প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শিক্ষা ক্যাডার বনাম জাতীয়করণ : লাভ কার?

দীপক চৌধুরী : শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি চলেছে দীর্ঘদিন। এর সুবিধাভোগী অনেকেই রাজনীতির সুবাদে পরে মন্ত্রীও হয়েছেন। কিন্তু শিক্ষার অগ্রগতি হয় নি, হয়েছে বাণিজ্যিকীকরণ। শিক্ষার্থী ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সঙ্গে প্রতারণা ছিল সুবিধাবাদীদের রাজনীতি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা আগাগোড়াই এ বিষয়ে ছিলেন সতর্ক, আছেনও সতর্ক। শিক্ষার্থীদের প্রতি দরদ আর মায়া থাকলে যা হয়। বাস্তবতাবর্জিত অনেকে ঘটনাই এদেশে ঘটে থাকে। অনেকে এর সুযোগ নেয়। ধূর্ত প্রকৃতির মানুষেরা এ সময় ওঁৎপেতে থাকে। যারা অন্ধকারের রাজনীতি ভালোবাসে আর অন্ধকারকে পছন্দ করে তারা সুযোগের অপব্যব্যবহারের সুযোগটি নেয়।

শিক্ষা ক্যাডারেও অনেকে আছেন, তারা চান এটা চাঙ্গা হোক। এটি ভর করে আন্দোলন দানা বাঁধুক। প্রয়োজনে সমাবেশ-মহাসমাবেশে অঘটন ঘটিয়ে ফায়দা নেওয়ার স্বপ্ন দেখেন অনেকে। ২০১৮ খ্রীস্টাব্দকে সামনে রেখে এই খেলাটি শুরু হয়েছে। কারণ, আসছে বছরটি নানাকারণেই কঠিন। এটা ভোটের বছর। ছয়টি সিটি করপোরেশন নির্বাচন, জাতীয় নির্বাচন, স্থানীয় সরকারের উল্লেখযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা আসছে বছরে। সুতরাং শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে সামনে টেনে এনে দুর্জনেরা ‘রাজনীতি’ করবে।
যতদূর জানা গেছে, এখন পর্যন্ত ২৮৩টি কলেজকে জাতীয়করণের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এসব করেজের শিক্ষরা দাবি করে আসছেন, তাদেরও বিসিএস ক্যাডার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কিন্তু বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার সমিতি এর বিরোধিতা করছে। কর্মকর্তারা বলছেন, কয়েকটি ধাপে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন তারা। এখন জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকরা যদি সরাসরি ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত হন তাহলে সমস্যাটা বাড়বে। তাদের দাবি বিসিএস ক্যাডার সদস্যদের সুবিধা অক্ষুণœ রেখে জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের জন্য পৃথক নীতিমালা করতে হবে। জাতীয়করণের জন্য ঘোষিত বেসরকারি কলেজের শিক্ষকদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন অন্তর্ভুক্ত করে ও জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এ বর্ণিত নির্দেশনা অনুসরণে তাদের ক্যাডার বহির্ভুত রেখে স্বতন্ত্র বিধিমালা প্রণয়ন।

 

আমি তো দেখি বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কথায় ও দাবিতে যুক্তি আছে। কোনো কিছু যদি যৌক্তিক হয়Ñ তাহলে যে কেউ মেনে নেবে। কিন্তু যুক্তিসংগত না হলেই সমস্যা। সেখানে অনেকেই ঝোঁপ বুঝে কুপ মারার অপেক্ষায় আছেন। এ সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য নানারকম হিসাব-নিকাশ চলছে। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার আর কলেজ জাতীয়করণের ‘ইস্যু’টি কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক লাভবান হবে ষড়যন্ত্র করছে দুষ্টচক্র। এতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মহৎ উদ্দেশ্য সুফল বয়ে আনবে না। মুক্তিযুদ্ধের সরকার ক্ষমতায় থাকবেÑ এটা অনেকেই মেনে নিতে না পেরে কঠিন নানারকম ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ এদেশের রাজনীতিকদের অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। এমনকি ইউনেস্কো স্বীকৃতি দেওয়ার পরও গোস্বা করেছেন তারা। কারণ, তারা এই ঐতিহাসিক ভাষণকে নিষিদ্ধও করেছিলেন। সুতরাং আমাদের কোনো কিছুকেই ছোটকরে দেখা উচিত নয়। শিক্ষা ক্যাডার ও কলেজ জাতীয়করণ নিয়ে ঘোলা মাছ শিকার করার জন্য অশুভচক্র নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতিবাচক রাজনীতি করবে।

সুতরাং এটি জিইয়ে রেখে তাদের মুখে সেøাগান তুলো দেওয়া যাবে না। বিসিএস শিক্ষা সমিতির মহাসচিব মো. শাহেদুল খবির চৌধুরীসহ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে যতটুকু জানা গেছে, জাতীয়করণের সাথে সংশ্লিষ্ট কলেজগুলোর শিক্ষকদের ক্যাডারভুক্ত করার কোনরূপ প্রচেষ্টা শিক্ষা ক্যাডার সদস্যরা মেনে নেবে না। তবে তাদের আশার কথা হলো, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যেই কলেজ জাতীয়করণের ক্ষেত্রে একটি অনুশাসন দিয়েছেন, যাতে বলা হয়েছে ‘জাতীয়করণকৃত কলেজের শিক্ষকগণ স্ব স্ব কলেজ হতে অন্য কলেজে বদলি হতে পারবেন নাÑ যা জাতীয়করণ করা শিক্ষকদের ক্যাডারভুক্ত না হওয়ার বার্তাই বহন করে। এটা সবাই স্বীকার করবেন, যোগ্য ও মানসম্পন্ন শিক্ষক ছাড়া মানসম্মত শিক্ষাদান সম্ভব নয়। সরকারি কলেজে সরকার প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে এমন শিক্ষক নিয়োগ দেয় যারা বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের অন্তর্ভুক্ত। পূর্বোক্ত প্রক্রিয়ায় এসব শিক্ষকের যোগ্যতা প্রশ্নাতীত বলেই অভিভাবক মহলের বিশ্বাস।

কিছুদিন আগে টেলিভিশনের ‘টকশো’-য় শুনেছিলাম, জাতীয়কৃতদের ক্যাডারভুক্তি বন্ধ করে এ সংকট রোধ করা যায়। তাদের নিয়োগ, মর্যাদা, বদলি, পদোন্নতি সব কিছুকে নতুন আইনের দ্বারা পৃথক করতে হবে। সাবেক শিক্ষাসচিব এন আই খানের মতে, জাতীয়কৃতদের শিক্ষা ক্যাডারে অন্তর্ভুক্তি অনৈতিক। বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. সা’দত হুসাইনের মতে, বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের স্বতন্ত্র ও উচ্চ মর্যাদা পাওয়া উচিত। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষা ও শিক্ষকবান্ধব অতিসজ্জন ব্যক্তি হিসেবে সুপরিচিত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে মন্ত্রী নিয়োগ, দক্ষতার নিরীখে শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান, পাঠ্যবই বাছাইয়েও বাংলাদেশের কৃষ্টি ও স্বধীনতা, বীরযোদ্ধা, বীরশ্রেষ্ঠদের ত্যাগ-মহিমাকে সর্বোচ্চ স্থানে নিয়ে এসেছেন।

তার সরকারের জনবান্ধব কর্মসূচি হচ্ছে পর্যায়ক্রমে শিক্ষার জাতীয়করণ। বেসরকারি কলেজ জাতীয়করণের ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদে ২০১০ এর ৮ ডিসেম্বর গৃহীত জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুসরণে সংশ্লিষ্ট কলেজসমূহের শিক্ষকদের ক্যাডার বহির্ভুত রেখে স্বতন্ত্র নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা রয়েছে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গল্পকার
সম্পাদনা : আশিক রহমান ও মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত