শতাংশ লোক ভূমিহীন। ৩৬ শতাংশ লোক দারিদ্রসীমার নীচে। ১৫ শতাংশ লোকের হাতে রয়েছে মোট জমির ৩৮ শতাংশ। নেপালের জনসংখ্যা সাড়ে তিন কোটি। অবাধ গণতন্ত্রের চর্চা এবং সংসদীয় শাসন ব্যবস্থাই বেছে নিল নেপালিরা।

নির্বাচনের উল্লেখযোগ্য দিক এটাই যে ভারতপন্থী বলে পরিচিত কংগ্রেস এবং আরজেপির ভরাডুবি হয়েছে। আর সমাজতন্ত্রীদের বিপুল বিজয় নেপালকে চীনের আরও খুব কাছাকাছি নিয়ে আসতে যাচ্ছে। কমিউনিষ্টদের বিজয়ের ফলে চীনই উপকৃত হবে। চীন নেপালে রেল ব্যবস্থা বাস্তবায়নের কাজ করছে। কে পি ওলি ক্ষমতাসীন হলে আরো বেশী করে চীন সাহায্যের হাত বাড়াবে। পাকিস্তান ও শ্রীলংকার মতো নেপাল আগেই চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড উদ্যোগে যোগদান করেছে।

নেপালের সঙ্গে চীনের সীমান্ত হলো ১৭৪৬ কিলোমিটার আর ভারতের সঙ্গে সীমান্ত হলো ১২৩৬ কিলোমিটার। নেপালে বড় বড় ব্যবসায় ভারতীয় ব্যবসায়ীদের আধিপত্য বেশী। ভারতীয় মুদ্রা রাষ্ট্রীয় মুদ্রার মতই চালু রয়েছে নেপালে। সব কিছু ঠিক করে সত্যিকার রাষ্ট্র ব্যবস্থা চালু করতে গেলে কে পি ওলির মাথার ঘাম পায়ে পড়বে।

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক, [email protected]। বাংলাট্রিবিউন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত