প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের পরামর্শ
নিখোঁজের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে

তারেক : নিখোঁজ হওয়ার ৮১ দিন পর গত ১৬ নভেম্বর রাজধানীর বাসায় ফিরেছেন ব্যবসায়ী ও বেলারুশের অনারারি কনসাল অনিরুদ্ধ রায়। তবে তিনি এখনো তার নিখোঁজ হওয়া নিয়ে কোনো কথা বলেননি। এর আগে নিখোঁজের একদিন পরই গত শনিবার সন্ধান মিলেছে জাতীয় পার্টির সভাপতিম-লীর সদস্য আজম খানের ছেলে আইনান খানের। আর গত ২৭ অক্টোবর সূত্রাপুর এলাকা থেকে নিখোঁজ বাংলাদেশ জনতা পার্টির সভাপতি মিঠুন চৌধুরী ও তার রাজনৈতিক সহকর্মী আশিষ ঘোষের সন্ধান মিলেছে নিখোঁজের ১৮ দিন পর গত মঙ্গলবার। সেদিন পুলিশ তাদের গ্রেফতার দেখায়।

এভাবে গত এক সপ্তাহে হঠাৎ করেই নিখোঁজ হওয়া তিনজন পরিবারের কাছে ফিরে এসেছেন। যদিও ফিরে আসা ব্যক্তিরা নিখোঁজ হওয়া নিয়ে কোনো কথা বলেননি। কিন্তু ফিরে আসায় স্বস্তি এসেছে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে। স্বজনদের পেয়ে আনন্দে আপ্লুত তারা। উদ্বেগ কমেছে সাধারণ মানুষেরও। এত দিন এসব নিখোঁজ ব্যক্তিদের ফিরে পেতে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর পাশাপাশি দাবি জানিয়ে আসছিল বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। সমালোচনার মুখে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন সবাই। এই ফিরে আসায় কিছুটা হলেও স্বস্তি এসেছে জনমনে। তবে গত তিন মাসে নিখোঁজ আরো সাতজন এখনো ফেরেননি। তারা এ সময়ের মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে রহস্যজনকভাবে ‘নিখোঁজ’ হন। তাদের মধ্যে সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, প্রকাশক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রয়েছেন। নিখোঁজের পর থেকে বিভিন্ন স্থানে সন্ধান চালিয়েও তাদের খোঁজ মেলেনি। তিনি কেমন আছেন, কেনইবা নিখোঁজ হলেন জানেন না স্বজনরা। প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে ফিরে আসার অপেক্ষায়, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়। বিভিন্ন জায়গায় ধরনা দিচ্ছেন। অঝোরধারায় কাঁদছেন স্বজনরা। পরিবার তো বটেই; এ নিয়ে ভীষণ দুশ্চিন্তায় রয়েছেন নিখোঁজদের বন্ধু, স্বজন, সহকর্মীরা। উদ্বিগ্ন বিভিন্ন মহলও। নিখোঁজদের সন্ধান দিতে না পারায় সমালোচনার মুখে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নাগরিক নিরাপত্তার দিক বিবেচনায় দোষারোপ করা হচ্ছে সরকারকেও। নিখোঁজদের ফিরে পেতে ও নাগরিক নিরপত্তা নিশ্চিদের দাবিতে পথে নেমেছে মানবাধিকারসহ বিভিন্ন সংগঠন ও রাজনৈতিক দল।

নিখোঁজদের সন্ধানে সরকার আন্তরিক বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বলেন, ‘অনেকে ইচ্ছে করেই আত্মগোপনে গিয়ে সরকারকে বিব্রত করছে। তবে যাই ঘটুক না কেন, নিখোঁজরা তাড়াতাড়ি ফিরে আসবেন। আমাদের গোয়েন্দা বাহিনী কাজ করছে। আশা করি, তাদের ফিরিয়ে দিতে পারব। আমি সব সময় বলি, মিসিং হওয়ার পেছনে কিছু কারণ থাকে। অনেকে ইচ্ছা করে মিসিং হয়ে যাচ্ছে বা আত্মগোপনে গিয়ে আমাদের বিব্রত করছে। এ ধরনের মিসিংয়ের সুরাহা করা গোয়েন্দাদের জন্য একটু কষ্টকর। তার পরও আশা করি, তাদের ফিরিয়ে আনতে পারব।’

এ নিয়ে উদ্বিগ্ন দেশের অপরাধ বিশ্লেষক ও মানবাধিকারকর্মীরা। তাদের মতে, বিগত বছরগুলোয় নিখোঁজ বা গুম হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বেশির ভাগ ছিলেন সন্দেহভাজন অপরাধী, বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে যুক্ত। তাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক, অর্থাৎ গত তিন মাসে নিখোঁজের প্রবণতা ভিন্ন। এই তালিকায় রয়েছেন ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, পৌর মেয়র, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্র, ছোট রাজনৈতিক দলের নেতা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও প্রকাশক। নিখোঁজের নতুন এ প্রবণতায় উদ্বেগ ছড়িয়েছে সমাজের সর্বস্তরে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাজে নৈতিক অবক্ষয়, আইন হাতে তুলে নেওয়া, মানুষের চাহিদা বেড়ে যাওয়া, দ্রুত অপরাধীরা ধরা না পড়া এবং দ্রুত বিচার না হওয়ার জন্য এ ধরনের ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে স্বল্পসময়ের মধ্যে বিচার করা সম্ভব হলে এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা এমন ঘটনা বন্ধে নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন ও কমিশনকে এসব ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধান করে প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা ও জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক জিয়া বলেন, নিখোঁজের পেছনে নানা কারণ থাকে। কেউ অপহরণ হয়, আবার নিজে থেকেও কেউ পালায়। অতীতে প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করতেও এমন ঘটনা ঘটেছে। তবে যেভাবে বা কারণেই নিখোঁজ হোক না কেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব এদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। কেউ যদি স্বেচ্ছায় আত্মগোপন করে, সেটারও বিচার হওয়া উচিত। আর যদি অপহরণ হয়ে থাকে, তাহলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এসব ঘটনা দ্রুত উদ্ঘাটন না হলে ও জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা না গেলে ঘটনা বাড়বেই।

অপরাধ বিজ্ঞানের এই শিক্ষক এমনও বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হবে প্রত্যেকটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করা। কারণ বের করা। জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা। সবকিছু জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। তবেই নাগরিকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরবে ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। তা না হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সরকারও সমালোচনার মুখে পড়ে। একটা বিষয় সবাইকেই মানা উচিত যে, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। সকল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকেও সক্রিয় ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৭ নভেম্বর রাজধানীর আইডিবি ভবনের সামনে থেকে নিখোঁজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক মোবাশ্বার হাসানের কোনো খোঁজ নেই। ১০ অক্টোবর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন সাংবাদিক উৎপল দাস। ২৬ আগস্ট রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকা থেকে নিখোঁজ হন কানাডার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ইশরাক আহমেদ। ২২ আগস্ট বিমানবন্দর সড়ক থেকে অপহৃত হন বিএনপি নেতা ও এবিএন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সাদাত আহমেদ। ২৬ আগস্ট রাজধানীর পল্টন থেকে নিখোঁজ হন কল্যান পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমান। ৮ নভেম্বর নিখোঁজ হন প্রকাশক তানভীর ইয়াসিন করিম। তারা কেউই ফেরেননি।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য মতে, ২০১৬ সালে নিখোঁজ হয়েছেন ৯০ জন। চলতি বছরে প্রথম পাঁচ মাসেই এ সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ জনে। তার পরও থেমে নেই নিখোঁজের সংখ্যা। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, নিজেদের স্বার্থেই নিখোঁজদের উদ্ধার ও সুষ্ঠু তদন্ত করা উচিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। পুলিশের নাকের ডগায় একের পর এক নিখোঁজের ঘটনা ঘটতে থাকলে, একসময় পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা। তারা এমনও বলেন, নিখোঁজের ঘটনায় নাগরিক নিরাপত্তার বিষয় ও সরকারের ভাবমূর্তির বিষয়টি সামনে চলে আসছে। শুধু নিখোঁজদের সন্ধানই নয়; কেন নিখোঁজ হচ্ছেন বা কারা করছে, সে সবও জনসম্মুখে তুলে ধরা উচিত।

এ ব্যাপারে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, অভিযোগ রয়েছে মানুষকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মানুষ অপহৃত হচ্ছে। খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সব ধরনের লোকই এ ধরনের ঘটনার শিকার হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে পরিবারগুলো অভিযোগ করে আসছে। কিন্তু কোনো ঘটনারই দৃশ্যমান বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত হচ্ছে না। বরং সরকারি দলের মন্ত্রী-সরকারের নেতৃত্ব থেকে এমন কথা বলা হচ্ছে, যাতে বিষয়গুলো হালকা করে দেওয়া হচ্ছে। এসব ঘটনার বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত না হওয়ায় জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সমাজে ভয় ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি বেগবান হচ্ছে। যারা এসব ঘটনার সঙ্গে যুক্ত তারে পার পেয়ে যাচ্ছে।

এই মানবাধিকারকর্মী পরামর্শ দিয়ে বলেন, বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করতে হবে। কমিশনের কাজ হবে এসব ঘটনার সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা। তাহলেই কেবল এমন ঘটনা কমবে। নতুবা নানামুখী অপরাধ সমাজকে গ্রাস করে ফেলবে। নানা মহল এমন ঘটনা নানা কাজে ব্যবহার করতে পারে। অপরাধের কৌশল হিসেবে নিতে পারে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ