প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দুদকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ
কঠোর বার্তা পাচ্ছে দুর্নীতিবাজরা: চেয়ারম্যানের সাক্ষাৎকার

প্রতিবেদক: দেশে দুর্নীতি দমন, প্রতিরোধ, দুর্নীতিবাজদের শাস্তির আওতায় আনা ও সততা জোরদার করার রাষ্ট্রীয় সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আগের দুর্বলতা কাটিয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে। গত দু’বছরের কম সময়ে দায়ের করা মামলায় ৫৬৫ জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যা গত এক যুগে মোট গ্রেফতারের চেয়ে বেশি। বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে বর্তমান কমিশন দুর্নীতিবাজদের কঠোর বার্তা দিয়েছে।

বিশ্ব পরিসরে বাংলাদেশ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর অন্যতম। ২০০১-০৫ সময়কালে আন্তর্জাতিক নজরদারি প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের জরিপে বাংলাদেশ সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ বলে চিহ্নিত হয়। গত কয়েক বছর এই জরিপেই উন্নতি দেখা গেছে। তবু প্রতিনিয়ত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ঘুষের ছড়াছড়ি থেকে  ব্যাংকের হাজার কোটি টাকা লোপাট পর্যন্ত দুর্নীতি সর্বাধিক আলোচিত বিষয়।

পাকিস্তান আমল থেকে চলে আসা দুর্নীতি দমন ব্যুরো অথর্ব হয়ে পড়লে অধিকতর স্বাধীনতা দিয়ে একটি নতুন আইনে ২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর কমিশন হিসেবে যাত্রা শুরুর পর আজ মঙ্গলবার ১৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে প্রতিষ্ঠানটি। এ উপলক্ষে নানা কর্মসূচি পালন করবে দুদক।

কমিশন গঠনের পরও কয়েক বছর ঝিমিয়ে থেকে কাজের গতি এসেছে। সংশ্নিষ্টরা জানান, ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিগত সময়ে তদবির, আপস, এক শ্রেণির কর্মকর্তার অসততা, ওপরমহলের প্রভাবে নতি স্বীকার, একের পর এক অভিযুক্তদের দায়মুক্তি প্রভৃতি কারণে আস্থাহীনতা ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার কবলে পড়ে স্বাধীন এ প্রতিষ্ঠানটি।

এ অবস্থায় সরকারের সাবেক সিনিয়র সচিব, সুদক্ষ আমলা ইকবাল মাহমুদের নেতৃত্বে বর্তমান কমিশন ২০১৬-এর ১৪ মার্চ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অভিযানে নামে দুদক। গ্রহণ করা হয় নানা কার্যক্রম। গত প্রায় দুই বছরে ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজদের কাছে কঠোর বার্তাই পৌঁছাতে পেরেছে এ কমিশন। এই সময়ে ৫৩৬টি মামলা ও ৮৫২টি চার্জশিট পেশ করা হয়। মামলায় গ্রেফতার হওয়া আসামিদের মধ্যে আছেন রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, ব্যাংকের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা, কোস্টগার্ডের ডিজি, বিভিন্ন দপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, সিভিল সার্জন, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা প্রমুখ।

দায়িত্ব গ্রহণের পর দুদক চেয়ারম্যান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘দুর্নীতিবাজদের জন্য দুদক হবে আতঙ্কের নাম।’ ওই বক্তব্যের পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হলেও পর্যবেক্ষকরা বলেন, তিনি কথা রাখার চেষ্টা করছেন।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রাক্কালে এক প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, এই কমিশন শুরুতেই গ্রেফতার অভিযানে নেমে একটি বার্তা দিতে চেয়েছে- দুর্নীতি করলে কেউ রেহাই পাবে না। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। দুর্নীতিবাজদের ঠাঁই হবে হাজতে। দুদক আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী।

তিনি আরও বলেন, এবার দুদক কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করবে। আগামী বছরটিতে দুদক হবে কোচিংবাজদের জন্য আতঙ্ক।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সমকালকে বলেন, দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধে এ কমিশনের নানামুখী পরিকল্পনা মানুষের মাঝে এক ধরনের আশা সৃষ্টি করেছে। নিঃসন্দেহে এটি তাদের সদিচ্ছারই প্রতিফলন। গৃহীত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত জনবল ও অর্থ বরাদ্দসহ সব দিক থেকে সরকারকে সহায়তা করতে হবে। তিনি দুদকের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, ইউনিয়ন পর্যায়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি, ৪২টি জেলায় নতুন অফিস স্থাপনের পরিকল্পনা, জনগণের কাছ থেকে সরাসরি টেলিফোনে অভিযোগ নেওয়া, বিদ্যালয়ে সততা সংঘ, সততা স্টোর চালুসহ অন্যান্য পদক্ষেপের প্রশংসা করেন।

সূত্র জানায়, দুদকের দৃঢ়তা দেখে সারাদেশের মানুষ দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে। দুদকের সঙ্গে মানুষের কথা বলার নতুন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গত ২৭ জুলাই হটলাইন-১০৬ চালু হওয়ার পর গত চার মাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৪ লাখ ৭ হাজার মানুষ কল করেছে। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ফাঁদ পেতে ঘুষের টাকাসহ হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়েছে ৫ জনকে। দুর্নীতির খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক ১২টি অভিযান চালানো হয়েছে।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, তবে নানা ক্ষেত্রে কিছু ব্যর্থতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শর্ষের মধ্যে ভূতের মতো দুদকের ভেতরে দুর্নীতি। কিছু কর্মকর্তা কমিশনের সঙ্গে বিশ্বাস ভঙ্গ করে দায়সারা অনুসন্ধান, অভিযুক্তদের ভয় দেখানো, আঁতাত করে অভিযুক্তদের ছেড়ে দেওয়া, দুর্নীতির প্রমাণ ধ্বংসসহ নানা রকম অসৎ উপায়ে মোটা অংকের অর্থের মালিক হচ্ছেন।

জানা গেছে, কমিশন দুদকের ভেতরে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছে। যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, তাদেরকে কারণ দর্শানোর আদেশ, বদলি ও চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৫ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত ও ৮ জনকে বদলি করা হয়েছে।

দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ আরও বলেন, চলতি বছরে দুর্নীতি মামলায় আসামিদের সাজার হার ৭০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আগামী বছর এই হার শতভাগে উন্নীত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

দুদক সূত্র জানায়, এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। আগামী বছরটিতে কোচিং বাণিজ্যের ভিত ভেঙে দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। দুর্নীতি বন্ধে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর, অধিদপ্তরের কাজের পদ্ধতিগত পরিবর্তনে চেষ্টা চালানো হবে। হয়রানি, ভোগান্তি, ঘুষ ও দুর্নীতিমুক্ত জনসেবা নিশ্চিত করতে সরকারি কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা (ডিসক্রিশনারি পাওয়ার) কমানোর বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে।

দুদক সূত্র জানায়, নির্দিষ্ট সময়ে সরকারি সেবা প্রদান, সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে নজরদারি, ইউনিয়ন পর্যায়ে দুর্নীতিবিরোধী কমিটি গঠন, ১০ টাকা কেজি দরে চালে দুর্নীতি বন্ধ, প্রাতিষ্ঠানিক টিম পুনর্গঠন, জনবল-আর্থিক বরাদ্দ বৃদ্ধি, সশস্ত্র পুলিশ ইউনিট প্রাপ্তি, কর্মকর্তাদের নিজস্ব পোশাক, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, নিজস্ব হাজতখানা ও আর্মড ফোর্স গঠনসহ নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

দুদকের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণজাগরণ সৃষ্টি করতে চায় এই কমিশন।

সূত্র: সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ