প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গোড়াতেই গলদ!

শান্তনু চৌধুরী : পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়। এখন বরং অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে, কোনও পরীক্ষা শুরু হওয়ার খবরে আমরা আতঙ্কিত হয়ে উঠি এই বুঝি প্রশ্ন ফাঁসের খবর এলো। আর প্রশ্ন ফাঁস হলেই পুরো পদ্ধতিটির মধ্যে যে একটা লেজে গোবরে অবস্থা সৃষ্টি হয়ে সেটা বলাই বাহুল্য। কিন্তু এতোদিন প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টা ছিল, ব্যাংকের নিয়োগ, মেডিকেল, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি, নার্সিং ভর্তিসহ চাকরির বাজারে। কিন্তু আতঙ্কের বিষয় সেটা এখন পৌঁছেছে স্কুল পর্যায়েও। কথায় বলে, ‘আদৌ কথার সময় হাতে করে যা শেখাবি, সেটিই হবে মোক্ষম ছেলের, হিসেবে চল নয় পস্তাবি।’ সে হিসেবে বলতে গেলে প্রাথমিক স্তরটা শিক্ষার একেবারে প্রথম স্তর। জ্ঞান বিজ্ঞানের রাজ্যে প্রবেশমাত্র। সেখানেই যদি গোড়ায় গলদ হয় তবে এই জাতি আগামীতে মেধাবী সন্তান হিসেবে কাদের উপহার পাবে সেটা ভাবনার বিষয় বৈকি!

সংবাদমাধ্যম থেকে জানা গেছে, ১১ ডিসেম্বর বরগুনায় প্রাথমিক পর্যায়ের চতুর্থ শ্রেণির ইংরেজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে। ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁসকারী চক্র সেটি ছড়িয়ে দেয়। পরদিন ওই ফাঁস হওয়া প্রশ্নেই পরীক্ষা নেয়া হয়। এরপর ১৬ ডিসেম্বর একই এলাকায় বার্ষিক পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণির গণিতের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর বেতাগী উপজেলার ১৪০টি বিদ্যালয়ের পরীক্ষা স্থগিত করে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। কয়েকদিন আগেও একই ঘটনা ঘটে বরগুনা সরকারি বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে বার্ষিক পরীক্ষায় সপ্তম ও নবম শ্রেণির কয়েকটি প্রশ্ন ফাঁস হয়। এছাড়া প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে রাজশাহীর বাঘায় চতুর্থ শ্রেণির পরীক্ষার, বাগেরহাটে কোচিং সেন্টারের প্রশ্নপত্র দিয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পরীক্ষার নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের ফিরিস্তি কম দীর্ঘ নয়।

প্রাথমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা গড়ে উঠবে সেটাই স্বাভাবিক। সুস্থ প্রতিযোগিতা হলে সেটাকে সমর্থন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যত সুন্দর করার দায়িত্বও যেকোনও অভিভাবকের রয়েছে। আমাদের শিক্ষার সূচনালগ্নেও আমরা সেটি পেয়েছিলাম। স্কুলে প্রথম, দ্বিতীয় হওয়ার দৌড় ছিল। বাবা-মায়েরাও সেটাতে উৎসাহ দিতেন। ভালো লেখা, কয়েকটি বই পড়ে পড়ে নোট করা এসব ছিল পড়ালেখার অংশ। কিন্তু বাবা-মায়ের নিশ্চয় চাইতেন না সন্তান আগের রাতে প্রশ্ন পেয়ে সেই প্রশ্নের উত্তর জেনে নিয়ে পরীক্ষা দিক। কথাটা এই কারণে বলা, বিশ্ববিদ্যালয় বা চাকরির ক্ষেত্রে যেসব প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে সেখানে অভিভাবকদের খুব একটা ভূমিকা নেই। কারণ সন্তান তখন প্রাপ্ত বয়স্ক, বুঝতে শিখেছে। কিন্তু স্কুল পর্যায় তা নয়। সেখানে নিশ্চয় ফেসবুক বা ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ছেলে-মেয়েরা প্রশ্ন পায়নি। সেখানে প্রশ্নের যোগানদাতা যেমন দুষ্ট চক্র, তেমনি গ্রহীতাও দুষ্ট অভিভাবকরা। কে না জানে, স্কুলের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা সাধারণত মন চঞ্চলতার হেতু পড়ালেখায় কম মনযোগ দিতে চায়, সেক্ষেত্রে অভিভাবক যদি তার কাছে আগামীদিনের প্রশ্ন দিয়ে শুধু ওই নির্ধারিত প্রশ্নের উত্তর শিখতে বলেন তবে শিক্ষার্থীদের খুব বেশি দোষ দেওয়া যায়না।

প্রথম প্রথম যখন প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটতো তখন শিক্ষামন্ত্রী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী দুষলেন সংবাদমাধ্যমকে। এরপর তারা দুষতে শুরু করলেন শিক্ষকদের। গেলো ১৭ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রাণলয়ের বৈঠকেও শিক্ষামন্ত্রী কতিপয় অসাধু শিক্ষকদের দায়ী করে তাদের কারণেই কোনও উদ্যোগ ফলপ্রসূ হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন। তবে দুর্নীতি দমন কমিশনের নিজস্ব প্রতিবেদন প্রশ্নপত্র ফাঁসের উৎস হিসেবে শিক্ষাবোর্ড, বিজি প্রেস, ট্রেজারি, পরীক্ষা কেন্দ্র, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতরকে নির্দেশ করেছে। দুদক সরকারি কর্মকর্তাদেরও এর জন্য দায়ী করেছেন। এরই মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে বেশ কয়েকজন ধরাও পড়েছে। কিন্তু এরপরও কিছুতেই যেন বন্ধ করা যাচ্ছে না প্রশ্নপত্র ফাঁস। তাহলে কি এদের শেকড় আরো গভীরে, এরা কি এগুচ্ছে জাতিকে সমূলে ধ্বংসের ষড়যন্ত্র নিয়ে।

১৯৭১ সালে বিজয়ের আগে জাতিকে মেধাশূন্য করার চেষ্টা হিসেবে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করেছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। আজ বর্গি নেই, ইংরেজ নেই, পাকিস্তানি হানাদার নেই। এরপরও দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে মেধাশূন্য জাতি তৈরির চক্রান্ত চলছে বললে ভুল বলা হয় না। এই যে গোড়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘দুনম্বরি’ উপায়ে উৎরে যাওয়ার একটা প্রবণতা গড়ে উঠছে এর ফলে এরা বছরের পর বছর পাস করে করে স্কুল-কলেজের গণ্ডি পার হবে ঠিকই কিন্তু গড়ে উঠবে না মেধাবী হয়ে। সবচেয়ে বড় কথা এই ধরনের একটা বিষয়ের বিরুদ্ধে তেমন কোনও বাদ-প্রতিবাদও নেই। এটি সাধারণভাবে ছোট মনে হলেও জাতিকে ধ্বংস করার কতো গভীর ষড়যন্ত্র তা যেন কেউই উপলব্ধি করতে পারছে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, প্রশাসনের চেয়ে ওই চক্র বেশ শক্তিশালী। ২০১৪ সালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বসে একবার প্রতিবাদ করেছিলেন শিক্ষাবিদ, লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তার সঙ্গে সেখানে বসেছিলেন অনেকে। এরপর বড় ধরনের কোনও প্রতিবাদ কিন্তু চোখে পড়েনি। এখন আশঙ্কার কথা দিনে দিনে এই ফাঁসের ঘটনা বাড়ছে।

একথা কে শিক্ষার্থীদের বোঝাবে যে, পরীক্ষা পাসের সঙ্গে জীবনের উন্নয়নের কোনো সম্পর্ক নেই। ভালো পাস বা খারাপ পাস বলে কিছুই নেই। রবীন্দ্রনাথ স্কুল পাস করতে পারেননি, নজরুল পারেননি, আইনস্টাইন কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন। এমন উদাহরণও অনেক। ইন্টারনেট থেকে পাওয়া বিল গেটসের সেই বহুল প্রচলিত উক্তির কথায় যদি বলি, ‘আমি হার্ভার্ডে তিনটা বিষয়ে ফেল করেছিলাম, আমার এক বন্ধু সব পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিল, আমার সেই বন্ধুটি এখন মাইক্রোসফটে আমার প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে।’ আমাদের দেশে ভালো মানুষ দরকার। ভালো মেধাবী ছাত্র দরকার, যারা পড়ালেখাকে শুধু পরীক্ষা পাস হিসেবে না দেখে জীবনকে জানার উপায় হিসেবে দেখে। জ্ঞান, মেধা, প্রজ্ঞা এসব আসলে পরীক্ষা পাস দিয়ে হয় না। কেউ নিশ্চয় এখন মাশরাফি, মোস্তাফিজ বা মমতাজকে জিজ্ঞাসা করতে যান না, তারা কোন বিষয়ে কত নাম্বার পেয়ে পাস করেছিলেন। আগেকার কথা বাদ দিলেও বর্তমানে পৃথিবীকে আলোকিত করা অনেকে রয়েছেন যারা ঠিকমতো মাধ্যমিকের গণ্ডিটাই পার করতে পারেননি।

একসময় দেশে খুব নকল হতো। বিএনপি সরকারের শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী নকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। তিনি গাড়িতে-হেলিকপ্টারে চড়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতেন। নকলবাজ, নকল সরবরাহকারীদের ধরতেন। মানুষ বাহবা দিয়েছেন। অনেকে তার বিরুদ্ধে ছিল। এর মধ্যে রাজনীতি ঢোকানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু আখেরে লাভ হয়েছে দেশের। দেশ এখন নকলমুক্ত। কিন্তু ডিজিটাল বাংলাদেশে এখন আবারও নকলের ধরন পরিবর্তন হয়ে এসেছে আরও ভয়ংকর রূপে। পরীক্ষায় কী প্রশ্ন আসবে সেটা যদি আগেই জানা হয়ে যায় তবে নকলের কী প্রয়োজন। নকল এখন অন্তর্জালে পৌঁছে যাচ্ছে সবার ঘরে ঘরে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা এখনই সোচ্চার না হলে সমূহ বিপদ। আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ ধরলে বলা যেতে পারে মেধাহীন জাতি এক সময় দেশ পরিচালনায় আসবে। তখন দেশের কী অবস্থা হবে সহজেই অনুমেয়। তাই এখনই সংশ্লিষ্টদের সোচ্চার হতে হবে, একে-ওকে না দুষে গলদ খুঁজে বের করতে হবে, প্রয়োজনে শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। দুদকের প্রতিবেদনে জানা গেছে, বিভিন্ন শহরে সরকারি স্কুলগুলোতে অনেক শিক্ষক একই স্কুলে চাকরি করছে বছরের পর বছর। সেটা কীভাবে সম্ভব। নৈতিক শিক্ষক আমরা হারিয়ে ফেলছি কি? শিক্ষকদের বাণিজ্য থেকে দূরে রাখতে প্রয়োজনে কঠোর হতে হবে। অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে ১০সেট প্রশ্নপত্র বানিয়ে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।

১০সেট প্রশ্নপত্র পাঠিয়ে দিয়ে পরীক্ষার আধঘণ্টা আগে জানিয়ে দিতে হবে কোন সেটে পরীক্ষা হবে। এটাও ভালো পরামর্শ। প্রশ্নপত্র করা, ছাপানো, বিতরণ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের হাতে কেন্দ্রে পৌঁছানো পর্যন্ত অনেক বড় শিকল। সেটা যে কোনও জায়গায় ছিঁড়তেই পারে। কারণ জাতিগতভাবে আমরা ততোটা সৎ নই। সে কারণে যতোটা সম্ভব প্রযুক্তির আশ্রয় নিতে হবে। সত্যিকারের ডিজিটাইলেজশন করতে হবে পরীক্ষাপদ্ধতিকে। সেটা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বসে পরামর্শ নিতে পারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বুয়েটের একদল শিক্ষার্থী এরই মধ্যে তেমন একটি পদ্ধতি আবিস্কার করেছেন। যেটার কথা আমরা সংবাদ মাধ্যম থেকে জানতে পেরেছি। কেন্দ্রীয়ভাবে পরীক্ষায় প্রশ্ন পাঠানোর বিষয়টা ডিভাইসের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা। সেটিও ভালো পদ্ধতি। মোট কথা যে কোনও উপায়, প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি ঠেকাতে হবে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় যা একটু মাথাব্যথা করছে এটা নিয়ে। আর কারও চিন্তা নেই। যে জাতির শিক্ষার প্রতি আগ্রহ নষ্ট হবে, সে জাতি হবে ধ্বংস। মাদকের চেয়েও ভয়াবহভাবে এটি ধ্বংস করবে প্রজন্মকে। পাক হানাদার বাহিনী যে জাতিকে মেধাহীন করতে পারেনি, দেশের ভেতরে থাকা দুষ্টচক্র ঘুনপোকার মতো নিঃশব্দে সেটা করে চলছে। ঘুনপোকার গর্তে বিষ ঢালতে না পারলে মেধাহীনতার বিষ জাতিকে মেরে ফেলবে নিমিষেই।

লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক। বাংলাট্রিবিউন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত