প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জীববৈচিত্র রক্ষা ও আর্থিক বিবেচনায় দেশে বাণিজ্যিকভাবে কুমির চাষের অপার সম্ভবনা

মতিনুজ্জামান মিটু : পরিবেশ ও জীববৈচিত্র রক্ষা এবং অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশে কুমিরের প্রজনন ও চাষের অপার সম্ভবনা রয়েছে। বিশেষ করে সুন্দরবনের মাঝে বয়ে যাওয়া নদীগুলোসহ সুন্দরবন অঞ্চল ও কুয়াকাটায় গড়ে ওঠা পর্যটন শিল্পাঞ্চলকে ঘিরে আধুনিক খামার স্থাপনের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে কুমির চাষের যথেষ্ট উপযুক্ততা রয়েছে। খামার স্থাপন ও প্রাকৃতিক পরিবেশে সংরক্ষণের মাধ্যমে কুমিরের উৎপাদন বাড়ানো যায়। উপকূলীয় অঞ্চলেও পর্যটন শিল্প গড়ে তোলা যায়। তবে ব্যক্তি পর্যায়ে কিছু উদ্যোগ থাকলেও সরকারের পরিকল্পনায় বিষয়টি জায়গা পায়নি।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট(বিএফআরআই)সূত্রে জানা গেছে, খামারে কুমিরের উৎপাদন একটি লাভজনক খাত হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে কুমিরের বাণিজ্যিক চাষ হয়ে আসছে। অষ্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক উন্নত দেশে কুমির অপ্রচলিত খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ওইসব দেশে পর্যটন শিল্প হিসেবে কুমিরের খামার স্থাপন করা হয়েছে। কুমিরের চামড়া অনেক অভিজাত সামগ্রী তৈরিতে ব্যাপকভাবে সমাদৃত।

প্রাকৃতিক পরিবেশে কুমিরের প্রজাতিগুলোর বিলুপ্তি রোধে এদের আবাসস্থলের উন্নয়ন ও প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। তাছাড়া কুমিরের কৃত্রিম প্রজনন-কৌশল ও চাষ-পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য দেশের বিভিন্ন পরিবেশগত অঞ্চলে আধুনিক সুবিধা সম্বলিত কয়েকটি গবেষণাগার স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। এসব ব্যবস্থা নিলে কুমিরের উৎপাদন বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এ থেকে প্রক্রিয়াজাতকরা পণ্য রপ্তানি করেও প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যাবে। এ বিষয়ে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আশু পদক্ষেপ নেয়া দরকার। বিএফআরআই এর একাধিক কর্মকর্তা জানান, কুমির নিয়ে সরকারের বর্তমানে কোনো ভাবনা নেই।

সুন্দরবন অঞ্চলে কুমিরের আধুনিক খামারের উপযুক্ততা বিবেচনায় এ অঞ্চলে কুমিরের খামার স্থাপনের জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীগুলোর দু’পাশে তারের জালের বেড়া দিয়ে কুমির চাষ শুরু করা যেতে পারে। এছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে কুয়াকাটাসহ বেশ কিছু স্থানে পর্যটন শিল্প গড়ে উঠেছে। এসব অঞ্চলে কুমিরের খামার স্থাপন করা সম্ভব হলে ওইসব পর্যটন শিল্প আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। যা জীববৈচিত্র সংরক্ষণসহ জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপুর্ণ অবদান রাখবে। এ ধরণের প্রাকৃতিক পরিবেশে কুমিরের চাষ সহজ হবে।

প্রাকৃতিক পরিবেশে কুমিরের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত কুমিরের প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষণ, বাসস্থান ও প্রাকৃতিক চাষ কৌশল উন্নয়ন করতে হবে। এ জন্য বেসরকারি উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসার পাশাপাশি সরকারি পৃষ্টপোষকতার বিশেষ দরকার।

মৎস্য অধিদপ্তরের বাংলাদেশের নির্বাচিত এলাকায় কুচিয়া ও কাঁকড়া চাষ এবং গবেষণা প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. বিনয় কুমার চক্রবর্তী বলেন, ময়মনসিংহের ভালুকায় ব্যক্তিগত পর্যায়ে কুমিরের খামার আছে। তবে কুমির নিয়ে বর্তমানে মৎস্য অধিদপ্তরের কোনো প্রকল্প বা ভাবনা নেই। সরকারিভাবে কুমিরের আধুনিক খামার স্থাপন করা যেতে পারে।
কুমির সরীসৃপজাতীয় প্রাণি। ইউরোপ ছাড়া পৃথিবীর সব মহাদেশেই প্রায় ১৭.৫ কোটি বছর আগে ডাইনোসরের সমকালীন কুমিরের উদ্ভব ঘটলেও ডাইনোসরের বিলুপ্তির পর অদ্যবধি এরা পৃথিবীর বিভিন্ন ভৌগলিক পরিবেশে জীববৈচিত্র সংরক্ষণ করে আসছে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৩০টির মতো কুমিরের খামার আছে। খামারগুলো মেক্সিকো উপসাগরের পাড়ে লুসিয়ানা ও ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত। একবিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে যুক্তরাষ্টের দক্ষিণাঞ্চলে বিপুল হারে জনসংখ্যা বাড়তে থাকলে কুমিরের সংখ্যা হ্রাস পেতে থাকে এবং ১৯৭৩ সালে কুমিরকে বিপদাপন্ন প্রজাতির তালিকাভুক্ত করা হয়। অতঃপর ১৯৭৮ সাল থেকে ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের ফলে কুমিরের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং বর্তমানে এটি আর বিপদাপন্ন প্রজাতি নয়। উল্লেখ্য, কুমিরের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমে যাওয়ার কারণে ১৯৬০ সাল থেকেই এ সংরক্ষণের দিকে বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হতে থাকে। বর্তমানে সারা পৃথিবীতে কুমিরের ৩টি গোত্রে ২৫টি প্রজাতি রয়েছে। বাংলাদেশের সুন্দরবন এলাকায় এক ধরনের কুমিরের প্রাচুর্য রয়েছে। কুমিরের বয়স প্রায় ৬ বছর হলে পরিণত হয়।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ